
নিউজ ডেস্ক; রাস্তার দু’ধারে লোকজনের আনাগোনা নেই। গোটা এলাকা কার্যত শুনশান। একটি হোটেলকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে পুলিশ। আচমকাই চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল স্মোক গ্রেনেডের ধোঁয়া। তার মধ্যেই বন্দুক তাক করে হোটেলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন কালো পোশাকের কম্যান্ডোরা। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তাঁদের একটি দল ঢুকে পড়ল হোটেলের ভিতরে। শনিবার বিকেলে উত্তর ২৪ পরগনার সন্দেশখালির ধামাখালি এলাকায় এমনই দৃশ্য দেখে কার্যত হতবাক হয়ে যান স্থানীয় বাসিন্দারা।
হঠাৎ করে কেন সন্দেশখালির একটি হোটেলের সামনে ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ড বা NSG-এর কম্যান্ডোদের দেখা গেল? সত্যিই কি ওই হোটেলে জঙ্গিরা ঘাঁটি গেড়েছিল? কোনও নাশকতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল? স্থানীয়দের মধ্যে এমন নানা প্রশ্ন ঘুরতে শুরু করে। অনেকেই পরিস্থিতি বুঝতে না পেরে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশের তরফে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়, বাস্তবে কোনও জঙ্গি হামলা বা অপহরণের ঘটনা ঘটেনি। গোটা ঘটনাই ছিল নিরাপত্তা বাহিনীর একটি বিশেষ মক ড্রিল।
সন্দেশখালি থানার অন্তর্গত ধামাখালির একটি হোটেলকে ঘিরেই এই মহড়ার আয়োজন করা হয়। পুলিশের তরফে যে পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল, তাতে দেখানো হয়—একটি হোটেলে কয়েক জন পর্যটককে জঙ্গিরা অপহরণ করে আটকে রেখেছে। সেই খবর পৌঁছয় সন্দেশখালি থানার পুলিশের কাছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে স্থানীয় পুলিশ জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনীকে খবর দেয়। খবর পাওয়ার পরই NSG-এর একটি বিশেষ দল ধামাখালির ওই গেস্ট হাউসে পৌঁছে যায়।
এর পর শুরু হয় উদ্ধার অভিযানের মহড়া। হোটেলের চারপাশে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়। পুলিশের উপস্থিতিতে গোটা এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। সম্ভাব্য জঙ্গি হামলার পরিস্থিতি ধরে নিয়ে অভিযান পরিচালনা করেন NSG কম্যান্ডোরা। স্মোক গ্রেনেড ব্যবহার করে হোটেলের চারপাশের পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। সেই ধোঁয়ার আড়ালেই বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কম্যান্ডোরা হোটেলের দিকে এগিয়ে যান।
মহড়ার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল, জঙ্গিরা কোনও হোটেলের ভিতরে পর্যটকদের আটকে রাখলে কী ভাবে দ্রুত এবং নিরাপদে তাঁদের উদ্ধার করা যায়, তার বাস্তব অনুশীলন করা। সেই অনুযায়ী হোটেলের ভিতরে প্রবেশ করে NSG-এর বিশেষ দল। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং প্রশিক্ষণ কাজে লাগিয়ে সম্ভাব্য জঙ্গিদের নিয়ন্ত্রণে আনার পাশাপাশি আটকে থাকা পর্যটকদের উদ্ধার করার কৌশল অনুশীলন করা হয়।
মহড়ার পরিস্থিতিতে দেখানো হয়, হোটেলের ভিতরে জঙ্গিদের হাতে আটকে রয়েছেন কয়েক জন পর্যটক। তাঁদের জীবনের ঝুঁকি রয়েছে। তাই নিরাপত্তা বাহিনীকে এমন ভাবে অভিযান চালাতে হবে যাতে এক দিকে জঙ্গিদের নিষ্ক্রিয় করা যায়, অন্য দিকে কোনও পর্যটকের ক্ষতি না হয়। এই ধরনের জটিল পরিস্থিতিতে বাহিনীর বিভিন্ন দলের মধ্যে সমন্বয় কতটা কার্যকর, তা যাচাই করাও এই ধরনের মহড়ার অন্যতম উদ্দেশ্য।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই অবশ্য প্রথমে বিষয়টি বুঝতে পারেননি। রাস্তার ধারে হঠাৎ এত পুলিশ, তার মধ্যে NSG কম্যান্ডো, তার উপর স্মোক গ্রেনেডের ধোঁয়া—সব মিলিয়ে তাঁদের মধ্যে স্বাভাবিক ভাবেই আতঙ্ক তৈরি হয়। কেউ কেউ ভেবেছিলেন, হয়তো সত্যিই কোনও জঙ্গি হোটেলে লুকিয়ে রয়েছে। আবার কেউ আশঙ্কা করেছিলেন, নাশকতার মতো কোনও ঘটনা ঘটতে পারে।
পরিস্থিতি পরিষ্কার হওয়ার পর অবশ্য সেই আতঙ্ক অনেকটাই কেটে যায়। পুলিশের তরফে জানানো হয়, এটি পূর্বপরিকল্পিত প্রশিক্ষণমূলক মহড়া। বাস্তবে কোনও পর্যটক অপহৃত হননি এবং কোনও জঙ্গিও ওই হোটেলে লুকিয়ে ছিল না। নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রস্তুতি যাচাই করতেই বাস্তব পরিস্থিতির আদলে এই মহড়া চালানো হয়।
বিশেষ করে পর্যটনকেন্দ্রিক এলাকায় কোনও সন্ত্রাসবাদী হামলা বা পর্যটক অপহরণের মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত কী ভাবে মোকাবিলা করা যায়, তা নিয়ে নিরাপত্তা সংস্থাগুলির প্রস্তুতি থাকা জরুরি। হোটেল বা গেস্ট হাউসের মতো জায়গায় জঙ্গিরা সাধারণ মানুষকে পণবন্দি করলে পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠতে পারে। সেক্ষেত্রে বাহিনীর দ্রুত অভিযান, নির্ভুল সমন্বয় এবং সাধারণ মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ধামাখালির এই মহড়ায় সেই বিষয়গুলিই অনুশীলন করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। শুধু হোটেলে ঢুকে পড়াই নয়, ভিতরে থাকা সম্ভাব্য জঙ্গিদের মোকাবিলা, পণবন্দিদের অবস্থান চিহ্নিত করা এবং তাঁদের নিরাপদে বাইরে নিয়ে আসার প্রক্রিয়াও মহড়ার অংশ ছিল।
সন্দেশখালিতে NSG কম্যান্ডোদের উপস্থিতি অবশ্য এই প্রথম নয়। এর আগেও এই এলাকার মানুষকে এমন দৃশ্যের সাক্ষী হতে হয়েছিল। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় সন্দেশখালির আগারহাটি গ্রাম পঞ্চায়েতের মল্লিকপাড়ায় একটি অভিযানে NSG কম্যান্ডোদের নামানো হয়েছিল বলে জানা যায়। সেই সময় সিবিআই একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়েছিল। অভিযোগ ছিল, ওই এলাকার এক তৃণমূল পঞ্চায়েত সদস্যের আত্মীয়ের বাড়িতে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র মজুত রয়েছে।
অস্ত্র উদ্ধারের সেই অভিযানে নিরাপত্তার কারণে NSG কম্যান্ডোদের ব্যবহার করা হয়েছিল বলে খবর। ফলে শনিবার ফের সন্দেশখালির রাস্তায় কালো পোশাকের কম্যান্ডো, হাতে অস্ত্র এবং নিরাপত্তা বলয় দেখে স্থানীয়দের একাংশের মনে স্বাভাবিক ভাবেই পুরনো সেই ঘটনার কথা ফিরে আসে।
তবে এ বারের ঘটনা সম্পূর্ণ আলাদা। কোনও অস্ত্র উদ্ধারের অভিযান নয়, কোনও বাস্তব জঙ্গি হামলাও নয়। পর্যটকদের নিরাপত্তা এবং জঙ্গি হামলার মতো চরম পরিস্থিতিতে উদ্ধার অভিযানের প্রস্তুতি যাচাই করতেই এই মক ড্রিলের আয়োজন করা হয়।
শনিবারের এই মহড়ার মাধ্যমে এক দিকে যেমন নিরাপত্তা বাহিনীর প্রস্তুতি পরীক্ষা করা হল, তেমনই স্থানীয় প্রশাসন ও বিশেষ বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় কতটা কার্যকর, সেটিও যাচাই করা সম্ভব হয়েছে। ভবিষ্যতে কোনও বাস্তব জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে এই ধরনের প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
আর স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে অবশ্য শনিবারের কয়েক ঘণ্টা ছিল যথেষ্ট চমকপ্রদ। হঠাৎ শুনশান রাস্তা, চারদিকে পুলিশ, স্মোক গ্রেনেডের ধোঁয়া আর বন্দুক হাতে NSG কম্যান্ডো—প্রথম দেখায় যে কোনও মানুষেরই মনে হতে পারে বড় কোনও বিপদ ঘটেছে। পরে যখন জানা গেল সবটাই মহড়া, তখন স্বস্তি ফেরে এলাকায়।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments