
নিউজ ডেস্ক; রোগীর চিকিৎসা হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ, অথচ বাস্তবে সেই চিকিৎসার সঙ্গে মিল নেই হাসপাতালের নথিপত্রে। কোথাও আবার অস্ত্রোপচার হওয়া রোগীকে মেডিক্যাল ম্যানেজমেন্টের প্যাকেজে দেখানোর অভিযোগ। এমনকি যে সার্জিক্যাল প্যাকেজ স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে নিষিদ্ধ, সেটি এড়াতে অন্য প্যাকেজ ‘ব্লক’ করে ক্লেম করার অভিযোগও উঠেছে। পূর্ব বর্ধমানের একটি বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের মেডিক্যাল অডিটে এমনই একাধিক গুরুতর অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। মোট ১৪টি ক্ষেত্রে গরমিলের প্রমাণ মেলায় হাসপাতালটিকে শো-কজ় করেছে স্বাস্থ্য দপ্তরের স্টেট সার্ভেল্যান্স টিম বা এসএসটি।
স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের আওতায় বেসরকারি হাসপাতালগুলির চিকিৎসা ও বিল সংক্রান্ত অনিয়ম নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে। চিকিৎসার প্রয়োজন না থাকলেও রোগী ভর্তি দেখানো, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি দিন হাসপাতালে রেখে বিল তৈরি করা কিংবা এক ধরনের চিকিৎসার পরিবর্তে অন্য কোনও প্যাকেজের অধীনে টাকা দাবি করার মতো অভিযোগ সামনে এসেছে আগেও। পূর্ব বর্ধমানের এই হাসপাতালের ক্ষেত্রে মেডিক্যাল অডিটে নথি এবং বাস্তবে দেওয়া চিকিৎসার মধ্যে বিস্তর ফারাক ধরা পড়ায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
স্বাস্থ্য দপ্তরের এসএসটি-র পাঠানো নোটিস অনুযায়ী, পূর্ব বর্ধমানের আহাদ হাসপাতালের ১৪টি রোগী-সংক্রান্ত ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসাথীর জন্য ‘ব্লক’ করা প্যাকেজের সঙ্গে বাস্তবে রোগীর চিকিৎসার সামঞ্জস্য পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, হাসপাতাল যে চিকিৎসার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট প্যাকেজের দাবি করেছিল, অডিটের সময় সেই দাবির সঙ্গে চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথিপত্রের মিল খুঁজে পাননি অডিটররা।
অডিটে এমনও দেখা গিয়েছে, দু’জন রোগী অস্ত্রোপচারের পরবর্তী চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। কিন্তু অডিটের সময় পর্যন্ত তাঁদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা-পদ্ধতির প্যাকেজই ব্লক করা হয়নি। এই বিষয়টিকে নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে স্বাস্থ্য দপ্তর।
অন্য একটি ক্ষেত্রে আরও গুরুতর অসঙ্গতির অভিযোগ রয়েছে। অস্ত্রোপচার করা হয়েছে এমন রোগীকে ‘সার্জিক্যাল’ প্যাকেজে না দেখিয়ে ‘মেডিক্যাল ম্যানেজমেন্ট’ প্যাকেজের আওতায় দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট সার্জিক্যাল প্যাকেজটি নিষিদ্ধ হওয়ায় অন্য প্যাকেজের মাধ্যমে চিকিৎসার দাবি দেখানো হয়েছিল কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে অডিট টিম।
অর্থোপেডিক্স-সহ বিভিন্ন সার্জিক্যাল প্যাকেজের ক্ষেত্রেও অসঙ্গতির উল্লেখ রয়েছে এসএসটির নোটিসে। বিশেষ করে ‘গেটকিপিং সার্জিক্যাল প্রক্রিয়া’ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। কোনও সার্জিক্যাল চিকিৎসা বা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে সেটির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নির্দিষ্ট প্যাকেজের অধীনে তা নথিভুক্ত ও ক্লেম করার কথা। কিন্তু অভিযোগ, তার পরিবর্তে সম্পূর্ণ ভিন্ন বা সম্পর্কহীন কোনও প্রক্রিয়ার প্যাকেজ ‘ব্লক’ করা হয়েছে।
এ ধরনের পদ্ধতিতে বাস্তবে যে চিকিৎসা হয়েছে, তার সঙ্গে স্বাস্থ্যসাথীর আওতায় দাবি করা প্যাকেজের মধ্যে ফারাক তৈরি হয়। ফলে সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্পের অর্থের সঠিক ব্যবহার হয়েছে কি না, তা নিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন ওঠে। পূর্ব বর্ধমানের ওই হাসপাতালের ক্ষেত্রেও এই ধরনের একাধিক গরমিল অডিটে চিহ্নিত হয়েছে বলে স্বাস্থ্য দপ্তরের নোটিসে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্পাইন সার্জারির ক্ষেত্রেও অডিটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। নোটিসে উল্লেখ করা হয়েছে, যে ধরনের স্পাইন সার্জারি নিউরোসার্জেনের করার কথা, সেটি অর্থোপেডিক সার্জনের মাধ্যমে করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা কী পরিস্থিতিতে এবং কোন চিকিৎসকের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে, সেই বিষয়ে হাসপাতালের কাছ থেকে ব্যাখ্যা চেয়েছে স্বাস্থ্য দপ্তর।
শুধু মৌখিক ব্যাখ্যা নয়, হাসপাতালকে যাবতীয় সংশ্লিষ্ট নথি-সহ লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে। অডিটে চিহ্নিত প্রতিটি অসঙ্গতির বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি, প্যাকেজ ব্লকের তথ্য এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র খতিয়ে দেখার পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
স্বাস্থ্য দপ্তরের তরফে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, হাসপাতালের দেওয়া ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হলে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের নির্দেশিকা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। অর্থাৎ, শো-কজ় নোটিসের জবাব এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনার পর হাসপাতালের বিরুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপের সম্ভাবনা রয়েছে।
এই ঘটনা সামনে আসার পর স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে নজরদারি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এতগুলি ক্ষেত্রে চিকিৎসা ও প্যাকেজের মধ্যে গরমিল কী ভাবে ধরা পড়ল এবং নিয়মিত নজরদারির সময় তা আগে চিহ্নিত হয়েছিল কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে বিপুল অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে এবং নজরদারির ব্যবস্থাতেও ফাঁক ছিল। তাঁর দাবি, আয়ুষ্মান ভারত বা মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনার ক্ষেত্রে যাতে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা হবে।
বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিংহোমগুলির সংগঠনও বিষয়টি নিয়ে সতর্কতার কথা জানিয়েছে। ওয়েস্টবেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন অফ প্রাইভেট হসপিটালস অ্যান্ড নার্সিংহোমসের সচিব রাজীব পাণ্ডে জানিয়েছেন, স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে অনিয়ম এবং কারচুপির অভিযোগ রয়েছে। নতুন করে যাতে একই ধরনের অভিযোগের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
রাজীব পাণ্ডের বক্তব্য, প্রকল্পে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং দুর্নীতির সুযোগ কমানোই অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত। তাঁর দাবি, স্বাস্থ্যসাথীর কয়েকটি প্যাকেজ এবং নিয়ম পুনর্বিবেচনা করার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে। নিয়ম ও প্যাকেজের কাঠামো আরও স্পষ্ট ও কার্যকর হলে অনিয়মের সুযোগ কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে বেসরকারি হাসপাতালগুলির সংগঠন।
পূর্ব বর্ধমানের এই হাসপাতালের ঘটনায় এখন নজর থাকবে শো-কজ়ের জবাবের দিকে। ১৪টি ক্ষেত্রে অডিটে যে অসঙ্গতিগুলি চিহ্নিত করা হয়েছে, সেগুলির বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কী ব্যাখ্যা দেয় এবং সেই ব্যাখ্যা স্বাস্থ্য দপ্তরের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হয়, তার উপরই পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করবে। একই সঙ্গে এই ঘটনায় স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের প্যাকেজ ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি আরও কড়া করার প্রয়োজনীয়তা ফের সামনে এল বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments