Homeউত্তর ২৪ পরগনাঅশোকনগরঅশোকনগরে বাণিজ্যিক ভাবে তেল উত্তোলন শুরু, প্রতিদিন উঠবে ২০ হাজার লিটার! বদলাতে পারে বাংলার শিল্পের মানচিত্র

অশোকনগরে বাণিজ্যিক ভাবে তেল উত্তোলন শুরু, প্রতিদিন উঠবে ২০ হাজার লিটার! বদলাতে পারে বাংলার শিল্পের মানচিত্র

নিউজ ডেস্ক; উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগরে শুরু হয়ে গেল বাণিজ্যিক ভাবে অপরিশোধিত খনিজ তেল উত্তোলন। মাটির প্রায় ২,৩৯৬ মিটার গভীর
Screenshot 2026-08-28 164450_edited

নিউজ ডেস্ক; উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগরে শুরু হয়ে গেল বাণিজ্যিক ভাবে অপরিশোধিত খনিজ তেল উত্তোলন। মাটির প্রায় ২,৩৯৬ মিটার গভীর থেকে পাম্পের সাহায্যে তোলা হচ্ছে কাঁচা তেল। পরে বিশেষ ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে সেই অপরিশোধিত তেল পাঠানো হবে সংশোধনাগারে। আপাতত লক্ষ্য প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার লিটার তেল উত্তোলন করা। দীর্ঘদিনের অনুসন্ধান ও পরীক্ষামূলক উত্তোলনের পর অশোকনগর থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়াকে পশ্চিমবঙ্গের শিল্প ও জ্বালানি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

অশোকনগরের মাটির নীচে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সন্ধান অবশ্য নতুন নয়। প্রায় এক দশক আগে এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়ে মাটির নীচে বিপুল পরিমাণ খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সম্ভাব্য ভাণ্ডারের সন্ধান পেয়েছিল রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ওএনজিসি। এরপর একাধিক পর্যায়ে অনুসন্ধান, কূপ খনন এবং পরীক্ষামূলক উত্তোলনের কাজ চলে। ২০২০ সালে একটি কূপ থেকে পরীক্ষামূলক ভাবে প্রায় ৩৭৫ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উত্তোলন করা হয়েছিল। সেই সাফল্যের পর থেকেই অশোকনগরে বাণিজ্যিক উৎপাদনের সম্ভাবনা আরও জোরালো হয়।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রের কাছে তদ্বির করে আসছিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি তথা রাজ্যসভার সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য। অবশেষে শুক্রবার আনুষ্ঠানিক ভাবে বাণিজ্যিক তেল উত্তোলনের সূচনা হয়। ওএনজিসির ডিরেক্টর (এক্সপ্লোরেশন) ওপি সিনহা এবং অশোকনগরের বিধায়ক সুময় হীরা উপস্থিত থেকে এই পর্বের সূচনা করেন।

ওএনজিসির তরফে জানানো হয়েছে, অশোকনগর কেন্দ্রে বর্তমানে মোট ছ’টি কূপ রয়েছে। এর মধ্যে চারটি কূপ খনিজ তেলের জন্য এবং দু’টি প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। অর্থাৎ শুধু অপরিশোধিত তেল নয়, ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের ক্ষেত্রেও এই এলাকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সংস্থার সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০১৮ সালে যে কূপ থেকে প্রথম তেলের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল, তার উত্তর-পূর্ব দিকে প্রায় ৯৫ মিটার দূরে নতুন একটি কূপ খনন করা হয়েছে। সেই কূপ থেকেই বর্তমানে বাণিজ্যিক ভাবে তেল তোলার কাজ চলছে। ইতিমধ্যেই সেখানে পাম্পজ্যাক চালু করা হয়েছে। আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে বিভিন্ন শিফটে উৎপাদন চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। উৎপাদন সফল হলে ভবিষ্যতে আরও কয়েকটি কূপ খনন করে উত্তোলনের পরিমাণ বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

অশোকনগরের বাইগাছি এলাকাই আপাতত এই প্রকল্পের মূল কেন্দ্র। তবে শুধু বাইগাছিতে প্রকল্প সীমাবদ্ধ থাকছে না। অশোকনগরের ভুরকুণ্ডা, দৌলতপুর-সহ আরও কয়েকটি এলাকায় অনুসন্ধান ও খননকাজ চালাচ্ছে ওএনজিসি। সংস্থার তরফে ইঙ্গিত মিলেছে, ভবিষ্যতে এই এলাকাগুলিতেও তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের কাজ শুরু হতে পারে। ফলে অশোকনগরকে ঘিরে বড় একটি তেল-গ্যাস উৎপাদন ক্ষেত্র গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

গোটা প্রকল্পে ইতিমধ্যেই প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। আগামী দিনে আরও কূপ খনন এবং পরিকাঠামো তৈরির কাজ এগোলে বিনিয়োগের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে প্রকল্পকে ঘিরে স্থানীয় অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রাস্তা, পরিবহণ, পরিষেবা এবং বিভিন্ন সহায়ক পরিকাঠামোর উন্নয়ন হলে এলাকার সামগ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থারও পরিবর্তন হতে পারে।

অশোকনগরে তোলা অপরিশোধিত তেলের গুণমান নিয়েও আশাবাদী ওএনজিসি কর্তৃপক্ষ। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাইগাছি এলাকার কাঁচা তেলের এপিআই গ্র্যাভিটি প্রায় ৪০-৪১। এপিআই গ্র্যাভিটি মূলত কোনও অপরিশোধিত তেল জলের তুলনায় কতটা ভারী বা হালকা, তা বোঝার একটি পরিমাপ। এই মানের তেলকে গুণমানের বিচারে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদন ক্ষেত্র বম্বে হাইয়ের তেলের সঙ্গে তুলনীয় বলে দাবি করা হয়েছে।

ওএনজিসির ডিরেক্টর (এক্সপ্লোরেশন) ওপি সিনহা জানিয়েছেন, কয়েক বছর আগে তেল উত্তোলনের ক্ষেত্রে যান্ত্রিক সমস্যার কারণে কাজ ব্যাহত হয়েছিল। তবে তার অর্থ এই নয় যে তেলের মজুত শেষ হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি সম্ভাবনাময় তেলক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া যায়। বর্তমানে অশোকনগরের একাধিক জায়গায় অনুসন্ধান চালিয়ে উত্তোলনের সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে যে তেল উত্তোলন হচ্ছে, তার গুণমান আগের তুলনায় আরও ভালো। সেই কারণেই একাধিক জায়গায় নতুন করে বোরিং করার প্রস্তুতি চলছে। আগামী দিনে কী ভাবে আরও বেশি পরিমাণে তেল ও গ্যাস উত্তোলন করা যায়, সেই লক্ষ্যেই কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

তবে অশোকনগর থেকে ওঠা তেল সরাসরি পেট্রল বা ডিজেল হিসেবে ব্যবহার করা হবে না। প্রথমে অপরিশোধিত তেলকে প্রক্রিয়াকরণের জন্য সংশোধনাগারে পাঠানো হবে। কাঁচা তেলের সঙ্গে থাকা জল এবং অন্যান্য উপাদান আলাদা করার পরে পরিশোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য তৈরি করা হবে। অর্থাৎ অশোকনগরের প্রকল্প থেকে উত্তোলিত কাঁচা তেল পরবর্তী ধাপে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হবে।

ওপি সিনহা আরও জানান, দেশের প্রয়োজনীয় তেল-গ্যাসের একটি বড় অংশ বর্তমানে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো গেলে আমদানিনির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। অশোকনগর এবং আশপাশের এলাকায় আরও অনুসন্ধান চালিয়ে যদি বড় মজুতের সন্ধান মেলে, তা হলে দীর্ঘমেয়াদে পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাতেও এই প্রকল্পের অবদান থাকতে পারে।

তবে প্রকল্প সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে জমি পাওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে জানিয়েছেন ওএনজিসি কর্তা। কারণ, নতুন কূপ খনন এবং ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় জমি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে তেল ও গ্যাস উত্তোলনের সঙ্গে যুক্ত ভারী যানবাহন চলাচল করবে বলে নতুন রাস্তা তৈরির প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বর্তমান রাজ্য সরকারের সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

প্রকল্পকে কেন্দ্র করে শুধু শিল্প ও জ্বালানি উৎপাদন নয়, স্থানীয় পরিকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনাও রয়েছে। বাইগাছি ওএনজিসি কেন্দ্রে যাওয়ার কাঁচা রাস্তা পাকা করার কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। পাশাপাশি অশোকনগরের স্কুল, কলেজ ও হাসপাতাল-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নমূলক কাজে সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছে সংস্থা। স্থানীয় যুবকদেরও বিভিন্ন ভাবে প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

অশোকনগরের বিধায়ক সুময় হীরাও জানিয়েছেন, যান্ত্রিক সমস্যার কারণে এত দিন গোটা প্রক্রিয়া আটকে ছিল। সেই প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধান হওয়াতেই ফের কাজ শুরু করা সম্ভব হয়েছে। আপাতত বাইগাছির একটি কূপ থেকে উৎপাদন চলছে। আরও চারটি বোর করার পরিকল্পনা রয়েছে। জমি সংক্রান্ত যে সমস্যার কারণে কয়েকটি এলাকায় কাজ আটকে ছিল, সেগুলিও অনেকটাই মিটে গিয়েছে বলে তাঁর দাবি। ফলে আগামী দিনে সেখানেও কাজ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সব মিলিয়ে অশোকনগরে বাণিজ্যিক ভাবে তেল উত্তোলন শুরু হওয়াকে শুধু একটি নতুন তেলকূপের উৎপাদন শুরুর ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাজ্যের শিল্প, পরিকাঠামো, কর্মসংস্থান এবং জ্বালানি অর্থনীতির সম্ভাবনা। আপাতত প্রতিদিন ২০ হাজার লিটার তেল উত্তোলনের লক্ষ্য নেওয়া হলেও ভবিষ্যতে নতুন কূপ থেকে উৎপাদন শুরু হলে পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। দীর্ঘদিনের অনুসন্ধানের পর অশোকনগরের মাটির নীচের সম্পদকে বাস্তব উৎপাদনে নিয়ে আসার এই উদ্যোগ আগামী দিনে বাংলার শিল্প মানচিত্রে কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved