
নিউজ ডেস্ক; যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯ অগস্ট রাত থেকে ২০ অগস্ট দিনভর ঘটে যাওয়া ঘটনাবলির প্রকৃত সত্য সামনে আনতে অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার চার সদস্যের তদন্ত কমিটি প্রথম বৈঠকে বসে। কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি প্রণব চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন এই কমিটি ঘটনার সঙ্গে যুক্ত সমস্ত পক্ষের বক্তব্য ও প্রামাণ্য তথ্য সংগ্রহ করে গোটা পরিস্থিতি খতিয়ে দেখবে।
তদন্ত কমিটির প্রথম বৈঠক হয় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সল্টলেক ক্যাম্পাসে। বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ বৈঠক শুরু হয়। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে আলোচনার পর দুপুর ১টা নাগাদ বৈঠক শেষ হয়। এ দিনের বৈঠকে মূলত তদন্ত কী ভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে, কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ করা হবে এবং পরবর্তী পর্যায়ে কোন কোন পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা নিয়ে আলোচনা হয়।
চার সদস্যের এই কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি প্রণব চট্টোপাধ্যায়। কমিটির অন্যতম সদস্য প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইকিউএসি সেলের ডিরেক্টর অধ্যাপক সৌমেন্দু চট্টোপাধ্যায়। এছাড়াও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই আধিকারিক এই কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেন। বৃহস্পতিবারের বৈঠকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অমিতাভ দত্তও উপস্থিত ছিলেন।
তদন্তের শুরুতেই সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিটি। খুব শীঘ্রই একটি সাধারণ বিজ্ঞপ্তি বা পাবলিক নোটিস জারি করা হবে বলে জানিয়েছেন কমিটির চেয়ারম্যান। ওই বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ১৯ ও ২০ অগস্টের ঘটনাবলি সম্পর্কে যাঁদের কাছে কোনও প্রত্যক্ষ তথ্য রয়েছে, তাঁদের কাছ থেকে লিখিত বয়ান চাওয়া হবে। একই সঙ্গে কারও কাছে থাকা ছবি, ভিডিয়ো ফুটেজ কিংবা ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত অন্য কোনও নথিও জমা দেওয়ার আবেদন জানানো হবে।
কমিটির মতে, ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং বিভিন্ন সময়ে ধারণ করা ছবি ও ভিডিয়ো তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তাই কোনও একটি পক্ষের বক্তব্যের উপর নির্ভর না করে যত বেশি সম্ভব সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে চাইছে তদন্ত কমিটি। সেই তথ্যগুলি পর্যালোচনা ও যাচাই করার পর প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ডেকে তাঁদের বক্তব্য নেওয়া হবে।
বৈঠক শেষে বিচারপতি প্রণব চট্টোপাধ্যায় জানান, তদন্তের সঠিক পদ্ধতি নির্ধারণ এবং আগামী দিনে কী ভাবে কাজ এগোবে, তার রূপরেখা তৈরি করতেই প্রথম বৈঠক ডাকা হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য, খুব শীঘ্রই কমিটির তরফে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। ১৯ ও ২০ অগস্টের ঘটনাবলি সম্পর্কে যাঁদের কাছে তথ্য, ছবি বা ভিডিয়ো রয়েছে, তাঁরা যেন সেগুলি তদন্ত কমিটির কাছে জমা দেন। এ জন্য ন্যূনতম ১০ দিনের সময়সীমা দেওয়া হবে।
তবে শুধু তথ্য সংগ্রহ করলেই তদন্ত শেষ হবে না। জমা পড়া নথি, ছবি ও ভিডিয়ো খুঁটিয়ে পরীক্ষা করার পর প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন ব্যক্তিকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। কার বক্তব্যের সঙ্গে কোন তথ্যের মিল রয়েছে, কোন দাবির পক্ষে প্রামাণ্য উপাদান রয়েছে এবং ঘটনার ধারাবাহিকতা ঠিক কী ছিল—সেগুলিও খতিয়ে দেখা হবে।
কমিটির এক সদস্য জানিয়েছেন, তদন্ত শেষ করতে ঠিক কত সময় লাগবে, তা এই মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়। কারণ তদন্তের সময়সীমা অনেকটাই নির্ভর করবে কতগুলি অভিযোগ সামনে আসছে এবং তদন্ত কমিটির হাতে কী ধরনের তথ্য ও নথি পৌঁছচ্ছে, তার উপর। অভিযোগের সংখ্যা বেশি হলে কিংবা বিভিন্ন ধরনের তথ্য ও প্রমাণ সামনে এলে সেগুলি যাচাই করতে স্বাভাবিকভাবেই আরও সময় লাগতে পারে।
তবে তদন্ত যাতে অযথা দীর্ঘায়িত না হয়, সে বিষয়েও কমিটির তরফে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ এবং যাচাইয়ের কাজ দ্রুত শেষ করে তদন্তকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে কমিটির।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন মতাদর্শে বিশ্বাসী একাধিক ছাত্র সংগঠনও সক্রিয়। ফলে ১৯ ও ২০ অগস্টের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যও আলাদা হতে পারে। সেই কারণে তদন্তের ক্ষেত্রে কোনও একটি পক্ষকে গুরুত্ব না দিয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিটি।
কমিটির তরফে জানানো হয়েছে, শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী এবং বিভিন্ন মতাদর্শের ছাত্রছাত্রীদের সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বসা হবে। তাঁদের বক্তব্য শোনা হবে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এর ফলে ঘটনার বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য সামনে আসার পাশাপাশি পরিস্থিতির একটি তুলনামূলক নিরপেক্ষ ছবি তৈরি করা সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই তদন্তের লক্ষ্য শুধু অতীতে কী ঘটেছিল তা খুঁজে বার করা নয়। ভবিষ্যতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতে একই ধরনের অনভিপ্রেত পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখছে তদন্ত কমিটি। তদন্ত শেষে প্রয়োজন হলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিক সুপারিশ পেশ করা হতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ, বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সমন্বয়, পড়ুয়াদের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার পদ্ধতি—এই বিষয়গুলির উপর ভিত্তি করেই সুপারিশ তৈরি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। অর্থাৎ, তদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্টে শুধু ঘটনার দায় বা কারণ চিহ্নিত করার বদলে ভবিষ্যতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, সেই বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে পারে।
বৃহস্পতিবারের বৈঠকের পর এখন তদন্ত কমিটির পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হল পাবলিক নোটিস প্রকাশ করা। এরপর প্রত্যক্ষদর্শী এবং ঘটনার বিষয়ে ওয়াকিবহাল ব্যক্তিদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ শুরু হবে। ন্যূনতম ১০ দিনের সময়সীমায় কতগুলি তথ্য, ছবি ও ভিডিয়ো কমিটির হাতে আসে, তার উপরই তদন্তের পরবর্তী গতিপথ অনেকটা নির্ভর করবে।
জানা গিয়েছে, তদন্ত কমিটির পরবর্তী বৈঠক আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর। তার আগে সংগৃহীত তথ্য ও নথি প্রাথমিক ভাবে পর্যালোচনা করা হতে পারে। সেই পর্যালোচনার ভিত্তিতে পরবর্তী পর্যায়ে কাদের সঙ্গে কথা বলা হবে এবং তদন্তের কোন দিকগুলিতে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করতে পারে কমিটি।
ফলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯ ও ২০ অগস্টের ঘটনাবলি নিয়ে তদন্তের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়ে গেল বৃহস্পতিবার। এখন নজর থাকবে পাবলিক নোটিস প্রকাশ এবং তার পরে বিভিন্ন পক্ষের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের উপর। সেই তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই শেষ পর্যন্ত ঘটনার একটি পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য ছবি তুলে ধরার চেষ্টা করবে অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments