
নিউজ ডেস্ক; ১৩ অগস্ট অনির্দিষ্টকালের জন্য মুলতুবি হয়ে গিয়েছে সংসদের বাদল অধিবেশন। তার পর কেটে গিয়েছে প্রায় দু’সপ্তাহ। কিন্তু এখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে বাদল অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়নি। আর এই বিষয়টিকেই ঘিরে রাজধানীর রাজনৈতিক মহলে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, আসন পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করানোর লক্ষ্যেই কি আগামী দিনে সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকতে পারে কেন্দ্র?
বিরোধী শিবির ইতিমধ্যেই এই সম্ভাবনা নিয়ে সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে। রাজ্যসভায় বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে চিঠি দিয়ে সরকারের পরিকল্পনা জানতে চেয়েছেন। যদিও শুক্রবার পর্যন্ত কেন্দ্রের তরফে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনও নির্দিষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে দিল্লির রাজনৈতিক মহলে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে, প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার অঙ্ক মেলাতে পারলেই দু’দিনের একটি বিশেষ অধিবেশন ডাকার কথা ভাবতে পারে সরকার।
আসন পুনর্বিন্যাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বিষয়ে সংশোধনী বিল পাশ করাতে সংসদের দুই কক্ষে বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন। সেই অঙ্কই এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সূত্রের দাবি, লোকসভায় প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন নিশ্চিত হওয়ার পরেই বিশেষ অধিবেশন ডাকার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। সেই কারণেই বাদল অধিবেশনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি এখনও ঘোষণা করা হয়নি বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ।
কেন্দ্রীয় সরকারের অন্দরের খবর, সেপ্টেম্বর মাসে মন্ত্রিসভায় রদবদলের সম্ভাবনাও রয়েছে। তৃতীয় নরেন্দ্র মোদী সরকারের আমলে এটাই হতে পারে প্রথম বড় মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন। সেই রদবদলের পরেই বিশেষ অধিবেশন ডাকার পরিকল্পনা থাকতে পারে বলে খবর। যদিও সরকারের তরফে এখনও পর্যন্ত এই সম্ভাবনার বিষয়ে কোনও সরকারি ঘোষণা করা হয়নি।
আসন পুনর্বিন্যাস এবং মহিলা সংরক্ষণ—এই দুই বিষয়কে ঘিরে গত কয়েক মাস ধরে জাতীয় রাজনীতিতে জোরদার আলোচনা চলছে। গত এপ্রিল মাসে এই সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনী বিল সংসদে পাশ করানোর চেষ্টা করেছিল সরকার। কিন্তু প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় সেই উদ্যোগ সফল হয়নি। ফলে বাদল অধিবেশনে সরকার ফের এই বিষয়ে পদক্ষেপ করতে পারে বলে আগেই অনুমান করেছিল বিরোধীরা। শেষ পর্যন্ত বাদল অধিবেশনে সেই বিল পেশ করা হয়নি।
তবে বিষয়টি যে পুরোপুরি ঠান্ডা হয়ে যায়নি, তার ইঙ্গিত মিলছে রাজনৈতিক সমীকরণে। সূত্রের খবর, সরকার ইতিমধ্যেই বিরোধী শিবিরের কয়েকটি দলের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে। বিশেষ করে ডিএমকে এবং শরদ পাওয়ারের নেতৃত্বাধীন এনসিপি শিবিরের সঙ্গে আসন পুনর্বিন্যাস নিয়ে কথাবার্তা চলছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলির মধ্যে আসন পুনর্বিন্যাসের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ রয়েছে তামিলনাড়ুতে। জনসংখ্যার ভিত্তিতে লোকসভা আসনের পুনর্বিন্যাস হলে তুলনামূলক ভাবে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল দক্ষিণের রাজ্যগুলি রাজনৈতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এই আশঙ্কা বহু দিন ধরেই প্রকাশ করে আসছে ডিএমকে। ফলে কেন্দ্রের সঙ্গে আলোচনায় এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
সূত্রের দাবি, আসন পুনর্বিন্যাস নিয়ে ডিএমকে এবং শরদ পাওয়ারের এনসিপি শিবিরের কিছু দাবি সরকার মেনে নিলে প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দলগুলির সাংসদেরা ভোটাভুটির সময় অনুপস্থিত থাকতে পারেন। সরাসরি সরকারের পক্ষে ভোট না দিলেও তাঁদের অনুপস্থিতি সংবিধান সংশোধনী বিল পাশের অঙ্কে শাসক শিবিরকে সুবিধা করে দিতে পারে। তবে এই সমীকরণ এখনও আলোচনার স্তরেই রয়েছে এবং কোনও পক্ষই আনুষ্ঠানিক ভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
লোকসভায় সংখ্যার হিসাবও এই জল্পনাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। তৃণমূল এবং শিবসেনা (উদ্ধব)-এর কয়েক জন সাংসদ শাসক শিবিরের সঙ্গে যোগ দেওয়ার পরে সরকারের পক্ষে সমর্থনের সংখ্যা বেড়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। বর্তমানে লোকসভায় এনডিএ-র পক্ষে প্রায় ৩২৯ জন সাংসদের সমর্থন রয়েছে বলে সূত্রের দাবি। অথচ সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করাতে প্রয়োজন প্রায় ৩৬০ জনের সমর্থন। অর্থাৎ এখনও প্রায় ৩১ জনের সমর্থন প্রয়োজন।
এই জায়গাতেই ডিএমকে এবং শরদ পাওয়ারের দলের সাংসদদের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ডিএমকে-র ২২ জন এবং শরদ পাওয়ারের এনসিপি শিবিরের ৮ জন সাংসদ যদি ভোটাভুটিতে অনুপস্থিত থাকেন, তাহলে উপস্থিত সদস্যদের মোট সংখ্যা কমে যাবে। ফলে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার অঙ্কেও পরিবর্তন আসতে পারে। সরকারের জন্য সেটাই হতে পারে কৌশলগত সুবিধা।
অবশ্য এই সমীকরণের সামনে আইনি জটিলতাও রয়েছে। তৃণমূলের কয়েক জন সাংসদের দলবদল এবং তাঁদের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টে মামলা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে লোকসভার স্পিকারও সংশ্লিষ্ট সাংসদদের কাছ থেকে লিখিত ব্যাখ্যা চেয়েছেন। ফলে তাঁদের ভোটাধিকার ও সংসদীয় অবস্থান নিয়ে ভবিষ্যতে কী সিদ্ধান্ত হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
রাজ্যসভার অঙ্ক অবশ্য সরকারের তুলনায় কিছুটা স্বস্তিদায়ক। তৃণমূলের তিন সাংসদ—সুখেন্দুশেখর রায়, প্রকাশ চিক বরাইক এবং সুস্মিতা দেব বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পরে রাজ্যসভায় বিজেপির সদস্যসংখ্যা বেড়ে ১১৭ হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এনডিএ-র মোট সাংসদ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫৫। ২৪৫ আসনের রাজ্যসভায় সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করাতে প্রয়োজন ১৬৪ জনের সমর্থন। অর্থাৎ এখানেও সরকারকে আরও কয়েকটি ভোটের সমর্থন জোগাড় করতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে বাদল অধিবেশন আনুষ্ঠানিক ভাবে শেষ না করা এবং সম্ভাব্য বিশেষ অধিবেশন নিয়ে জল্পনা—দুই বিষয়কে এক সূত্রে দেখছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। তাঁদের মতে, সরকার যদি আসন পুনর্বিন্যাস নিয়ে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছতে পারে, তাহলে বিশেষ অধিবেশন ডাকার রাস্তা খুলে যেতে পারে।
তবে আসন পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি শুধু সংসদীয় অঙ্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেশের বিভিন্ন রাজ্যের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, জনসংখ্যার অনুপাত, দক্ষিণ বনাম উত্তর ভারতের দীর্ঘদিনের বিতর্ক এবং মহিলা সংরক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন। ফলে বিলটি সংসদে এলে তা ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপও বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে।
এখন নজর সেপ্টেম্বরের দিকে। মন্ত্রিসভায় রদবদল হয় কি না, বাদল অধিবেশনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি কবে ঘোষণা করা হয় এবং তার পরে বিশেষ অধিবেশন ডাকার কোনও সিদ্ধান্ত কেন্দ্র নেয় কি না—এই তিনটি বিষয়ই আগামী দিনের রাজনৈতিক গতিপথ অনেকটাই স্পষ্ট করতে পারে। তার আগে সরকার প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার অঙ্ক মেলাতে পারে কি না, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments