Homeকলকাতাউত্তর থেকে দক্ষিণ, খানাখন্দে জেরবার কলকাতা: বেহাল রাস্তায় বাড়ছে যানজট, দুর্ঘটনার আশঙ্কাও

উত্তর থেকে দক্ষিণ, খানাখন্দে জেরবার কলকাতা: বেহাল রাস্তায় বাড়ছে যানজট, দুর্ঘটনার আশঙ্কাও

নিউজ ডেস্ক; উত্তর কলকাতা থেকে দক্ষিণের বিস্তীর্ণ এলাকা—শহরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় এখন আমজনতার নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে খানাখন্দ। কোথাও রাস্তার পিচ
resizeplus_Screenshot 2026-08-29 203045_edited

নিউজ ডেস্ক; উত্তর কলকাতা থেকে দক্ষিণের বিস্তীর্ণ এলাকা—শহরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় এখন আমজনতার নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে খানাখন্দ। কোথাও রাস্তার পিচ উঠে তৈরি হয়েছে বড় গর্ত, কোথাও আবার বৃষ্টির জল জমে বোঝাই যাচ্ছে না রাস্তার কোন অংশ সমতল আর কোথায় বিপজ্জনক গর্ত। ফলে প্রতিদিনই সমস্যায় পড়ছেন গাড়িচালক, বাইক আরোহী থেকে শুরু করে পথচারীরা। খারাপ রাস্তার কারণে এক দিকে যেমন যানবাহনের গতি কমছে, তেমনই বাড়ছে যানজট। তার সঙ্গে রয়েছে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও।

শহরের রাস্তায় খানাখন্দ নতুন কোনও সমস্যা নয়। বর্ষা এলেই কলকাতা ও শহরতলির বিভিন্ন এলাকায় রাস্তার বেহাল দশা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। অতিবৃষ্টি, জল জমা, পুরনো পিচের ক্ষয় এবং বারবার রাস্তা খোঁড়ার কারণে কোথাও কোথাও পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। বিভিন্ন পরিষেবা সংস্থার পাইপলাইন বা কেব্‌ল বসানোর জন্য রাস্তা কাটার পর যথাযথ ভাবে মেরামত না হলেও সেই অংশ দ্রুত ভেঙে যায়। ফলে তৈরি হয় ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত।

এই গর্তগুলিই এখন যান চলাচলের অন্যতম বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ব্যস্ত সময়ে গাড়িচালকদের সামনে হঠাৎ গর্ত চলে এলে গতি কমাতে বা আচমকা ব্রেক করতে হচ্ছে। পিছনে থাকা গাড়ি কিংবা বাইক আরোহীদের ক্ষেত্রেও তৈরি হচ্ছে বিপদের পরিস্থিতি। বড় গর্ত এড়াতে অনেক সময় গাড়ি চালকেরা আচমকা লেন পরিবর্তন করছেন। তার জেরে একই রাস্তায় যানজট তৈরি হওয়ার পাশাপাশি সংঘর্ষের সম্ভাবনাও বাড়ছে।

দুই চাকার গাড়ির ক্ষেত্রে বিপদ আরও বেশি। রাস্তার গর্তে চাকা পড়ে ভারসাম্য হারানোর আশঙ্কা থাকে। আবার বৃষ্টির জলে গর্ত ঢাকা পড়ে গেলে বিপদ আরও বাড়ে। বাইরে থেকে রাস্তা সমতল বলে মনে হলেও নিচে গভীর গর্ত থাকতে পারে। সেই জায়গায় দ্রুতগতিতে বাইক ঢুকে গেলে দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে।

শহরের যানজটের অন্যতম কারণ শুধু গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি নয়, রাস্তার পরিকাঠামোর দুর্বলতাও তার সঙ্গে যুক্ত। রাস্তার কোনও অংশে গর্ত তৈরি হলে গাড়িগুলি স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারে না। চালকেরা গর্ত এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন। ফলে একই লেনে গাড়ির গতি বারবার কমে যায়। ব্যস্ত সময়ে সেই ধীরগতি দ্রুত পিছনের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। তৈরি হয় দীর্ঘ যানজট।

চিংড়িঘাটা এলাকার যানজট কমাতে বিকল্প রুট ব্যবহারের পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও রাস্তার পরিকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। পুলিশের আলোচনায় উঠে এসেছিল, বিকল্প পথে থাকা শিখরপুর রোডের একটি অংশ সরু এবং খানাখন্দে ভরা। সেই রাস্তা মেরামত না হলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকে যায় বলেও পুলিশের একাংশের মত ছিল। অর্থাৎ যানজট কমানোর বিকল্প পথ তৈরি করলেও সেই রাস্তার মান ঠিক না থাকলে সমস্যা অন্য জায়গায় গিয়ে ফিরে আসতে পারে।

শহরের আরও অনেক রাস্তায় একই ছবি দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। কোথাও রাস্তার উপর তৈরি হয়েছে ছোট ছোট গর্তের সারি, আবার কোথাও গর্ত এতটাই বড় যে গাড়ির চাকা পড়লে ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে রাস্তা মেরামতির অপেক্ষায় থাকা এলাকার বাসিন্দাদের প্রশ্ন, সাময়িক ভাবে গর্ত বুজিয়ে দিলেই কি সমস্যার সমাধান হবে? নাকি প্রয়োজন রাস্তার স্থায়ী সংস্কার?

বর্ষার সময় সমস্যাটি আরও জটিল হয়ে ওঠে। বৃষ্টির জল জমে গেলে রাস্তার গর্ত চোখে দেখা যায় না। ফলে চালকেরা আন্দাজের উপর নির্ভর করে গাড়ি চালাতে বাধ্য হন। ভারী যানবাহন চলাচলের ফলে সেই গর্ত আরও বড় হতে থাকে। রাস্তার এক অংশ ভেঙে গেলে তার আশপাশের পিচও ধীরে ধীরে উঠে যেতে পারে। ফলে সামান্য ক্ষত থেকে কয়েক দিনের মধ্যেই বড় গর্ত তৈরি হওয়ার নজির রয়েছে।

রাস্তার এই পরিস্থিতির সঙ্গে নাগরিক ভোগান্তির আরও একটি দিক জড়িয়ে রয়েছে। গাড়ির যন্ত্রাংশের উপরও অতিরিক্ত চাপ পড়ে। গর্তের মধ্যে দিয়ে নিয়মিত গাড়ি চলাচল করলে টায়ার, সাসপেনশন, চাকা এবং অন্যান্য যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অর্থাৎ বেহাল রাস্তার কারণে শুধু সময় নষ্ট নয়, অতিরিক্ত রক্ষণাবেক্ষণ খরচও বহন করতে হয় সাধারণ মানুষকে।

অন্য দিকে, রাস্তা মেরামতির কাজ শুরু হলে আবার তৈরি হয় নতুন সমস্যা। কাজ চলাকালীন রাস্তার একাংশ বন্ধ রাখতে হলে যান চলাচলের জায়গা কমে যায়। ফলে ব্যস্ত সময়ে যানজট আরও বাড়তে পারে। তাই নাগরিকদের একাংশের দাবি, রাস্তা মেরামতির কাজ হলেও তা পরিকল্পিত ভাবে এবং দ্রুত শেষ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনও রাস্তা খোঁড়ার পর সেটি যথাযথ ভাবে পুনরুদ্ধার করা হচ্ছে কি না, তার উপরেও নজরদারি দরকার।

প্রশ্ন উঠছে, শহরের বিভিন্ন রাস্তায় একই সমস্যা বারবার কেন ফিরে আসছে? কোথাও সংস্কারের কয়েক মাসের মধ্যেই আবার পিচ উঠে যাচ্ছে। কোথাও আবার মেরামতির পরও বৃষ্টির জল জমে রাস্তা দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে শুধু গর্ত বোজানো নয়, রাস্তা তৈরির গুণমান, জল নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।

শহরের যানজট সামলাতে ট্র্যাফিক পুলিশ বিভিন্ন জায়গায় বিকল্প পথ এবং যান নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা করছে। কিন্তু রাস্তার পরিকাঠামো দুর্বল থাকলে শুধু ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনা দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। একটি সাম্প্রতিক পরিকল্পনায় বিকল্প রুট ব্যবহার করার কথা উঠলেও সংশ্লিষ্ট রাস্তার খানাখন্দ ও পরিকাঠামোগত সমস্যাকে দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

ফলে এখন মূল প্রশ্ন, কবে শহরের রাস্তাগুলির স্থায়ী সংস্কার হবে? নাগরিকদের অভিযোগ, প্রতি বছর বর্ষার আগে বা পরে রাস্তা মেরামতির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও সব জায়গায় তার বাস্তবায়ন দেখা যায় না। কোথাও কাজ হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। তাই শুধু নতুন করে পিচ ঢালাই নয়, রাস্তার দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট পরিকল্পনার দাবি উঠছে।

প্রশাসনের সামনে তাই একাধিক চ্যালেঞ্জ। এক দিকে রাস্তার গর্ত দ্রুত মেরামত করে দুর্ঘটনা কমানো, অন্য দিকে জল জমার সমস্যা সমাধান করা এবং রাস্তা খোঁড়ার পর যথাযথ ভাবে পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করা—সবই জরুরি। পাশাপাশি কোন রাস্তা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, কোথায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি এবং কোন রুটে যানজটের উপর বেহাল রাস্তার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে, তার ভিত্তিতে অগ্রাধিকার ঠিক করার প্রয়োজন রয়েছে।

শহরের বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, রাস্তার সমস্যাকে শুধুমাত্র বর্ষাকালীন সমস্যা হিসেবে না দেখে স্থায়ী পরিকাঠামোগত সমস্যা হিসেবে দেখা হবে। কারণ রাস্তার খানাখন্দ শুধু গাড়ির গতি কমায় না; তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানুষের নিরাপত্তা, সময়, অর্থ এবং শহরের সামগ্রিক যান চলাচল ব্যবস্থা।

উত্তর থেকে দক্ষিণ—কলকাতার বহু রাস্তায় তাই এখন একই প্রশ্ন ঘুরছে, কবে কাটবে এই খানাখন্দের দুর্ভোগ? নাগরিকদের দাবি, আর আশ্বাস নয়, প্রয়োজন দ্রুত এবং টেকসই রাস্তা সংস্কার। প্রশাসনের তরফে সেই কাজ কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, এখন সেটাই দেখার।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved