Homeপূর্ব মেদিনীপুরপাঁশকুড়াপাঁচ দশক ধরে লেভেল ক্রসিংহীন ভোগপুর, ট্রেনের ধাক্কায় পড়ুয়ার মৃত্যুর পর ফের উঠল আন্ডারপাসের দাবি

পাঁচ দশক ধরে লেভেল ক্রসিংহীন ভোগপুর, ট্রেনের ধাক্কায় পড়ুয়ার মৃত্যুর পর ফের উঠল আন্ডারপাসের দাবি

নিউজ ডেস্ক; এক সময় রেললাইন পারাপারের জন্য লেভেল ক্রসিং ছিল ভোগপুরে। কিন্তু ১৯৭৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় জলের তোড়ে রেললাইনের সঙ্গে
resizeplus_Screenshot 2026-08-30 141002_edited

নিউজ ডেস্ক; এক সময় রেললাইন পারাপারের জন্য লেভেল ক্রসিং ছিল ভোগপুরে। কিন্তু ১৯৭৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় জলের তোড়ে রেললাইনের সঙ্গে সেই লেভেল ক্রসিংও ভেঙে যায়। রেললাইন পরে মেরামত হয়েছে, ট্রেন চলাচলও স্বাভাবিক হয়েছে। কিন্তু প্রায় পাঁচ দশক কেটে গেলেও আর তৈরি হয়নি লেভেল ক্রসিং। ফলে স্কুলপড়ুয়া থেকে স্থানীয় বাসিন্দা—প্রতিদিনই ঝুঁকি নিয়ে রেললাইন পারাপার করতে বাধ্য হন বহু মানুষ। মাঝেমধ্যেই সেই ঝুঁকি প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। গত মঙ্গলবার পাঁশকুড়া লোকালের ধাক্কায় ভোগপুর কেনারাম মেমোরিয়াল হাইস্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী সোমা জানার (১৪) মৃত্যুর পর ফের জোরালো হয়েছে দীর্ঘদিনের আন্ডারপাস তৈরির দাবি।

ভোগপুরের এই সমস্যার ইতিহাস অবশ্য নতুন নয়। প্রায় তিন দশক ধরে লেভেল ক্রসিং তৈরির দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন এলাকার মানুষ। কখনও রেল অবরোধ, কখনও স্মারকলিপি, কখনও সংগঠিত আন্দোলন—বিভিন্ন ভাবে রেলের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত স্থায়ী সমাধান হয়নি। ২০১৮ সালে রেলের তরফে একটি ক্যাটল আন্ডারপাস তৈরির অনুমোদন দেওয়া হলেও আন্দোলনকারীরা তাতে রাজি হননি। তাঁদের দাবি ছিল, গবাদি পশু পারাপারের জন্য ছোট আন্ডারপাস নয়, মানুষের নিরাপদ যাতায়াতের উপযোগী পূর্ণাঙ্গ আন্ডারপাস।

ভোগপুরের রেলপথের ইতিহাসও বেশ পুরনো। ১৯০০ সালে বেঙ্গল-নাগপুর রেলওয়ের অধীন খড়্গপুর-হাওড়া রেলপথ চালু হয়। বর্তমানে এই রেলপথ দক্ষিণ-পূর্ব রেলের আওতাধীন। সেই গুরুত্বপূর্ণ রেলপথের অন্যতম স্টেশন ভোগপুর। স্টেশনকে ঘিরে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গড়ে উঠেছে জনবসতি, বাজার এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ১৯৩৩ সালে স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় ভোগপুর কেনারাম মেমোরিয়াল হাইস্কুল। ফলে প্রতিদিন বহু ছাত্রছাত্রী ও স্থানীয় মানুষকে স্টেশনের আশপাশের রেললাইন পার হতে হয়।

এক সময় স্টেশন থেকে কিছুটা দূরে মেচেদার দিকে একটি লেভেল ক্রসিং ছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের রেললাইন পারাপারের ক্ষেত্রে সেটিই ছিল গুরুত্বপূর্ণ পথ। কিন্তু ১৯৭৮ সালের বন্যা বদলে দেয় পরিস্থিতি। প্রবল জলস্রোতে রেললাইন-সহ লেভেল ক্রসিংয়ের পরিকাঠামো ভেঙে যায়। পরে রেললাইন মেরামত করে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করা হলেও পুরনো লেভেল ক্রসিংটি আর পুনর্নির্মাণ করা হয়নি।

বন্যার পরিস্থিতি কেটে যাওয়ার পরই এলাকার মানুষ বুঝতে পারেন, নিরাপদ ভাবে রেললাইন পারাপারের জন্য তাঁরা কার্যত কোনও ব্যবস্থা ছাড়াই পড়ে রয়েছেন। রেললাইন পেরিয়ে স্কুল, বাজার বা অন্যত্র যাওয়ার প্রয়োজন থাকলেও নির্দিষ্ট পারাপারের ব্যবস্থা ছিল না। ফলে স্থানীয়রা নিজেদের মতো করে ঝুঁকি নিয়ে লাইন পার হতে শুরু করেন। এর মধ্যেই একের পর এক দুর্ঘটনার ঘটনা সামনে আসতে থাকে।

রেললাইনের উপর দিয়ে মানুষের চলাচল বন্ধ করতে বা নিরাপদ বিকল্প তৈরি করতে প্রশাসন ও রেলের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই দাবি জানিয়ে আসছিলেন বাসিন্দারা। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, সমস্যা ততই স্থায়ী হয়েছে। অবশেষে ১৯৯৭ সালে লেভেল ক্রসিং এবং এলাকার রাস্তা তৈরির দাবিতে সংগঠিত আন্দোলনের উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠে ‘ভোগপুর আঞ্চলিক উন্নয়ন পরিষদ’। এলাকার বিভিন্ন দাবি নিয়ে সংগঠিত ভাবে আন্দোলন শুরু করে এই সংগঠন।

তিন বছর পর, ২০০০ সালে পরিষদে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সংগঠনের নাম বদলে হয় ‘জয়েন্ট অ্যাকশন কমিটি’। দীর্ঘদিন দলমত নির্বিশেষে ভোগপুরের পরিকাঠামোগত সমস্যাগুলি নিয়ে আন্দোলন চালানো হয়। তবে ২০১১ সালে রাজ্যে বামেদের দীর্ঘ শাসনের অবসানের পর সেই কমিটি আর সক্রিয় থাকেনি।

এর পরের বছর, ২০১২ সালে নতুন করে তৈরি হয় ‘ভোগপুর লেভেল ক্রসিং নির্মাণ ও উন্নয়ন কমিটি’। ভোগপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তথা স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য কংগ্রেসের আশুতোষ মান্নাকে এই কমিটির সভাপতি করা হয়। নতুন কমিটি গঠনের পর লেভেল ক্রসিংয়ের দাবিতে আন্দোলন আরও জোরদার হয়।

এ বার আন্দোলনে শুধু এলাকার বাসিন্দারাই ছিলেন না। ভোগপুর কেনারাম মেমোরিয়াল হাইস্কুলের পড়ুয়ারাও রেল অবরোধে অংশ নেয়। স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের প্রতিদিনের যাতায়াতের সঙ্গে এই সমস্যাটি সরাসরি জড়িত হওয়ায় তাঁদের ক্ষোভও প্রকাশ্যে আসে। স্থানীয়দের বক্তব্য, দিনের পর দিন রেললাইন পার হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে যাতায়াত করতে হয় পড়ুয়াদের।

আন্দোলনের সেই সময়কার একটি ঘটনাও এখনও স্থানীয়দের মনে রয়েছে। এলাকাবাসীর একাংশের দাবি, রেলের এক আধিকারিক আন্দোলনকারীদের জানিয়েছিলেন, তাঁরা যদি নিজেরাই এক রাতের মধ্যে রেললাইন পারাপারের মতো একটি রাস্তা তৈরি করতে পারেন, তা হলে রেল সেই বিষয়টি দেখবে না। সেই কথাকে সামনে রেখেই রাতারাতি রাস্তা তৈরির উদ্যোগ নেন স্থানীয়রা।

স্লিপার এবং মোরাম ব্যবহার করে এক রাতের মধ্যেই ভোগপুর হাইস্কুলের সামনে রেললাইন পারাপারের জন্য একটি রাস্তা তৈরি করে ফেলেন তাঁরা। পরবর্তী সময়ে সেই রাস্তা দিয়ে ছোট চার চাকার গাড়িও রেললাইন পারাপার করত বলে স্থানীয়দের দাবি। তবে এটি কোনও সরকারি বা রেল অনুমোদিত স্থায়ী পারাপারের ব্যবস্থা ছিল না। ফলে নিরাপত্তার প্রশ্ন থেকেই যায়।

দীর্ঘ আন্দোলনের পরে ২০১৮ সালে রেলের তরফে ভোগপুরে একটি ক্যাটল আন্ডারপাস তৈরির অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু সেই প্রস্তাবে আন্দোলনকারীরা সন্তুষ্ট হননি। তাঁদের বক্তব্য ছিল, ভোগপুরের সমস্যা কেবল গবাদি পশু পারাপারের নয়। স্কুলপড়ুয়া, স্থানীয় বাসিন্দা এবং পথচারীদের জন্য নিরাপদ ও ব্যবহারযোগ্য একটি পূর্ণাঙ্গ আন্ডারপাস প্রয়োজন।

ফলে ক্যাটল আন্ডারপাসের পরিবর্তে পূর্ণ আন্ডারপাসের দাবি জানিয়ে ফের রেলের উচ্চপর্যায়ে বিষয়টি জানানো হয়। কমিটির তরফে দাবি পৌঁছে দেওয়া হয় রেলের সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত। কিন্তু অভিযোগ, তার পর থেকে একাধিক বার মৌখিক আশ্বাস মিললেও বাস্তবে কাজের কোনও অগ্রগতি চোখে পড়েনি।

এরই মধ্যে গত মঙ্গলবারের দুর্ঘটনা নতুন করে ক্ষোভ তৈরি করেছে। স্কুলে যাওয়ার পথে পাঁশকুড়া লোকালের ধাক্কায় মৃত্যু হয় নবম শ্রেণির ছাত্রী সোমা জানার। মাত্র ১৪ বছরের এক পড়ুয়ার মৃত্যু ফের প্রশ্ন তুলেছে—আর কত প্রাণ গেলে ভোগপুরে নিরাপদ রেললাইন পারাপারের ব্যবস্থা হবে?

স্থানীয়দের বক্তব্য, সমস্যাটি দীর্ঘদিনের এবং প্রশাসন ও রেল—দুই পক্ষই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। এত বছর ধরে আন্দোলন হওয়ার পরেও স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। বিশেষ করে স্কুলের সামনে রেললাইন পারাপারের অনানুষ্ঠানিক রাস্তা থাকায় পড়ুয়াদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেশি।

ভোগপুরের বাসিন্দাদের কাছে তাই এখন দাবি শুধু একটি লেভেল ক্রসিংয়ের নয়। তাঁদের বক্তব্য, বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরাপদ এবং বিজ্ঞানসম্মত রেললাইন পারাপারের ব্যবস্থা করতে হবে। অতীতের লেভেল ক্রসিং ফিরিয়ে আনা সম্ভব না হলে অন্তত পূর্ণাঙ্গ আন্ডারপাস তৈরি করা হোক। যাতে স্কুলের পড়ুয়া, স্থানীয় মানুষ এবং ছোট যানবাহন নিরাপদে রেললাইন পার হতে পারেন।

প্রায় ৫০ বছর ধরে একটি রেললাইন পারাপারের ব্যবস্থা নিয়ে যে অনিশ্চয়তা চলছে, সোমার মৃত্যু সেই পুরনো ক্ষতকে আরও গভীর করেছে। ১৯৭৮-এর বন্যার পর যে সমস্যা শুরু হয়েছিল, তা ২০২৬ সালেও পুরোপুরি মেটেনি। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে আন্দোলন, একাধিক কমিটি, রেল অবরোধ এবং ২০১৮ সালের ক্যাটল আন্ডারপাসের অনুমোদন—সব কিছুর পরেও ভোগপুরের মানুষ এখনও স্থায়ী সমাধানের অপেক্ষায়।

এখন তাঁদের প্রশ্ন একটাই—আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে? আর কত দুর্ঘটনার পর রেল এবং প্রশাসনের তরফে বাস্তব পদক্ষেপ করা হবে? সোমা জানার মৃত্যুর পর সেই প্রশ্নই ফের সামনে এসেছে। দীর্ঘদিনের দাবি এ বার অন্তত পূর্ণাঙ্গ আন্ডারপাস নির্মাণের দিকে এগোয় কি না, সেদিকেই তাকিয়ে ভোগপুরবাসী।

No Comments

তাজা খবর

আরও পড়ুন

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved