Homeউত্তর ২৪ পরগনাবসিরহাটহড়পা বান আসছে!’ চালকের এক সতর্কবার্তায় প্রাণে বাঁচলেন নেপালে আটকে পড়া শিক্ষক দম্পতি

হড়পা বান আসছে!’ চালকের এক সতর্কবার্তায় প্রাণে বাঁচলেন নেপালে আটকে পড়া শিক্ষক দম্পতি

resizeplus_Screenshot 2026-08-29 203545_edited

নিউজ ডেস্ক; পাহাড়ি পথে গাড়ি ছুটছিল। চারপাশে পাহাড় আর মেঘে ঘেরা নেপালের মনোরম পরিবেশ। আচমকাই গাড়ি থামিয়ে দিলেন চালক। মুখে তাঁর সতর্কবার্তা—‘হড়পা বান আসছে!’ প্রথমে বিষয়টি শুনে আতঙ্কের বদলে কৌতূহলই তৈরি হয়েছিল পর্যটকদের মধ্যে। গাড়ি থেকে নেমে দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়েছিলেন কেউ কেউ। চোখের সামনে তখন যেন পাহাড়ের বুক চিরে মেঘের স্রোত নেমে আসছে। সেই দৃশ্য দেখে বিস্ময়ে থমকে গিয়েছিলেন সকলে।

কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই সেই বিস্ময় বদলে যায় আতঙ্কে। চালক ফের সতর্ক করে বলেন, সেখানে আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপদ নয়। যে কোনও সময়ে হড়পা বান তাঁদের অবস্থানের দিকে ধেয়ে আসতে পারে। চালকের পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা এবং তৎপরতায় শেষ পর্যন্ত বড় বিপদ এড়ানো সম্ভব হয়। গাড়ি ঘুরিয়ে পর্যটকদের নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যান তিনি। পরে তাঁদের হোটেলে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

নেপালের ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখ থেকে প্রাণে বেঁচে দেশে ফিরে সেই চালককেই কৃতজ্ঞতা জানালেন বসিরহাটের ষাটোর্ধ্ব অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অনুকূল পোদ্দার এবং তাঁর স্ত্রী রেবা রায় পোদ্দার। রবিবার সকালে পুলিশি নিরাপত্তায় বাড়ি ফেরেন তাঁরা। বাড়ি ফিরে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে অনুকূলের গলায় তখনও আতঙ্কের ছাপ। তাঁর কথায়, ঈশ্বরের কৃপাতেই তাঁরা প্রাণে ফিরতে পেরেছেন। তাঁর মনে হয়েছে, যেন নতুন করে জীবন ফিরে পেয়েছেন।

অনুকূল এবং রেবা প্রায় ৩০ জনের একটি পর্যটক দলের সঙ্গে নেপাল বেড়াতে গিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল পাহাড়, প্রকৃতি এবং নেপালের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখা। কিন্তু আনন্দের সেই সফর আচমকাই পরিণত হয় ভয়াবহ অভিজ্ঞতায়। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে কার্যত জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যেতে হয়েছিল তাঁদের।

তবে ওই দলের প্রত্যেক সদস্যই শেষ পর্যন্ত সুস্থ ভাবে দেশে ফিরতে পেরেছেন বলে জানিয়েছেন অনুকূল। তাঁর কথায়, নেপালে ঘুরতে গিয়ে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, তা তাঁরা স্বপ্নেও ভাবেননি। সাধারণ পর্যটন সফরের মতোই যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু পাহাড়ি রাস্তায় হঠাৎ হড়পা বান দেখতে পাওয়ার পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়।

সেই মুহূর্তের কথা মনে করে এখনও শিউরে উঠছেন অনুকূল। তিনি জানান, দলের সকলে গাড়িতে করে যাচ্ছিলেন। আচমকাই চালক গাড়ি থামিয়ে দেন। তার পরই জানান, সামনে হড়পা বান আসছে। প্রথমে বিষয়টি নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়। হড়পা বান কী ভাবে পাহাড় বেয়ে নেমে আসে, তা এত কাছ থেকে দেখার সুযোগ হবে ভেবে কয়েক জন গাড়ি থেকে নেমেও পড়েছিলেন।

দূরে তাকিয়ে তাঁরা দেখতে পান অদ্ভুত এক দৃশ্য। পাহাড়ের উপর থেকে যেন মেঘের বিশাল স্রোত নেমে আসছে। প্রকৃতির সেই দৃশ্য প্রথম দেখায় ভয়াবহ বলে মনে হয়নি। বরং বিস্মিত হয়ে তা দেখছিলেন পর্যটকেরা। কিন্তু চালক দ্রুত বুঝতে পারেন, সেটি শুধু দেখার মতো কোনও প্রাকৃতিক দৃশ্য নয়। পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নেমে আসা জলের স্রোত যে কোনও মুহূর্তে ভয়ঙ্কর রূপ নিতে পারে।

পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে চালক আর সময় নষ্ট করেননি। পর্যটকদের দ্রুত গাড়িতে উঠে পড়তে বলেন। তার পর গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে যান নিরাপদ জায়গার দিকে। চালকের তৎপরতার কারণেই দলটি বিপজ্জনক এলাকা থেকে সরে যেতে সক্ষম হয়। কয়েক মুহূর্ত দেরি হলে কী হতে পারত, তা ভেবেই এখন আতঙ্কিত অনুকূল।

পরে চালক জানতে পারেন, যে পাহাড়ি রাস্তা ধরে তাঁদের যাওয়ার কথা ছিল, সেই রাস্তা আর ব্যবহার করা সম্ভব নয়। বিপর্যয়ের কারণে ওই পথে যাতায়াত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরিস্থিতি কখন স্বাভাবিক হবে, তা নিয়েও তখন নিশ্চিত ভাবে কিছু জানা যাচ্ছিল না। ফলে আর ঝুঁকি না নিয়ে চালক পর্যটকদের নিয়ে হোটেলে ফিরে আসেন।

অনুকূলের কথায়, চালক কোথা থেকে খবর পেয়েছিলেন, তা তিনি জানেন না। তবে সময়মতো খবর পাওয়াটাই তাঁদের কাছে আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়ায়। রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর যদি চালকের কাছে না পৌঁছত, তা হলে তাঁরা হয়তো আরও বিপজ্জনক জায়গার দিকে এগিয়ে যেতেন। সেক্ষেত্রে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারত, তা এখন কল্পনা করতেও ভয় লাগছে তাঁর।

অনুকূলের মতে, পাহাড়ে পর্যটনের সময় স্থানীয় চালকের অভিজ্ঞতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, এই ঘটনা তারই প্রমাণ। পর্যটকের চোখে যে দৃশ্যটি বিস্ময়কর মনে হয়েছিল, একজন অভিজ্ঞ পাহাড়ি চালক সেখানেই বিপদের সংকেত দেখতে পেয়েছিলেন। তাঁর সতর্কতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত প্রায় ৩০ জনের পর্যটক দলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

রবিবার সকালে পুলিশি নিরাপত্তায় বাড়ি ফেরার পর অনুকূল জানান, জীবনে এমন অভিজ্ঞতা আগে কখনও হয়নি। তাঁর কথায়, ঈশ্বরের আশীর্বাদ না থাকলে হয়তো তাঁরা আর বাড়ি ফিরতে পারতেন না। নেপালে বেড়াতে গিয়ে প্রকৃতির ভয়ঙ্কর রূপ এত কাছ থেকে দেখতে হবে, তা ভাবেননি তিনি। কিন্তু সেই বিপদের মধ্যেও দলের সবাই নিরাপদে ফিরে আসায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন তিনি।

তবে নেপালের এই অভিজ্ঞতা তাঁদের মনে দীর্ঘদিন থেকে যাবে বলেই মনে করছেন অনুকূল ও রেবা। আনন্দের জন্য শুরু হওয়া পাহাড় সফর তাঁদের কাছে হয়ে উঠেছে জীবনকে নতুন করে উপলব্ধি করার এক অভিজ্ঞতা। পাহাড়ের সৌন্দর্যের পাশাপাশি প্রকৃতির শক্তি কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে, তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়েছেন তাঁরা।

এই ঘটনার পর তাঁদের কাছে সবচেয়ে বড় কৃতজ্ঞতার জায়গা অবশ্যই তাঁদের গাড়িচালক। বিপদের মুহূর্তে কৌতূহল নয়, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বুঝেছিলেন তিনি। পর্যটকদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে গিয়ে পরে হোটেলে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্তই হয়তো তাঁদের সকলকে বড় বিপদের হাত থেকে রক্ষা করেছে।

নেপাল থেকে ফিরে তাই অনুকূলের একটাই কথা—‘ভাগ্যিস চালক সময়মতো গাড়ি ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন।’ সেই একটি সিদ্ধান্তই হয়তো বদলে দিয়েছে প্রায় ৩০ জন পর্যটকের ভাগ্য। ভয়াবহ হড়পা বান থেকে নিরাপদে ফিরে এসে এখন সেই চালকের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন বসিরহাটের শিক্ষক দম্পতি।

No Comments

    একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

    LINKS

    ABOUT US

    ফোন নম্বর

    +৯১ ৮৪২০৬৫৮৯৯৯

    আমাদের ঠিকানা

    আর্চ স্কোয়ার X2 বিল্ডিং
    কলেজ মোড়, সেক্টর ৫
    কলকাতা - ৭০০০৯১

    Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved