Homeরাজ্যগঙ্গা-পদ্মা জলবণ্টন চুক্তি নবীকরণে বাংলার স্বার্থে নবান্নের বার্তা, কেন্দ্রকে একাধিক দাবি

গঙ্গা-পদ্মা জলবণ্টন চুক্তি নবীকরণে বাংলার স্বার্থে নবান্নের বার্তা, কেন্দ্রকে একাধিক দাবি

resizeplus_Screenshot 2026-08-29 192509_edited

নিউজ ডেস্ক; ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গা-পদ্মা জলবণ্টন চুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদ শেষ হতে চলেছে চলতি বছরের ডিসেম্বরেই। তার আগে নতুন করে চুক্তির রূপরেখা তৈরি নিয়ে শুরু হয়েছে তৎপরতা। আর সেই প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গের জল, বন্দর, কৃষি এবং শিল্পের স্বার্থ যাতে কোনও ভাবেই উপেক্ষিত না হয়, তা স্পষ্ট করে কেন্দ্রের কাছে নিজেদের অবস্থান জানিয়ে দিল নবান্ন। রাজ্যের বক্তব্য, নতুন চুক্তি এমন হওয়া প্রয়োজন যাতে শুষ্ক মরশুমে বাংলার নদীগুলিতে প্রয়োজনীয় জলপ্রবাহ বজায় থাকে এবং একই সঙ্গে নদীভাঙন, পলি জমা, পানীয় জলের সঙ্কট ও পরিবেশগত ঝুঁকির মতো বিষয়গুলিও গুরুত্ব পায়।

সূত্রের খবর, কেন্দ্রীয় জলশক্তি মন্ত্রকের অভ্যন্তরীণ কমিটির বৈঠকে রাজ্য সরকারের প্রতিনিধিরা বিষয়টি বিস্তারিত ভাবে তুলে ধরেছেন। সেখানে পশ্চিমবঙ্গে গঙ্গার জলের বর্তমান চাহিদা, ভবিষ্যতের প্রয়োজন এবং পানীয় জল ও শিল্পক্ষেত্রে নদীর জলের গুরুত্বের কথা জানানো হয়েছে। রাজ্যের তরফে এ বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট রিপোর্টও জমা দেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর।

নবান্নের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ শুষ্ক মরশুমে গঙ্গার জলপ্রবাহ নিয়ে। রাজ্য চায়, ফরাক্কা ব্যারাজ হয়ে ভাগীরথী-হুগলি নদীতে পর্যাপ্ত জল পৌঁছনোর বিষয়টি নতুন চুক্তিতে বিশেষ গুরুত্ব পাক। কারণ, হুগলি নদীতে জলপ্রবাহ কমে গেলে নদীর নাব্যতা হ্রাসের সমস্যা দেখা দেয়। তার প্রভাব শুধু নদী পরিবহণ বা বন্দর ব্যবস্থার উপরই পড়ে না, এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় পলি জমা, জলধারণ ক্ষমতা এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের মতো একাধিক বিষয়।

বিশেষ করে কলকাতার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বন্দরের জন্য হুগলি নদীর নাব্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদীতে অতিরিক্ত পলি জমলে নিয়মিত ড্রেজিংয়ের প্রয়োজন হয় এবং জাহাজ চলাচলেও তার প্রভাব পড়তে পারে। ফলে নতুন জলবণ্টন ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত জলপ্রবাহ নিশ্চিত করার বিষয়টিকে রাজ্য শুধু পরিবেশগত প্রশ্ন হিসেবে দেখছে না, বরং বাংলার বন্দর ও বাণিজ্যের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত বলে মনে করছে।

এখানেই শেষ নয়। ফরাক্কা ব্যারাজের উজান এবং ভাটির বিস্তীর্ণ এলাকায় নদীভাঙনও দীর্ঘদিনের সমস্যা। মালদা, মুর্শিদাবাদ এবং নদিয়া জেলার একাধিক অংশে প্রতি বছর নদীভাঙনে বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। নদীর গতিপথের পরিবর্তন, পলি জমা এবং জলপ্রবাহের তারতম্য—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। বর্ষাকালে অতিরিক্ত পলি জমার কারণে বিভিন্ন এলাকায় বন্যার পরিস্থিতিও তৈরি হয়। ফলে নতুন চুক্তির ক্ষেত্রে শুধু দুই দেশের মধ্যে কত জল ভাগ হবে, সেই হিসাবের মধ্যে বিষয়টিকে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে না পশ্চিমবঙ্গ সরকার।

রাজ্যের যুক্তি, নদী একটি জীবন্ত ও পরিবর্তনশীল প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। তাই জলবণ্টনের সিদ্ধান্তের সঙ্গে নদীর নাব্যতা, পলি ব্যবস্থাপনা, নদীভাঙন এবং পরিবেশের উপর প্রভাবও বিবেচনায় রাখা জরুরি। বাংলার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গঙ্গা-ভাগীরথী-হুগলি অববাহিকা রাজ্যের কৃষি, পানীয় জল, শিল্প এবং পরিবহণ ব্যবস্থার সঙ্গে গভীর ভাবে জড়িত।

পানীয় জলের ক্ষেত্রেও গঙ্গার গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে বলে জানিয়েছে নবান্ন। রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় ভূগর্ভস্থ জলস্তর কমে যাওয়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ জলে আর্সেনিকের প্রভাবও বহু অঞ্চলে জনস্বাস্থ্যের জন্য সমস্যা তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে বিকল্প জলের উৎস হিসেবে নদীর জলকে কাজে লাগানোর প্রয়োজন বাড়ছে। গঙ্গার জল পরিশোধন করে বিভিন্ন এলাকায় পানীয় জল সরবরাহ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে শিল্পক্ষেত্রেও নদীর জলের ব্যবহার রয়েছে।

ফলে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ এবং শিল্পায়নের সঙ্গে আগামী দিনে বাংলায় গঙ্গার জলের চাহিদা আরও বাড়তে পারে বলেই মনে করছে রাজ্য। সেই ভবিষ্যৎ প্রয়োজনের বিষয়টিও নতুন চুক্তির আলোচনায় বিবেচনা করা হোক—কেন্দ্রের কাছে এমনই অবস্থান জানিয়েছে নবান্ন।

পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়টিকেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে চাইছে রাজ্য। গঙ্গা-পদ্মা জলবণ্টন ব্যবস্থা নিয়ে নতুন চুক্তি করার আগে নদী-পরিবেশের উপর সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন করা প্রয়োজন বলে মনে করছে প্রশাসন। একই সঙ্গে নদীভাঙন রোধ এবং পলি ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে সমন্বিত আলোচনা দরকার বলে রাজ্যের অভিমত।

নবান্নের বক্তব্য, চুক্তি পুনর্নবীকরণের আগে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশনের প্রশাসনিক স্তরে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে বাংলার বাস্তব পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যতের প্রয়োজনকে আলোচনার টেবিলে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। অর্থাৎ, দিল্লি-ঢাকার আলোচনায় পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থ যাতে পিছনের সারিতে চলে না যায়, সেই বিষয়টিই আগেভাগে স্পষ্ট করে দিতে চাইছে রাজ্য।

এদিকে নতুন চুক্তির রূপরেখা তৈরির প্রাথমিক প্রক্রিয়াও শুরু হয়ে গিয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশের টেকনিক্যাল টিম ইতিমধ্যেই গঙ্গা ও পদ্মার জলের প্রবাহ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে। ফরাক্কা এবং বাংলাদেশের হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে জলের পরিমাণ ও প্রবাহের হিসাব নথিভুক্ত করা হচ্ছে। ভবিষ্যৎ জলবণ্টন চুক্তির ভিত্তি তৈরিতে এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

বর্তমান গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে দুই দেশের মধ্যে একাধিক পর্যায়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই আলোচনায় জলপ্রবাহের পরিমাণ, শুষ্ক মরশুমে জলের বণ্টন, নদীর পরিবেশগত ভারসাম্য এবং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের প্রয়োজনের মতো বিষয় উঠে আসবে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ইতিমধ্যেই নিজেদের দাবিদাওয়া কেন্দ্রের কাছে জানিয়ে দেওয়ায় আগামী দিনের আলোচনায় বাংলার স্বার্থ কতটা প্রতিফলিত হয়, এখন সেদিকেই নজর।

কারণ, এই চুক্তি শুধু ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি জলবণ্টন সমঝোতা নয়—পশ্চিমবঙ্গের জন্য এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কৃষি, পানীয় জল, শিল্প, নদী পরিবেশ এবং কলকাতার বন্দর ব্যবস্থার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই নতুন চুক্তির মেয়াদ ও শর্ত নির্ধারণের আগে রাজ্যের দাবিগুলি কতটা গুরুত্ব পায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

No Comments

    একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

    LINKS

    ABOUT US

    ফোন নম্বর

    +৯১ ৮৪২০৬৫৮৯৯৯

    আমাদের ঠিকানা

    আর্চ স্কোয়ার X2 বিল্ডিং
    কলেজ মোড়, সেক্টর ৫
    কলকাতা - ৭০০০৯১

    Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved