
নিউজ ডেস্ক; কলকাতা পুরসভার প্রস্তাবিত ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস কার্যকর হলে শুধু রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক মানচিত্রই বদলাবে না, তার প্রভাব পড়তে পারে শহরের কয়েক লক্ষ সম্পত্তির কর ব্যবস্থাতেও। ১৪৪টি ওয়ার্ডের কলকাতা পুরসভাকে বাড়িয়ে ২০৯টি ওয়ার্ড করার প্রস্তাব রয়েছে। অর্থাৎ নতুন করে তৈরি হবে ৬৫টি ওয়ার্ড। আর এই পুনর্বিন্যাস কার্যকর হলে পুরসভার রাজস্ব বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, শহরের প্রায় ৯ লক্ষ প্লটের অ্যাসেসি নম্বর বদলে যেতে পারে। ফলে ট্যাক্সের বিল, বকেয়া কর এবং সম্পত্তির কর সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে নাগরিকদের একাংশের মধ্যে বিভ্রান্তির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পুরসভার রাজস্ব বিভাগের সঙ্গে যুক্ত আধিকারিকদের বক্তব্য, কলকাতা পুরসভার কর ব্যবস্থায় অ্যাসেসি নম্বর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই নম্বরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির ওয়ার্ড এবং প্লট নম্বরের সম্পর্ক রয়েছে। কোনও সম্পত্তির মালিকের কাছে পুরসভার কর সংক্রান্ত যে বিল আসে, সেখানে থাকা অ্যাসেসি নম্বরের মাধ্যমেই সম্পত্তিটির করের হিসাব শনাক্ত করা হয়। সেই নম্বর ধরে একজন সম্পত্তির মালিক জানতে পারেন, তাঁর নামে কত টাকা পুরকর বকেয়া রয়েছে এবং রাজস্ব বাবদ পুরসভাকে কত অর্থ জমা দিতে হবে।
তাই ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের মতো বড় প্রশাসনিক পরিবর্তনের সঙ্গে অ্যাসেসি নম্বরের পরিবর্তনও সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়ছে। পুরসভার একটি অংশের আধিকারিকদের বক্তব্য, নতুন ওয়ার্ড তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট এলাকার প্লটগুলির নতুন অ্যাসেসি নম্বর কী ভাবে নির্ধারণ করা হবে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই কাজের সঙ্গে যুক্ত আধিকারিকদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ পুরনো নম্বর বদলে গেলে নতুন নম্বরের সঙ্গে পুরনো সম্পত্তির তথ্য কী ভাবে সহজে মিলিয়ে নেওয়া যাবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সহজ ভাষায় বললে, অ্যাসেসি নম্বর হল পুরসভার সম্পত্তি করের বিলের একটি গুরুত্বপূর্ণ শনাক্তকরণ নম্বর। কোনও প্লট বা সম্পত্তির কর সংক্রান্ত তথ্য খুঁজে বার করতে এই নম্বর ব্যবহার করা হয়। সম্পত্তির মালিকের কত কর বাকি, কত টাকা দিতে হবে কিংবা রাজস্ব সংক্রান্ত অন্য কোনও তথ্যের প্রয়োজন হলে অ্যাসেসি নম্বর ধরে সেই হিসাব চিহ্নিত করা যায়।
বর্তমান ব্যবস্থায় ওয়ার্ড এবং প্লটের সঙ্গে এই নম্বরের যোগসূত্র রয়েছে। ফলে ওয়ার্ডের সীমানা বদলালে বা কোনও প্লট নতুন ওয়ার্ডের আওতায় চলে গেলে অ্যাসেসি নম্বরের কাঠামোতেও পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে। কলকাতা পুরসভার প্রস্তাবিত পুনর্বিন্যাসে নতুন ৬৫টি ওয়ার্ড তৈরি হওয়ার কারণে এই বিষয়টিই এখন রাজস্ব বিভাগের কাছে অন্যতম বড় প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
পুরসভার রাজস্ব বিভাগের একাংশের আশঙ্কা, নতুন অ্যাসেসি নম্বর চালু হলে সাধারণ সম্পত্তির মালিকদের মধ্যে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন তৈরি হবে। এতদিন যে নম্বর দিয়ে তাঁরা কর জমা দিয়েছেন, সেই নম্বর হঠাৎ বদলে গেলে নতুন নম্বরটি কোন সম্পত্তির সঙ্গে যুক্ত, তা শনাক্ত করতে সমস্যা হতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা নিয়মিত পুরসভার কর সংক্রান্ত নথি নিজেরা সামলান না, তাঁদের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি আরও বাড়তে পারে।
শুধু করদাতাদের সমস্যা নয়, পুরসভার রাজস্ব আদায়ের উপরও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। কারণ পুরনো অ্যাসেসি নম্বর এবং নতুন অ্যাসেসি নম্বরের মধ্যে তথ্যের সঠিক সংযোগ তৈরি করতে সময় লাগবে। নতুন তালিকা তৈরি, সম্পত্তির তথ্য যাচাই এবং পুরনো রেকর্ডের সঙ্গে নতুন নম্বরের সমন্বয়ের মতো একাধিক কাজ করতে হবে পুরসভাকে।
পুরসভার একাধিক সূত্রের বক্তব্য, ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত নতুন অ্যাসেসি নম্বরের তালিকা তৈরির কাজ কার্যত শুরু করা যাচ্ছে না। কারণ কোন প্লট কোন নতুন ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত হবে, সেটিই আগে চূড়ান্ত হওয়া প্রয়োজন। ওয়ার্ডের সীমানা চূড়ান্ত হওয়ার পরই সেই অনুযায়ী সম্পত্তির নতুন নম্বর নির্ধারণের কাজ এগোতে পারবে।
এখন পর্যন্ত বিভিন্ন মহলে যে ইঙ্গিত রয়েছে, তাতে পুজোর পর কলকাতা পুরসভার নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তার আগে ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস কার্যকর করার পরিকল্পনা থাকলে সময়ের ব্যবধানও খুব বেশি থাকছে না। পুনর্বিন্যাস পুজোর পরে কার্যকর হলে তার পর নতুন অ্যাসেসি নম্বর তৈরির কাজ শুরু হবে। পুরসভার একাংশের অনুমান, এই বিশাল সংখ্যক প্লটের নতুন নম্বর তৈরি এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য ব্যবস্থাকে আপডেট করতে কয়েক মাস সময় লেগে যেতে পারে। সেই কাজ গড়িয়ে নতুন বছরের মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত চলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তাঁদের আশঙ্কা।
এই সময়ের মধ্যেই পুরকর আদায়ের নিয়মিত প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে হবে। ফলে পুরনো এবং নতুন অ্যাসেসি নম্বরের মধ্যে সমন্বয়ের কোনও স্পষ্ট ব্যবস্থা না থাকলে নাগরিকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা বকেয়া রাজস্বের হিসাব ঘিরে। কোনও সম্পত্তির পুরনো অ্যাসেসি নম্বর পরিবর্তন হয়ে গেলে সেই সম্পত্তির পূর্ববর্তী করের রেকর্ড, বর্তমান বকেয়া এবং নতুন নম্বর—এই তিনটির মধ্যে স্পষ্ট যোগসূত্র না থাকলে সম্পত্তির মালিকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠতে পারে।
কোনও নাগরিকের কাছে যদি পুরনো করের বিল থাকে, কিন্তু নতুন বিলে সম্পূর্ণ আলাদা অ্যাসেসি নম্বর দেখা যায়, তা হলে দুই নম্বর একই সম্পত্তির কি না, তা নিয়ে বিভ্রান্তি হওয়া স্বাভাবিক। বিশেষ করে সম্পত্তি হস্তান্তর, উত্তরাধিকার, পুরনো কর বকেয়া কিংবা করের পরিমাণ নিয়ে কোনও সমস্যা থাকলে নতুন নম্বর ব্যবস্থার কারণে জটিলতা আরও বাড়তে পারে।
পুরসভার রাজস্ব বিভাগের আধিকারিকদের একাংশের আশঙ্কা, ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস এবং অ্যাসেসি নম্বর পরিবর্তনের সময় করের হিসাব নিয়েও নাগরিকদের একাংশের সঙ্গে পুরসভার মতবিরোধ তৈরি হতে পারে। কেউ কেউ করের পরিমাণ বেড়েছে বলে অভিযোগ করতে পারেন। সেই ক্ষেত্রে পুর-ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
এর ফলে একদিকে যেমন পুরসভার প্রশাসনিক কাজের চাপ বাড়বে, অন্যদিকে কর আদায়ের প্রক্রিয়াও ধীর হতে পারে। কয়েক লক্ষ সম্পত্তির তথ্য নতুন ভাবে সাজানো নিজেই একটি বড় প্রশাসনিক কাজ। তার উপর নাগরিকদের প্রশ্ন, অভিযোগ এবং আপত্তির নিষ্পত্তি করতে হলে সংশ্লিষ্ট দফতরের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে।
১৪৪ থেকে ২০৯—ওয়ার্ডের সংখ্যা এক ধাক্কায় ৬৫টি বাড়ানোর প্রস্তাব কার্যকর হলে কলকাতা পুরসভার প্রশাসনিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসবে। কিন্তু তার পাশাপাশি শহরের সম্পত্তি কর ব্যবস্থাকে নতুন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করাও জরুরি। প্রায় ৯ লক্ষ প্লটের অ্যাসেসি নম্বর পরিবর্তনের সম্ভাবনা সেই কাজের ব্যাপকতাই স্পষ্ট করছে।
পুরসভার রাজস্ব বিভাগের কাছে এখন তাই মূল প্রশ্ন, কী ভাবে পুরনো এবং নতুন অ্যাসেসি নম্বরের মধ্যে একটি নির্ভুল ‘ম্যাপিং’ তৈরি করা হবে। নাগরিকেরা যাতে তাঁদের পুরনো সম্পত্তির তথ্য নতুন নম্বরের সঙ্গে সহজে মিলিয়ে নিতে পারেন, সেই ব্যবস্থাও প্রয়োজন। একই সঙ্গে করদাতাদের আগেভাগে জানানো, অনলাইন ব্যবস্থায় পুরনো নম্বর থেকে নতুন নম্বর খুঁজে পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা এবং বকেয়া করের তথ্য অক্ষুণ্ণ রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ অ্যাসেসি নম্বর শুধুমাত্র একটি নম্বর নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সম্পত্তির কর সংক্রান্ত বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। তাই ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পাশাপাশি কর ব্যবস্থায় যাতে নাগরিক পরিষেবা ব্যাহত না হয়, সে দিকেও নজর দিতে হবে।
ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস শেষ পর্যন্ত কী ভাবে কার্যকর হয় এবং নতুন অ্যাসেসি নম্বর নির্ধারণে কলকাতা পুরসভা কী পদ্ধতি নেয়, তার উপরই নির্ভর করবে আগামী দিনে নাগরিকদের ভোগান্তি কতটা কমানো সম্ভব। এখন থেকেই স্পষ্ট নির্দেশিকা এবং পুরনো-নতুন নম্বরের মধ্যে সহজ সংযোগ তৈরি করা না গেলে কয়েক লক্ষ সম্পত্তির মালিককে নতুন করে নানা সমস্যার মুখে পড়তে হতে পারে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments