
নিউজ ডেস্ক : সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগ আর শুধু অনলাইন পোর্টাল, চিঠি কিংবা দফতরের একাধিক স্তর ঘুরে জানানোর বিষয় থাকবে না। এ বার সপ্তাহের নির্দিষ্ট দু’দিন সরাসরি সাধারণ মানুষের কথা শুনতে অফিসে উপস্থিত থাকতে হবে প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের আধিকারিকদের। মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কোনও আগাম অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়াই সংশ্লিষ্ট আধিকারিকের সঙ্গে দেখা করে নিজেদের সমস্যা জানাতে পারবেন সাধারণ মানুষ। এই মর্মে নির্দেশিকা জারি করেছে নবান্ন।
রাজ্যের মুখ্যসচিবের জারি করা নির্দেশ অনুযায়ী, প্রতি মঙ্গলবার এবং বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত মাঠপর্যায়ের আধিকারিকদের নিজেদের দফতরে উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ওই সময়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগ শোনা এবং তাঁদের সমস্যার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের ব্যবস্থা করাই হবে মূল লক্ষ্য। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, এই নির্দিষ্ট সময়কে যতটা সম্ভব সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে।
অর্থাৎ, কোনও নাগরিককে আগে থেকে দেখা করার সময় নিতে হবে না। নির্ধারিত দিনে এবং সময়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি অফিসে গিয়ে নিজের অভিযোগ বা সমস্যার কথা সরাসরি আধিকারিকের সামনে তুলে ধরতে পারবেন তিনি। এর ফলে প্রশাসনের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ আরও বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে।
নবান্নের নির্দেশিকায় শুধু আধিকারিকদের অফিসে থাকার কথা বলা হয়নি, ওই সময়ের ব্যবস্থাপনা নিয়েও স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর ১টার এই সময়সীমায় যতটা সম্ভব সরকারি বৈঠক, দফতর সংক্রান্ত সফর, পরিদর্শন কিংবা অন্য কোনও কর্মসূচি না রাখার কথা বলা হয়েছে। বিশেষ কোনও কারণে কর্মসূচি এড়ানো সম্ভব না হলে প্রশাসনিক কাজের সঙ্গে জনসাধারণের অভিযোগ শোনার ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় করার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
এই নির্দেশের আওতায় পড়ছেন প্রশাসনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মাঠপর্যায়ের আধিকারিক। জেলাশাসক বা DM থেকে অতিরিক্ত জেলাশাসক, মহকুমাশাসক, বিডিও—প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের আধিকারিকদের এই নির্দিষ্ট সময়ে সাধারণ মানুষের জন্য উপলব্ধ থাকতে হবে। পুর প্রশাসনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর হবে। পুর কমিশনার-সহ সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদেরও সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শুধু দেওয়ানি প্রশাসন নয়, পুলিশ প্রশাসনকেও এই ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে। পুলিশ কমিশনার, ডেপুটি কমিশনার এবং পুলিশ সুপার-সহ সংশ্লিষ্ট পুলিশ আধিকারিকদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সাধারণ মানুষের অভিযোগ শোনার জন্য উপস্থিত থাকার কথা বলা হয়েছে। ফলে প্রশাসনিক সমস্যা কিংবা আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত অভিযোগ—দুই ক্ষেত্রেই নাগরিকদের সংশ্লিষ্ট আধিকারিকের কাছে সরাসরি পৌঁছনোর সুযোগ তৈরি হবে।
তবে নবান্নের এই নির্দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলির মধ্যে একটি হল অভিযোগ নথিবদ্ধ করার উপর জোর দেওয়া। কোনও ব্যক্তি এসে নিজের সমস্যার কথা জানিয়ে চলে গেলেন, আর তার পরে সেই অভিযোগের কী হল, তা আর জানা গেল না—এই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দফতরকে অভিযোগের পরবর্তী গতিপথের রেকর্ড রাখতে হবে। অর্থাৎ, কোন ব্যক্তি কী অভিযোগ জানালেন, সেই অভিযোগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট দফতর কী পদক্ষেপ করল এবং সমস্যাটি সমাধানের ক্ষেত্রে কতটা অগ্রগতি হল—এই বিষয়গুলি নথিভুক্ত করার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে বলা হয়েছে।
এর ফলে শুধু ‘অভিযোগ শোনা’ নয়, অভিযোগের পরবর্তী পদক্ষেপের উপরও প্রশাসনিক নজরদারি বাড়বে। কোনও অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকলে তার কারণও পর্যালোচনা করা সম্ভব হবে। প্রশাসনিক ব্যবস্থায় দায়বদ্ধতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এই পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
নতুন নির্দেশিকার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সরকারি অফিসে যোগাযোগের তথ্য প্রকাশ্যে রাখা। সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতর বা অফিসের এমন একটি দৃশ্যমান জায়গায় আধিকারিকের সরকারি ই-মেল আইডি এবং মোবাইল নম্বর টাঙিয়ে রাখতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ সহজেই তা দেখতে পান।
প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে অনেক সময় সাধারণ মানুষকে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকের পরিচয়, ফোন নম্বর বা ই-মেল খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়তে হয়। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল বা প্রত্যন্ত এলাকার মানুষদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও বেশি হতে পারে। সরকারি অফিসে যোগাযোগের তথ্য প্রকাশ্যে রাখার ফলে সেই জটিলতা অনেকটাই কমতে পারে।
বর্তমানে সরকারি পরিষেবার একটা বড় অংশ অনলাইন নির্ভর হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন আবেদন, অভিযোগ এবং পরিষেবার জন্য অনলাইন পোর্টাল চালু রয়েছে। কিন্তু ডিজিটাল পরিষেবা ব্যবহার করার ক্ষেত্রে এখনও সমাজের সব অংশের মানুষের সমান সুযোগ নেই। ইন্টারনেট পরিষেবা, স্মার্টফোন, ডিজিটাল দক্ষতা কিংবা অনলাইন প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণার অভাবে অনেকেই সমস্যায় পড়েন।
সেই জায়গা থেকেই নবান্নের এই উদ্যোগের তাৎপর্য রয়েছে। অনলাইন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি প্রশাসনের দরজা সরাসরি সাধারণ মানুষের জন্য খোলা রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ যাতে শুধুমাত্র ডিজিটাল ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল না হয়ে পড়েন, সে বিষয়টিও এই ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের আধিকারিকরাই সাধারণ মানুষের সবচেয়ে কাছাকাছি কাজ করেন। ব্লক, মহকুমা, জেলা কিংবা পুর এলাকায় সরকারি পরিষেবার বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁদের কাছেই সবচেয়ে বেশি তথ্য থাকে। ফলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়লে স্থানীয় সমস্যাগুলি দ্রুত চিহ্নিত করা সম্ভব হতে পারে।
ধরা যাক, কোনও এলাকায় রাস্তা, পানীয় জল, সরকারি পরিষেবা, ভূমি সংক্রান্ত সমস্যা কিংবা কোনও প্রশাসনিক জটিলতা নিয়ে মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সমস্যায় রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট আধিকারিকের সঙ্গে সরাসরি দেখা করার সুযোগ থাকলে সেই সমস্যা দ্রুত প্রশাসনের নজরে আসতে পারে। আবার পুলিশ প্রশাসনের ক্ষেত্রে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা, অভিযোগ কিংবা নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ও সরাসরি তুলে ধরার সুযোগ মিলবে।
তবে এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ের বাস্তব প্রয়োগের উপর। নির্ধারিত সময়ে আধিকারিকরা নিয়মিত অফিসে থাকছেন কি না, সাধারণ মানুষের অভিযোগ কতটা গুরুত্ব দিয়ে শোনা হচ্ছে এবং অভিযোগের পরবর্তী পদক্ষেপ কতটা দ্রুত হচ্ছে—এই তিনটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
নবান্নের নির্দেশিকায় সেই কারণেই নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তা পর্যায়ক্রমে পর্যালোচনা করার কথা বলা হয়েছে। রাজ্যের কর্মিবর্গ ও প্রশাসনিক সংস্কার দফতর মাঠপর্যায়ের আধিকারিকরা নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করছেন কি না, তা পর্যালোচনা করবে।
অর্থাৎ, এটি শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক নির্দেশ জারি করে থেমে যাওয়ার বিষয় নয়। নির্দেশ বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিও নজরে রাখবে রাজ্য সরকার। ফলে আধিকারিকদের নির্ধারিত সময়ে উপস্থিতি এবং অভিযোগ শোনার প্রক্রিয়া নিয়ে ভবিষ্যতে আরও নজরদারি হতে পারে।
প্রশাসনের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দূরত্ব কমানো নিয়ে বহুদিন ধরেই নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কখনও ক্যাম্প করে পরিষেবা দেওয়া হয়েছে, কখনও অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এ বার সেই উদ্যোগের সঙ্গে যোগ হল নির্দিষ্ট সময়ে সরাসরি আধিকারিকের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ।
এর ফলে একদিকে যেমন প্রশাসনের কাছে মানুষের পৌঁছনো সহজ হতে পারে, অন্যদিকে সরকারি আধিকারিকদের কাছেও স্থানীয় সমস্যার বাস্তব চিত্র আরও স্পষ্ট ভাবে পৌঁছতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা অনলাইন ব্যবস্থার বাইরে রয়েছেন, তাঁদের জন্য এই সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সব মিলিয়ে, মঙ্গল ও বৃহস্পতিবারের নির্দিষ্ট সময়কে সাধারণ মানুষের অভিযোগ শোনার জন্য নির্ধারিত করে প্রশাসনের মাঠপর্যায়ে একটি নতুন ধরনের জবাবদিহির ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করছে নবান্ন। অভিযোগ নেওয়া থেকে তার নিষ্পত্তি পর্যন্ত রেকর্ড রাখার নির্দেশ এবং আধিকারিকদের সরকারি যোগাযোগের তথ্য প্রকাশ্যে রাখার সিদ্ধান্ত সেই ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্যেই নেওয়া হয়েছে।
এখন দেখার, নির্দেশ বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় এবং সপ্তাহে দু’দিনের এই সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের প্রশাসনিক সমস্যার সমাধানে কতটা গতি আনতে পারে। তবে আপাতত বার্তা স্পষ্ট—নির্দিষ্ট দিনে, নির্দিষ্ট সময়ে প্রশাসনের দরজা সাধারণ মানুষের জন্য খোলা থাকবে, আর অভিযোগ শুনে তার পরবর্তী পদক্ষেপের হিসাবও রাখতে হবে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
contact@ngtvnews.com
+৯১ ৮৪২০৬৫৮৯৯৯
আর্চ স্কোয়ার X2 বিল্ডিং
কলেজ মোড়, সেক্টর ৫
কলকাতা - ৭০০০৯১
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments