Homeকলকাতারাখির বন্ধনে স্কুলে পরিবার, স্মার্ট ক্লাসে আধুনিক শিক্ষার ছোঁয়া শ্যামপুরের রামেশ্বরপুরে

রাখির বন্ধনে স্কুলে পরিবার, স্মার্ট ক্লাসে আধুনিক শিক্ষার ছোঁয়া শ্যামপুরের রামেশ্বরপুরে

নিউজ ডেস্ক : রাখি মানেই শুধু ভাই-বোনের সম্পর্কের উদ্‌যাপন নয়। স্নেহ, ভালোবাসা, পারস্পরিক আস্থা এবং সম্পর্কের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করার
ChatGPT Image Aug 28, 2026, 05_19_32 PM

নিউজ ডেস্ক : রাখি মানেই শুধু ভাই-বোনের সম্পর্কের উদ্‌যাপন নয়। স্নেহ, ভালোবাসা, পারস্পরিক আস্থা এবং সম্পর্কের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করার প্রতীক হিসেবেই পালিত হয় রাখিবন্ধন উৎসব। তবে শ্যামপুরের রামেশ্বরপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ বার রাখির তাৎপর্য যেন আরও একটু বিস্তৃত। সেখানে উৎসবের কেন্দ্রবিন্দুতে যেমন ছিল খুদে পড়ুয়াদের আনন্দ, তেমনই ছিল শিক্ষক, অভিভাবক এবং বিদ্যালয়ের মধ্যে সম্পর্ক আরও মজবুত করার বার্তা। একেবারে পারিবারিক আবহে পালিত হল রাখিবন্ধন উৎসব।

বিদ্যালয় চত্বর জুড়ে এ দিন ছিল উৎসবের আমেজ। শিক্ষক-শিক্ষিকা, পড়ুয়া এবং অভিভাবকদের উপস্থিতিতে রাখি উৎসব হয়ে উঠেছিল মিলনমেলার মতো। খুদে পড়ুয়ারা একে অপরের হাতে রাখি পরিয়ে দেয়। চলে মিষ্টিমুখ, শুভেচ্ছা বিনিময় এবং আনন্দ-উচ্ছ্বাস। স্কুলের পরিবেশে উৎসবের সেই পরিচিত রং থাকলেও তার সঙ্গে মিশে ছিল শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও—শিশুর সার্বিক বিকাশে বিদ্যালয় এবং পরিবারের মধ্যে সমন্বয় কতটা জরুরি।

রামেশ্বরপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সারা বছরই বিভিন্ন উৎসব, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং নানা ধরনের বিশেষ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। সেই অনুষ্ঠানগুলিতে শুধু স্কুলের পড়ুয়া কিংবা শিক্ষক-শিক্ষিকাদের উপস্থিতি নয়, অভিভাবকদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মতে, শিশুর শিক্ষা কেবল বই, খাতা এবং শ্রেণিকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। বাড়ি ও স্কুল—দুই জায়গার পরিবেশ এবং পারস্পরিক সহযোগিতাই একটি শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।

সেই ভাবনারই প্রতিফলন দেখা গেল রাখিবন্ধন উৎসবেও। অভিভাবকদের সক্রিয় উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানের পরিসর আরও বড় হয়ে ওঠে। সন্তানদের সঙ্গে একই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তাঁরাও উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেন। ফলে শিক্ষক, পড়ুয়া এবং অভিভাবকদের মধ্যে যোগাযোগের জায়গাটিও আরও শক্তিশালী হয়। বিদ্যালয় চত্বরের পরিবেশ দেখে মনে হচ্ছিল, এটি যেন কোনও আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান নয়, বরং একটি বড় পরিবারের মিলন।

এ দিনের অনুষ্ঠানে বিদ্যালয় পরিদর্শকের উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। স্কুলের এই ধরনের উদ্যোগের প্রশংসা করেন উপস্থিত সকলেই। কারণ পড়াশোনার পাশাপাশি সামাজিক মূল্যবোধ, পারস্পরিক সম্মান, সহযোগিতার মানসিকতা এবং সাংস্কৃতিক চেতনা তৈরি করাও প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই জায়গা থেকেই উৎসবগুলিকে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছে রামেশ্বরপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়।

তবে উৎসবের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য যে শিক্ষার মানোন্নয়ন, সেটিও স্পষ্ট। বর্তমান সময়ে শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দিয়ে একজন পড়ুয়াকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব নয়। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিশুদের শেখার পদ্ধতিতেও পরিবর্তন প্রয়োজন। সেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েই রামেশ্বরপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্মার্ট ক্লাসের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

প্রযুক্তির সাহায্যে বিভিন্ন বিষয়কে আরও সহজ ও আকর্ষণীয় করে পড়ুয়াদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা চলছে। প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি অডিয়ো-ভিজুয়াল উপকরণ ব্যবহার করলে ছোটদের শেখার আগ্রহ বাড়ে। কোনও কঠিন বিষয়কে ছবি, অ্যানিমেশন কিংবা দৃশ্যের মাধ্যমে বোঝানো হলে তা অনেক সহজে মনে রাখা সম্ভব। ফলে স্মার্ট ক্লাসের মাধ্যমে পড়াশোনাকে শুধু পরীক্ষামুখী না রেখে আরও আনন্দদায়ক করে তোলার লক্ষ্য রয়েছে বিদ্যালয়ের।

শিক্ষার পাশাপাশি পড়ুয়াদের সৃজনশীল বিকাশেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাঠ্যক্রমের বাইরে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক এবং সহ-পাঠক্রমিক কর্মকাণ্ডে শিশুদের অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানো, নিজের ভাবনা প্রকাশের ক্ষমতা তৈরি করা এবং দলগত ভাবে কাজ করার অভ্যাস গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।

বিদ্যালয়ের ভাবনায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল পড়ুয়াদের পুষ্টি। শিশুদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে পুষ্টিকর খাবারের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই মিড-ডে মিলের পাশাপাশি মাসে এক দিন বিশেষ খাবারের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, শিশুর পেট যদি খালি থাকে, তা হলে মন দিয়ে পড়াশোনা করাও কঠিন। তাই শিক্ষার সঙ্গে পুষ্টির বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

রামেশ্বরপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সৌরদীপ জানা জানান, একটি শিশুর সার্বিক বিকাশের জন্য শুধু পড়াশোনার দিকে নজর দিলেই হবে না। শিক্ষা, সংস্কৃতি, আনন্দ, পুষ্টি এবং পরিবারের সঙ্গে সুসম্পর্ক—সবকিছুকেই একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। সেই লক্ষ্যেই স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানকে শুধুমাত্র উৎসব হিসেবে না দেখে শেখার একটি সুযোগ হিসেবেও ব্যবহার করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

রাখিবন্ধন সেই প্রচেষ্টারই একটি উদাহরণ। রাখির ছোট্ট সুতো যেমন ভাই-বোনের সম্পর্কের প্রতীক, তেমনই স্কুলের এই আয়োজন শিক্ষক, পড়ুয়া এবং অভিভাবকদের সম্পর্ককেও আরও দৃঢ় করার বার্তা দিয়েছে। উৎসবের দিনে শিশুরা আনন্দ করেছে, অভিভাবকেরা পাশে থেকেছেন, শিক্ষকরা অংশ নিয়েছেন—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে একটি আপন পরিবেশ।

বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আশা, এই ধরনের উদ্যোগ আগামী দিনে শিশুদের শুধু পড়াশোনায় নয়, জীবনবোধেও সমৃদ্ধ করবে। প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয় যেমন তাদের আধুনিক বিশ্বের জন্য প্রস্তুত করবে, তেমনই সাংস্কৃতিক চর্চা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ড তাদের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখবে। আর পুষ্টির দিকে নজর রেখে সুস্থ পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাবে তারা।

সব মিলিয়ে শ্যামপুরের রামেশ্বরপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রাখিবন্ধন উৎসব তাই নিছক একটি বার্ষিক অনুষ্ঠান হয়ে থাকল না। রাখির সুতোয় সেখানে একদিকে যেমন জুড়ল ভালোবাসা ও স্নেহের সম্পর্ক, অন্যদিকে শিক্ষক, পড়ুয়া ও অভিভাবকদের মধ্যে তৈরি হল আরও দৃঢ় যোগাযোগ। উৎসবের আনন্দকে শিক্ষার সঙ্গে মিলিয়ে আগামী প্রজন্মকে আরও আত্মবিশ্বাসী, সৃজনশীল এবং দায়িত্বশীল করে তোলার যে প্রয়াস চলছে, সেই উদ্যোগই এ দিনের অনুষ্ঠানে বিশেষ তাৎপর্য পেল।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved