
নিউজ ডেস্ক : কাঁটাতারের বেড়া নেই। সীমান্তের একেবারে কাছাকাছি বসতি। আর সেই ভৌগোলিক বাস্তবতার সুযোগ নিয়ে অপরাধচক্রের টানাপড়েনে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠছিল এলাকার একাংশের তরুণের বিরুদ্ধে। মাদক পাচার থেকে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড—সীমান্তবর্তী এলাকার যুবসমাজকে এই ধরনের প্রবণতা থেকে দূরে রাখাই এখন পুলিশের অন্যতম বড় লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যেই এ বার অস্ত্র নয়, পুলিশের হাতিয়ার ফুটবল। মাঠে নামিয়ে তরুণ প্রজন্মকে ইতিবাচক পথে এগিয়ে দেওয়ার অভিনব উদ্যোগ নিল মুর্শিদাবাদ জেলা পুলিশ।
রাণীনগর থানার উদ্যোগে শুরু হয়েছে আট দলের নকআউট ফুটবল প্রতিযোগিতা ‘সীমান্ত সম্প্রীতি কাপ ২০২৬’। রাণীনগর থানার সংলগ্ন মাঠেই আয়োজন করা হয়েছে এই প্রতিযোগিতার। পুলিশের দাবি, শুধুমাত্র একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করাই এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য নয়। সীমান্ত এলাকার কিশোর ও তরুণদের খেলাধুলা এবং পড়াশোনার সঙ্গে আরও বেশি করে যুক্ত করা এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে তাঁদের দূরে রাখার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ।
মুর্শিদাবাদের বিস্তীর্ণ অংশ আন্তর্জাতিক সীমান্তের কাছাকাছি। বেশ কিছু এলাকায় এখনও কাঁটাতারের বেড়া নেই। ফলে সীমান্তবর্তী জনজীবনের সঙ্গে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জও জড়িয়ে রয়েছে। পুলিশের বক্তব্য, এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় যুবকদের একটি অংশ কখনও কখনও অসাধু চক্রের প্রলোভনের শিকার হতে পারে। বিশেষ করে দ্রুত অর্থ উপার্জনের আশায় অপরাধচক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে সীমান্ত এলাকার কিছু অংশে।
সেই জায়গা থেকেই পুলিশের পরিকল্পনা—তরুণদের সময় কাটানোর স্বাস্থ্যকর ও ইতিবাচক মাধ্যম তৈরি করা। আর তার জন্য ফুটবলের মতো জনপ্রিয় খেলাকে বেছে নেওয়া হয়েছে। পুলিশের উদ্যোগে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতাকে ঘিরে ইতিমধ্যেই স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে যথেষ্ট উৎসাহ তৈরি হয়েছে।
টুর্নামেন্টের সূচনার দিন রাণীনগর থানায় আরও একটি কর্মসূচি ছিল। থানার নবনির্মিত ভারপ্রাপ্ত আধিকারিকের ঘরের উদ্বোধন করেন মুর্শিদাবাদ পুলিশ জেলার পুলিশ সুপার শচীন মাক্কার। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন লালবাগের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সিদ্ধার্থ দর্জি, ডোমকলের এসডিপিও রজত কুমার ঘোষ, ডোমকলের সিআই অমিত নন্দী এবং রাণীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক সুরজিৎ হালদার-সহ পুলিশের অন্যান্য আধিকারিকেরা।
থানার প্রশাসনিক পরিকাঠামোর নতুন অংশের উদ্বোধনের পাশাপাশি মাঠে ফুটবল প্রতিযোগিতার সূচনা হওয়ায় পুরো কর্মসূচিটি পেয়েছে আলাদা মাত্রা। পুলিশের একদিকে যেমন আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব, অন্যদিকে সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক আরও মজবুত করারও প্রয়োজন রয়েছে। সেই জায়গায় খেলাধুলাকে মাধ্যম করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে পুলিশের যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
আটটি দলকে নিয়ে শুরু হয়েছে ‘সীমান্ত সম্প্রীতি কাপ ২০২৬’। নকআউট পদ্ধতিতে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় প্রতিটি ম্যাচই গুরুত্বপূর্ণ। উদ্বোধনী দিনে মাঠে মুখোমুখি হয় মরিচা অ্যাকাডেমি এবং শেখপাড়া প্রগতি সংঘ। এর পর দ্বিতীয় ম্যাচে খেলতে নামে রাণীনগর থানা এবং নবীপুর আরএম ক্লাব।
প্রথম দিনের ম্যাচগুলির ফলাফলের ভিত্তিতেই সেমিফাইনালের দল নির্ধারিত হয়েছে। জয়ী দুই দল প্রথম সেমিফাইনালে একে অপরের বিরুদ্ধে খেলেছে। সেই ম্যাচ থেকে একটি দল পৌঁছে যাবে ফাইনালে। ফলে শুরু থেকেই প্রতিযোগিতায় উত্তেজনার পারদ চড়েছে।
টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় দিনের খেলা হবে ৩ সেপ্টেম্বর। সে দিন মাঠে নামবে ডিগ্রি ঘোষপাড়া আদর্শ সমিতি এবং কাতলামারী এইচডিও। এই ম্যাচকে ঘিরেও স্থানীয় ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। দিনের পরের পর্বে অনুষ্ঠিত হবে দ্বিতীয় সেমিফাইনাল। সেখান থেকে আরও একটি দল ফাইনালের টিকিট পাবে।
সবশেষে আগামী ৫ সেপ্টেম্বর, শনিবার বিকেলে অনুষ্ঠিত হবে প্রতিযোগিতার ফাইনাল। সেই ম্যাচের মধ্য দিয়েই শেষ হবে ‘সীমান্ত সম্প্রীতি কাপ ২০২৬’। আয়োজকদের তরফে বিজয়ী এবং রানার্স-আপ দলের জন্য রাখা হয়েছে নগদ পুরস্কারও।
প্রতিযোগিতার চ্যাম্পিয়ন দল ট্রফির পাশাপাশি পাবে ১৫,০০১ টাকা পুরস্কার। রানার্স-আপ দলের জন্য রয়েছে ১০,০০১ টাকা। তবে শুধু দলগত পুরস্কারেই শেষ হচ্ছে না আয়োজন। প্রতিটি ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়কে দেওয়া হবে ‘ম্যান অফ দ্য ম্যাচ’-এর সম্মাননা।
ফাইনাল ম্যাচের জন্যও থাকছে বিশেষ পুরস্কার। পুরো প্রতিযোগিতায় সেরা খেলোয়াড়কে ‘ম্যান অফ দ্য টুর্নামেন্ট’, সেরা গোলরক্ষককে ‘বেস্ট গোলকিপার’ এবং প্রতিযোগিতায় সর্বাধিক গোল করা খেলোয়াড়কে ‘সর্বোচ্চ গোলদাতা’ হিসেবে সম্মানিত করা হবে।
পুলিশের এই উদ্যোগের মূল ভাবনা অবশ্য পুরস্কার বা প্রতিযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জেলা পুলিশ সুপার শচীন মাক্কারের বক্তব্য, এলাকার কিশোর ও তরুণদের পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী করে তোলাই এই কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য। মাঠের সঙ্গে তরুণদের সম্পর্ক যত শক্তিশালী হবে, তাঁদের ইতিবাচক কাজে যুক্ত থাকার সুযোগও তত বাড়বে বলে মনে করছে পুলিশ।
সীমান্ত এলাকায় পুলিশের সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্পর্কও এই ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে আরও মজবুত করার চেষ্টা হচ্ছে। কারণ, শুধু পুলিশি নজরদারি বাড়িয়ে অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। স্থানীয় মানুষ এবং বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে সঙ্গে নিয়ে সামাজিক সচেতনতা তৈরি করাও প্রয়োজন। ফুটবল সেই যোগাযোগের একটি সহজ মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছে জেলা পুলিশ।
স্থানীয়দের মধ্যেও এই উদ্যোগকে ঘিরে উৎসাহ দেখা দিয়েছে। সাধারণত পুলিশের নাম শুনলেই যেখানে আইনশৃঙ্খলা, মামলা বা অপরাধের প্রসঙ্গ সামনে আসে, সেখানে পুলিশের উদ্যোগে মাঠে ফুটবল প্রতিযোগিতা আয়োজনের বিষয়টি অন্যরকম বার্তা দিচ্ছে। পুলিশের সঙ্গে এলাকার তরুণদের সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন এলাকার দল অংশ নেওয়ায় পারস্পরিক পরিচিতি এবং সম্প্রীতির পরিবেশও তৈরি হচ্ছে।
‘সীমান্ত সম্প্রীতি কাপ’ নামটির মধ্যেও সেই উদ্দেশ্য স্পষ্ট। সীমান্তবর্তী এলাকার বিভিন্ন সম্প্রদায় ও এলাকার তরুণদের একই মাঠে নিয়ে আসা, প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা এবং খেলাকে কেন্দ্র করে একটি সুস্থ সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলাই এই আয়োজনের অন্যতম দিক।
মুর্শিদাবাদের মতো সীমান্তবর্তী জেলায় এই উদ্যোগের গুরুত্ব তাই আলাদা। সীমান্তের ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে এখানকার মানুষকে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। তার মধ্যে অপরাধ ও মাদক পাচারের মতো বিষয়গুলি প্রশাসনের কাছে বাড়তি উদ্বেগের। তরুণ প্রজন্ম যদি সেই চক্রের বাইরে থেকে শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং খেলাধুলার মতো ইতিবাচক ক্ষেত্রে নিজেদের যুক্ত রাখতে পারে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তার সামাজিক প্রভাবও পড়তে পারে।
পুলিশের এই উদ্যোগ সেই ভাবনাকেই সামনে আনছে। ফুটবল মাঠকে শুধু প্রতিযোগিতার জায়গা হিসেবে না দেখে সামাজিক সচেতনতা এবং সম্প্রীতি তৈরির মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এক দিকে খেলোয়াড়দের মধ্যে প্রতিযোগিতার মানসিকতা, অন্য দিকে দলগত ভাবে এগিয়ে চলার শিক্ষা—দুই-ই তরুণদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এখন নজর ৫ সেপ্টেম্বরের ফাইনালের দিকে। কে হবে ‘সীমান্ত সম্প্রীতি কাপ ২০২৬’-এর প্রথম চ্যাম্পিয়ন, তা জানা যাবে সেদিনই। তবে ফলাফলের বাইরে এই আয়োজনের সাফল্য মাপা হবে আরও একটি জায়গায়—সীমান্ত এলাকার তরুণদের কতটা মাঠমুখী করা গেল এবং তাঁদের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক কতটা আরও নিবিড় হল।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি সমাজের ভিতরে ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য প্রশাসনের এই ধরনের উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, তা সময়ই বলবে। আপাতত রাণীনগরের মাঠে বল গড়িয়েছে। পুলিশের আশা, সেই বলের সঙ্গেই নতুন প্রজন্মও এগিয়ে যাবে অপরাধের অন্ধকার থেকে অনেক দূরে, খেলার মাঠ এবং শিক্ষার আলোর দিকে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments