
নিউজ ডেস্ক: বিধানসভার গ্রন্থাগার থেকে বই নেওয়া এবং তা ফেরত না দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে ফের শুরু হয়েছে চাপানউতোর। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি বই চুরির অভিযোগ তুলেছিলেন রাজ্যের গ্রন্থাগারমন্ত্রী গৌরশঙ্কর ঘোষ। শুক্রবার কলকাতার ক্যাথিড্রাল রোডে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠা দিবসের সভা থেকে সেই অভিযোগের তীব্র জবাব দিলেন মমতা। তাঁর দাবি, অভিযোগ সত্যি হলে তা প্রমাণ করতে হবে। প্রমাণ না হলে অভিযোগকারীকেই জবাবদিহি করতে হবে।
এ দিনের সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মমতা বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে বই চুরির অভিযোগ তোলা হয়েছে। সেই অভিযোগের প্রমাণ প্রকাশ্যে আনার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন তিনি। মমতার কথায়, অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারলে অভিযোগকারীকে ‘নাক খত’ দিতে হবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, তাঁর মতো একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের লাইব্রেরির বই চুরি করার প্রয়োজন নেই। বরং নিজের উদ্যোগে একাধিক লাইব্রেরি তৈরি করে দেওয়ার সামর্থ্য তাঁর রয়েছে।
নিজের বক্তব্যে মমতা আরও দাবি করেন, বহু লেখক-লেখিকার বই তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে রয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সাত বার সাংসদ এবং চার বার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী থাকার পরও তিনি নিজেকে ‘লেস ইমপরট্যান্ট পার্সন’ বা তুলনামূলক ভাবে সাধারণ মানুষ হিসেবেই দেখতে পছন্দ করেন। মুখ্যমন্ত্রী পদটিকেও নিজের পরিচয়ের প্রধান অংশ হিসেবে তুলে ধরতে তিনি আগ্রহী নন বলে জানান।
সভামঞ্চ থেকে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও রাজ্য সরকারের সমালোচনা করেন মমতা। তাঁর দাবি, মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি সাধারণ মানুষের যাতায়াতের কথা মাথায় রেখে রাস্তা বন্ধ করে বড় কনভয় চলাচল পছন্দ করতেন না। বর্তমান ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা টেনে তিনি প্রশ্ন তোলেন, কী ভাবে একাধিক গাড়ির কনভয় নিয়ে যাতায়াত করা হচ্ছে।
কয়েক দিন আগে বীরভূমে গিয়ে গ্রন্থাগারমন্ত্রী গৌরশঙ্কর ঘোষ দাবি করেছিলেন, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিধানসভা থেকে বেশ কিছু বই নিয়েছিলেন। তাঁর অভিযোগ, সেই বইগুলির কয়েকটি এখনও ফেরত দেওয়া হয়নি। বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজন হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।
মন্ত্রী আরও বলেছিলেন, আইন সবার জন্য সমান। ফলে কোনও রাজনৈতিক পরিচয় বা পদমর্যাদার ভিত্তিতে আলাদা নিয়ম প্রযোজ্য হওয়ার প্রশ্ন নেই। তাঁর এই মন্তব্যের পরেই বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয় জোর চর্চা।
শুধু বই ফেরত দেওয়ার প্রসঙ্গেই থেমে থাকেননি গ্রন্থাগারমন্ত্রী। তাঁর দাবি ছিল, রাজ্য সরকারের অধীন বিভিন্ন গ্রন্থাগার থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা বই সরিয়ে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হবে। ফলে অভিযোগটি রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি রাজ্যের গ্রন্থাগার ব্যবস্থার সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ে।
বই বিতর্কের পাশাপাশি শুক্রবারের সভা থেকে সাম্প্রতিক ক্যামাক স্ট্রিটের ঘটনাকেও রাজনৈতিক আক্রমণের হাতিয়ার করেন মমতা। সেখানে গ্যাস কাটার ব্যবহারের অভিযোগ তুলে তিনি প্রশ্ন করেন, ওই সরঞ্জাম নিয়ে কেন সেখানে যাওয়া হয়েছিল।
মমতার বক্তব্যের মূল সুর ছিল, ঘটনাটির পিছনে কোনও নথি বা সম্পত্তি সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে ‘চুরি’ কিংবা ‘লুঠের’ উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা। তিনি অতীতের বিভিন্ন ঘটনাকেও টেনে এনে বিরোধীদের বিরুদ্ধে সরব হন।
ফলে একই সভায় একদিকে বিধানসভার গ্রন্থাগার থেকে বই নেওয়ার অভিযোগের জবাব দিলেন মমতা, অন্যদিকে ক্যামাক স্ট্রিটের ঘটনাকে ঘিরে পাল্টা প্রশ্ন তুলে দিলেন তিনি। রাজনৈতিক মহলের নজর এখন দুই পক্ষের পরবর্তী বক্তব্যের দিকে।
তবে বই নেওয়া বা ফেরত না দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা নিয়ে এখনও প্রকাশ্যে কোনও নথি বা প্রমাণ সামনে আসেনি—অন্তত এই বক্তব্যগুলির পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি রাজনৈতিক অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের পর্যায়েই রয়েছে। ফলে গ্রন্থাগার থেকে বই নেওয়ার বিষয়ে বিধানসভার নথি বা লাইব্রেরির রেকর্ড সামনে আসে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
রাজনৈতিক সংঘাতের আবহে এই বিতর্ক যে দ্রুত থামছে না, শুক্রবারের সভায় মমতার কড়া প্রতিক্রিয়াতেই তার ইঙ্গিত মিলেছে। অভিযোগের প্রমাণ চেয়ে তাঁর সরাসরি চ্যালেঞ্জের পর এখন গ্রন্থাগারমন্ত্রীর তরফে কী জবাব আসে, সেদিকেই তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments