Samik Bhattacharyaনিউজ ডেস্ক : বম্বে হাইয়ের পর এ বার দেশের জ্বালানি মানচিত্রে বাংলার নাম আরও জোরালো ভাবে উঠে আসার সম্ভাবনা। উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগরের মাটির গভীর থেকে শুরু হয়েছে বাণিজ্যিক ভাবে অপরিশোধিত তেল উত্তোলন। দীর্ঘ প্রায় আট বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে শুক্রবার বাইগাছিতে ওএনজিসি-র তেলক্ষেত্র থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদনের সূচনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। আর এই ঘটনাকেই পশ্চিমবঙ্গের শিল্প ও জ্বালানি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক বলে দাবি করলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি তথা সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য।
তাঁর বক্তব্য, অশোকনগরের এই প্রকল্প শুধু একটি তেলক্ষেত্রে উৎপাদন শুরুর ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলায় বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং শিল্প সম্ভাবনার বৃহত্তর প্রশ্ন। রাজ্যে নতুন শিল্প আসুক, আরও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হোক এবং পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হোক—এই লক্ষ্যেই তাঁদের কাজ বলে দাবি করেছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি।
অশোকনগরের তেল উত্তোলন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আগ্রহ ছিল। একাধিক পর্যায়ের অনুসন্ধান, প্রযুক্তিগত কাজ এবং পরিকাঠামো তৈরির পর অবশেষে বাণিজ্যিক উৎপাদনের পর্যায়ে পৌঁছেছে প্রকল্পটি। জানা গিয়েছে, অশোকনগরের বাইগাছি এলাকায় প্রায় ২৩৯৬ মিটার গভীরতা থেকে অপরিশোধিত খনিজ তেল উত্তোলন করা হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার লিটার তেল উত্তোলনের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে বলে প্রকল্প-সংক্রান্ত তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে।
উত্তোলিত অপরিশোধিত তেল বিশেষ ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে হলদিয়ার শোধনাগারে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রথম দফায় প্রায় ১২০০ লিটার অপরিশোধিত তেল হলদিয়ার শোধনাগারে পাঠানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন শমীক ভট্টাচার্য। ফলে অশোকনগর থেকে মাটির নীচে পাওয়া সম্পদ সরাসরি রাজ্যের জ্বালানি পরিকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পথও তৈরি হয়েছে।
এই উৎপাদন শুরু হওয়ার ঘটনাকে সামনে রেখেই রাজ্যের পূর্বতন তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন শমীক। তাঁর অভিযোগ, অশোকনগরের মতো সম্ভাবনাময় প্রকল্পের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন অনুমোদন না পাওয়া এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে কাজ এগোতে দেরি হয়েছে। তাঁর দাবি, সেই বিলম্বের প্রভাব পড়েছে রাজ্যের শিল্প সম্ভাবনা, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের উপর।
শমীকের বক্তব্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে শিল্পের সম্ভাবনা কখনও শেষ হয়ে যায়নি। বরং সঠিক নীতি, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে রাজ্যে বড় শিল্প ও জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়িত করা সম্ভব। অশোকনগরের তেল উত্তোলনকে সেই সম্ভাবনারই একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছেন তিনি।
তৃণমূল সরকারের আমলে প্রকল্পটি কেন এতটা সময় নিল, সেই প্রশ্নও তুলেছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি। তাঁর অভিযোগ, প্রশাসনিক গড়িমসি এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেতে দীর্ঘ সময় লাগার কারণে প্রকল্পের বাস্তবায়ন পিছিয়ে যায়। এর ফলে বাংলার মানুষ শিল্প ও কর্মসংস্থানের যে সুযোগ পেতে পারতেন, তার একটা অংশ নষ্ট হয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।
তবে অশোকনগরের তেলক্ষেত্র নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোরের ইতিহাসও কম নয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কেন্দ্র ও রাজ্য—দুই স্তরের প্রশাসনিক সমন্বয়, জমি, পরিকাঠামো এবং বিভিন্ন অনুমোদনের মতো একাধিক বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ফলে উৎপাদন শুরু হওয়ার পর তার কৃতিত্ব নিয়ে রাজনৈতিক তরজাও শুরু হয়েছে।
শমীক ভট্টাচার্য অবশ্য জানিয়েছেন, অশোকনগরের তৈলক্ষেত্রের বিষয়টি তিনি রাজ্যসভায় একাধিকবার তুলেছেন। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরীর কাছেও বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন বলে তাঁর দাবি। নিজের বক্তব্যের সমর্থনে কেন্দ্রের কাছে বিষয়টি তুলে ধরার বিভিন্ন নথি ও সামাজিক মাধ্যমে করা পোস্টও প্রকাশ করেছেন তিনি।
বিজেপির রাজ্য সভাপতির মতে, অশোকনগরে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়া বাংলার শিল্প সম্ভাবনার ক্ষেত্রে একটি বড় বার্তা। তাঁর বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গের মাটির নীচে প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সম্পদকে কাজে লাগাতে পারলে রাজ্যের অর্থনীতিতে নতুন গতি আসতে পারে।
তবে শুধু তেল উত্তোলন শুরু করলেই শিল্পক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আসবে না—পরিকাঠামো, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গে বিষয়টিকে যুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে। সেই কারণেই অশোকনগর প্রকল্পকে বৃহত্তর শিল্পনীতির অংশ হিসেবে দেখছেন শমীক।
তাঁর বক্তব্যের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল শিল্পক্ষেত্রে দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক জটিলতার অভিযোগ। তাঁর দাবি, রাজ্যে শিল্পের পরিবেশ তৈরি করতে হলে ‘দুর্নীতি, তোলাবাজি ও লাল ফিতার ফাঁস’ থেকে শিল্পক্ষেত্রকে মুক্ত করতে হবে। তাঁর মতে, কোনও বিনিয়োগকারী যদি দীর্ঘদিন ধরে অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করেন, তা হলে স্বাভাবিক ভাবেই বিনিয়োগের আগ্রহ কমতে পারে। ফলে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করাকে তিনি শিল্প বৃদ্ধির অন্যতম শর্ত হিসেবে তুলে ধরেছেন।
অশোকনগরের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়ায় স্থানীয় স্তরেও প্রত্যাশা বেড়েছে। একটি বড় জ্বালানি প্রকল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভাবে স্থানীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি পরিবহণ, পরিষেবা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্যান্য সহায়ক ক্ষেত্রেও অর্থনৈতিক কার্যকলাপ বাড়ার সম্ভাবনা থাকে।
অন্যদিকে, জ্বালানি উৎপাদনের ক্ষেত্রে এই প্রকল্পের প্রকৃত গুরুত্ব বোঝার জন্য ভবিষ্যতে উৎপাদনের পরিমাণ, ক্ষেত্রটির স্থায়িত্ব এবং বাণিজ্যিক ভাবে কতটা কার্যকর হয়—সেই বিষয়গুলিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। প্রাথমিক পর্যায়ের উৎপাদন সফল ভাবে এগিয়ে গেলে অশোকনগরের তেলক্ষেত্র নিয়ে আরও বড় পরিকল্পনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নেও স্থানীয় ভাবে উৎপাদিত অপরিশোধিত তেলের গুরুত্ব রয়েছে। ভারতের অপরিশোধিত তেলের প্রয়োজনের বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। সেই জায়গায় দেশের মাটিতে নতুন কোনও তেলক্ষেত্র থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়া স্বাভাবিক ভাবেই তাৎপর্যপূর্ণ। যদিও অশোকনগরের উৎপাদনের পরিমাণ জাতীয় চাহিদার তুলনায় কতটা বড় প্রভাব ফেলবে, তা ভবিষ্যতের উৎপাদন তথ্যের উপর নির্ভর করবে।
অশোকনগরের প্রকল্পকে তাই একদিকে যেমন স্থানীয় উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হচ্ছে, অন্যদিকে এটি বাংলার শিল্প-পরিবেশ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কেরও নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। বিজেপির বক্তব্য, এই প্রকল্প প্রমাণ করে রাজ্যে শিল্পের সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন প্রশাসনিক দ্রুততা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ।
শমীক ভট্টাচার্যের দাবি, বাংলার অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার জন্য নতুন শিল্প ও বিনিয়োগ প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্য, শুধু সরকারি প্রকল্প নয়, বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও রাজ্যকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। তবেই কর্মসংস্থানের নতুন দরজা খুলবে।
অশোকনগরে এখন সেই সম্ভাবনার বাস্তব পরীক্ষা শুরু হল। মাটির প্রায় আড়াই কিলোমিটার নীচে থাকা তেল এখন ট্যাঙ্কারে করে পৌঁছচ্ছে শোধনাগারে। বহু বছরের অপেক্ষার পর উৎপাদনের চাকা ঘুরেছে। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের কৌতূহলের পাশাপাশি রাজ্যের শিল্পমহলেও এই প্রকল্প নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক বিতর্ক অবশ্য এখানেই থামছে না। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কার ভূমিকা কতটা, এত বছর দেরির কারণ কী এবং আগামী দিনে উৎপাদন কতটা বাড়ানো সম্ভব—এই প্রশ্নগুলি সামনে রেখে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা। বিজেপি ইতিমধ্যেই অশোকনগরের সাফল্যকে সামনে রেখে পূর্বতন সরকারের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক গড়িমসির অভিযোগ তুলেছে।
সব মিলিয়ে, অশোকনগরের তৈলক্ষেত্রে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়া শুধু উত্তর ২৪ পরগনার একটি স্থানীয় ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার শিল্প সম্ভাবনা, জ্বালানি উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের বড় প্রশ্ন। ২৩৯৬ মিটার গভীরতা থেকে উঠে আসা অপরিশোধিত তেল তাই আপাতত অশোকনগরের মাটির নীচের সম্পদ হলেও, রাজনৈতিক মহলের কাছে সেটিই হয়ে উঠেছে বাংলার অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আশাবাদ এবং বিতর্কের প্রতীক।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments