
নিউজ ডেস্ক: আগাম কোনও খবর নয়, রাতের অন্ধকারেই সরকারি হাসপাতালে হাজির রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। বৃহস্পতিবার রাতে পূর্ব বর্ধমানের বড়শুল ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আচমকা পরিদর্শনে যান তিনি। চিকিৎসা পরিষেবা থেকে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা, ওষুধের মজুত থেকে নিরাপত্তা—একাধিক বিষয় নিজের চোখে খতিয়ে দেখেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। রোগীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে তাঁদের অভিজ্ঞতাও জানতে চান তিনি।
রাত প্রায় ৯টা নাগাদ বড়শুল ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছন শারদ্বত। আচমকা মন্ত্রীকে হাসপাতালে দেখে স্বাভাবিক ভাবেই চাঞ্চল্য তৈরি হয়। প্রথমে জরুরি বিভাগ ঘুরে দেখেন তিনি। চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের সঙ্গেও কথা বলেন। চিকিৎসা পরিষেবা ঠিকমতো মিলছে কি না, কোনও সমস্যা হচ্ছে কি না—সরাসরি রোগীদের কাছ থেকেই তা জানার চেষ্টা করেন মন্ত্রী।
হাসপাতালের ওষুধের মজুত এবং সরবরাহ ব্যবস্থাও খতিয়ে দেখা হয়। ভ্যাকসিনের লগবুক, তাপমাত্রা সংক্রান্ত নথি, ওষুধের মেয়াদ এবং বিভিন্ন চিকিৎসা সামগ্রীও এলোমেলো ভাবে পরীক্ষা করেন তিনি বলে জানা গিয়েছে। ওষুধ ও ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের কোনও অনিয়ম তাঁর নজরে পড়েনি বলেই জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। চিকিৎসক ও নার্সিং স্টাফের পরিষেবা নিয়েও মোটের উপর সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন তিনি।
তবে হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারেননি মন্ত্রী। হাসপাতালের বিভিন্ন অংশে অপরিচ্ছন্নতা দেখে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ঘটনাস্থলেই সংশ্লিষ্ট কর্মীদের নিয়মিত এবং আরও ভালো ভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করার নির্দেশ দেন। অর্থাৎ চিকিৎসা পরিষেবা ঠিক থাকলেও হাসপাতালের পরিবেশ এবং স্যানিটেশন নিয়ে যে ঘাটতি রয়েছে, তা দ্রুত মেটানোর বার্তাই দেন তিনি।
বড়শুল থেকে রাত প্রায় ১০টা নাগাদ বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছন শারদ্বত। সেখানে জরুরি বিভাগ-সহ একাধিক জায়গা ঘুরে দেখেন তিনি। জুনিয়র চিকিৎসক, নার্সিং স্টাফ এবং রোগীদের পরিজনদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের সমস্যার কথা শোনেন। চিকিৎসকদের কাজের পরিবেশ কেমন, পরিষেবা দিতে গিয়ে কী ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে এবং হাসপাতালে কোথায় ঘাটতি রয়েছে—সেই বিষয়গুলিও জানতে চান তিনি।
পরিদর্শন শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, চিকিৎসা পরিষেবা নিয়ে রোগীদের কাছ থেকে বড় কোনও নেতিবাচক অভিযোগ তিনি পাননি। বরং অধিকাংশ রোগীই পরিষেবা নিয়ে সন্তুষ্ট বলে তাঁর দাবি। কিন্তু হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তাঁর অসন্তোষ রয়েছে।
বিশেষ করে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের জরুরি বিভাগের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন মন্ত্রী। মহিলা চিকিৎসকদের রেস্ট রুমের নিরাপত্তার বিষয়টিও তাঁর নজরে আসে। শারদ্বতের বক্তব্য, হাসপাতালের নিরাপত্তার পুরো দায়িত্ব শুধুমাত্র জেলা পুলিশের উপর ছেড়ে দেওয়া সম্ভব নয়। হাসপাতালের নিজস্ব বা ‘ইন-হাউস’ নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
জরুরি বিভাগে নার্সিং স্টাফের ঘাটতির কথাও উঠে আসে এদিনের পরিদর্শনে। পর্যাপ্ত নার্স না থাকলে চিকিৎসা পরিষেবার উপর তার প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। একই সঙ্গে চিকিৎসক এবং নার্সদের জন্য উপযুক্ত কর্মপরিবেশ তৈরি করার উপরও জোর দেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, স্বাস্থ্যকর্মীরা স্বাচ্ছন্দ্যে এবং নিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে পারলেই রোগীরা আরও ভালো পরিষেবা পাবেন।
বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে সাম্প্রতিক কিছু বিতর্ক নিয়েও সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। নম্বর টেম্পারিং সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে তিনি জানান, প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে ইতিমধ্যেই একজনকে সরানো হয়েছে এবং পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চলছে। একই সঙ্গে ‘থ্রেট কালচার’ নিয়েও কড়া বার্তা দেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, স্বাস্থ্যক্ষেত্রে ভয় নয়, আস্থা তৈরি করাই এখন লক্ষ্য।
শারদ্বতের এই আচমকা হাসপাতাল পরিদর্শন অবশ্য নতুন নয়। এর আগেও বারাসত মেডিক্যাল কলেজ ও আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আগাম না জানিয়ে গিয়ে বিভিন্ন খামতি খতিয়ে দেখেছিলেন তিনি। বারাসত পরিদর্শনের পর হাসপাতালের কর্মীদের শোকজ করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।
বর্ধমান সফরের পরও স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন, আগামী দিনেও এই ধরনের আচমকা পরিদর্শন চলবে। আগে থেকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে পরিদর্শনে গেলে বাস্তব পরিস্থিতির সম্পূর্ণ ছবি পাওয়া যায় না—এই কারণেই আচমকা গিয়ে পরিষেবা যাচাই করার উপর জোর দিচ্ছেন তিনি। একই সঙ্গে হাসপাতালের ভিতরে সংবাদমাধ্যমের প্রবেশের ক্ষেত্রে রোগীদের চিকিৎসা যাতে কোনও ভাবেই ব্যাহত না হয়, সেই বিষয়েও সতর্ক করেছেন।
সব মিলিয়ে, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর রাতের ‘সারপ্রাইজ় ভিজ়িটে’ বড়শুলে চিকিৎসা পরিষেবা নিয়ে সন্তোষ থাকলেও পরিচ্ছন্নতা নিয়ে অসন্তোষ সামনে এসেছে। অন্যদিকে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে উঠে এসেছে নার্সিং স্টাফের ঘাটতি এবং হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার প্রশ্ন। এখন দেখার, মন্ত্রীর নির্দেশের পর সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলিতে এই ঘাটতিগুলি কত দ্রুত মেরামত করা হয়।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments