Homeপূর্ব বর্ধমানবর্ধমানহারিয়ে যাচ্ছে বর্ধমানের লোকসাহিত্য ও পুঁথি, সংরক্ষণে এখনই উদ্যোগ জরুরি

হারিয়ে যাচ্ছে বর্ধমানের লোকসাহিত্য ও পুঁথি, সংরক্ষণে এখনই উদ্যোগ জরুরি

নিউজ ডেস্ক; বর্ধমান শুধু একটি প্রাচীন জনপদ নয়, বাংলার শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসেও এই জেলার রয়েছে দীর্ঘ এবং গুরুত্বপূর্ণ
resizeplus_Screenshot 2026-08-30 150345_edited

নিউজ ডেস্ক; বর্ধমান শুধু একটি প্রাচীন জনপদ নয়, বাংলার শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসেও এই জেলার রয়েছে দীর্ঘ এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতা থেকে শুরু করে গ্রামবাংলার লোকসংস্কৃতি—বহু ধারার সৃজনশীলতার সাক্ষী এই অঞ্চল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ঐতিহ্যের একটি বড় অংশ আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে। কোথাও পোকায় কেটে নষ্ট হয়েছে পুরোনো পুঁথি, কোথাও অবহেলায় ধ্বংস হয়েছে হাতে লেখা পান্ডুলিপি, আবার কোথাও বা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মুখে মুখে চলে আসা লোকগাথা, ছড়া ও ব্রতকথা হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের স্মৃতি থেকে। সংরক্ষণের অভাবে বর্ধমানের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ইতিহাসের বহু মূল্যবান উপাদান হয়তো আর কোনও দিনই উদ্ধার করা সম্ভব হবে না।

এক সময় বর্ধমানের গ্রামাঞ্চলে লোকসাহিত্য ছিল মানুষের দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ। কৃষিকাজ, নদী, ঋতু, উৎসব, সামাজিক সম্পর্ক কিংবা ধর্মীয় আচার—জীবনের নানা অভিজ্ঞতা থেকেই তৈরি হয়েছিল অসংখ্য ছড়া, প্রবাদ-প্রবচন, লোকগাথা এবং ব্রতকথা। বিশেষ করে দামোদর নদকে ঘিরে গড়ে ওঠা জনজীবনে নানা ধরনের স্থানীয় কাহিনি ও কৃষিভিত্তিক ছড়ার প্রচলন ছিল। প্রবীণ প্রজন্মের অনেকের স্মৃতিতে এখনও তার কিছু অংশ রয়ে গেলেও নতুন প্রজন্মের কাছে সেই সাহিত্যিক উত্তরাধিকার ক্রমশ অচেনা হয়ে উঠছে।

মৌখিক ঐতিহ্যের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, তার লিখিত নথি অনেক ক্ষেত্রেই থাকে না। ফলে যে প্রজন্মের মানুষ কোনও লোককথা বা ছড়া জানতেন, তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে সেই সৃষ্টিও হারিয়ে যেতে পারে। এক সময় যে গান, গাথা বা ব্রতকথা গ্রামের উঠোনে, পুজোর অনুষ্ঠানে কিংবা কৃষিকাজের ফাঁকে উচ্চারিত হত, আজ তার অনেকগুলিই আর শোনা যায় না। ফলে বর্ধমানের লোকসংস্কৃতির একটি বিশাল অংশ নীরবে বিস্মৃতির দিকে চলে যাচ্ছে।

শুধু মৌখিক সাহিত্য নয়, বর্ধমানের লিখিত সাহিত্য-ঐতিহ্য নিয়েও একই রকম উদ্বেগ রয়েছে। বর্ধমান রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় এক সময়ে বহু পুঁথি ও পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করা হয়েছিল। রাজবাড়ির গ্রন্থাগার থেকে শুরু করে পুরোনো জমিদারবাড়ি—বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিল দুর্লভ নথি ও হাতে লেখা সাহিত্যকর্ম। সেই সব সংগ্রহের মধ্যে ধর্মীয় সাহিত্য যেমন ছিল, তেমনই ছিল স্থানীয় সমাজ, সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনযাত্রার নানা দিকের দলিল।

কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে যথাযথ সংরক্ষণ না হওয়ায় সেই মূল্যবান সংগ্রহের বড় অংশ নষ্ট হয়ে গিয়েছে বলে মনে করা হয়। আর্দ্রতা, পোকামাকড়, উইপোকা কিংবা অবহেলার কারণে বহু পুরোনো কাগজ আর টেকেনি। আবার কিছু পুঁথি ও পান্ডুলিপি সময়ের সঙ্গে হাতবদল হয়ে ব্যক্তিগত সংগ্রহে চলে গিয়েছে। ফলে এক সময়ে যে নথিগুলি কোনও একটি পরিবারের বা প্রতিষ্ঠানের সংগ্রহে ছিল, সেগুলির অনেকগুলিই আজ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

এই নথিগুলির গুরুত্ব শুধু সাহিত্যিক মূল্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একটি পুরোনো পুঁথি বা হাতে লেখা খাতা থেকে কোনও নির্দিষ্ট সময়ের ভাষা, সামাজিক রীতি, ধর্মীয় বিশ্বাস, কৃষিজীবন কিংবা স্থানীয় ইতিহাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। সরকারি নথিতে যে ইতিহাস লেখা থাকে, তার বাইরেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার একটি সমান্তরাল ইতিহাস লুকিয়ে থাকে এই ধরনের ব্যক্তিগত নথি ও লোকসাহিত্যের মধ্যে।

বর্ধমানের পুরোনো সাময়িকপত্রগুলিও এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। উনিশ শতক এবং বিশ শতকের গোড়ার দিকে এই অঞ্চল থেকে একাধিক ছোট পত্রিকা ও সাময়িকপত্র প্রকাশিত হত। অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় লেখক, সম্পাদক বা সমাজসচেতন ব্যক্তিরা নিজেদের উদ্যোগে এই পত্রিকা প্রকাশ করতেন। সেখানে স্থানীয় ইতিহাস, সামাজিক সংস্কার, শিক্ষার প্রসার, মানুষের জীবনযাত্রা এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ নিয়ে লেখা প্রকাশিত হত।

সময়ের সঙ্গে সেই সব পত্রিকার অধিকাংশ কপি কোথায় হারিয়ে গিয়েছে, তারও কোনও নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই। অথচ আজকের গবেষকদের কাছে ওই পত্রিকাগুলির একটি সংখ্যাও অমূল্য হয়ে উঠতে পারে। কারণ স্থানীয় ইতিহাসের বহু ঘটনা জাতীয় বা প্রাদেশিক স্তরের নথিতে জায়গা না পেলেও ছোট পত্রিকায় তার বিস্তারিত বিবরণ থাকতে পারে। ফলে এই প্রকাশনাগুলি হারিয়ে যাওয়ার অর্থ শুধু পুরোনো কাগজ হারানো নয়, স্থানীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হারিয়ে যাওয়া।

একই ভাবে হারিয়ে গিয়েছে বর্ধমানের গ্রামাঞ্চলের বহু নিজস্ব নাট্য ও যাত্রাপালার পাণ্ডুলিপি। এক সময় স্থানীয় কবি, নাট্যকার কিংবা সংস্কৃতিপ্রেমীরা নিজেদের হাতে নাটকের খাতা লিখতেন। বিভিন্ন গ্রাম্য উৎসব, মেলা কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে সেই নাটক ও যাত্রাপালা মঞ্চস্থ হত। কিন্তু সেগুলির অধিকাংশই কখনও ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয়নি। সংরক্ষণের কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাও ছিল না।

ফলে একটি প্রজন্মের শিল্পীরা চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের লেখা নাটক, সংলাপ কিংবা যাত্রার কাহিনিও হারিয়ে গিয়েছে। অথচ ওই লেখাগুলির মধ্যে তৎকালীন গ্রামীণ সমাজের মানসিকতা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সামাজিক রীতিনীতি এবং মানুষের বিনোদনের ধরন সম্পর্কে বহু তথ্য থাকতে পারে।

তবে এখনও সবকিছু হারিয়ে যায়নি। বর্ধমানের বিভিন্ন পুরোনো বাড়ি, জমিদারবাড়ি কিংবা গ্রামীণ পরিবারের আলমারি ও সিন্দুকে হয়তো ছড়িয়ে রয়েছে পুরোনো খাতা, পাণ্ডুলিপি, চিঠি, সাময়িকপত্র বা নথি। অনেক পরিবার হয়তো এখনও বুঝতেই পারছে না, তাদের ঘরে থাকা বিবর্ণ কাগজের সেই বান্ডিলের ঐতিহাসিক গুরুত্ব কতটা।

এই পরিস্থিতিতে প্রয়োজন পরিকল্পিত ভাবে স্থানীয় সাংস্কৃতিক সম্পদ খুঁজে বের করা। প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয়, স্থানীয় গ্রন্থাগার, গবেষক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলিকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। গ্রামে গ্রামে সমীক্ষা চালিয়ে পুরোনো পুঁথি, পান্ডুলিপি, নাটকের খাতা, সাময়িকপত্র কিংবা ব্যক্তিগত নথির সন্ধান করা যেতে পারে। মূল নথি মালিকের কাছেই রেখে উচ্চমানের স্ক্যান কপি তৈরি করা সম্ভব। এতে নথির নিরাপত্তাও বজায় থাকবে, আবার গবেষকদের জন্য তৈরি হবে একটি বড় তথ্যভান্ডার।

মৌখিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও একই ভাবে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এখনও যাঁরা বর্ধমানের পুরোনো লোকগাথা, ছড়া, প্রবাদ কিংবা ব্রতকথা জানেন, তাঁদের বক্তব্য অডিয়ো-ভিডিয়ো রেকর্ড করা যেতে পারে। কোন গ্রামের কোন কাহিনি, কার কাছ থেকে তা সংগ্রহ করা হয়েছে, তারও বিস্তারিত তথ্য রাখা প্রয়োজন। পরবর্তীতে এই সমস্ত তথ্য নিয়ে একটি উন্মুক্ত ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি করা যেতে পারে।

প্রযুক্তির সাহায্যে এই কাজ এখন আগের তুলনায় অনেক সহজ। পুরোনো নথির ডিজিটাল কপি, অডিয়ো রেকর্ডিং, ভিডিয়ো সাক্ষাৎকার এবং ঐতিহাসিক ছবিকে এক জায়গায় রেখে তৈরি হতে পারে ‘বর্ধমান হেরিটেজ আর্কাইভ’। গবেষক, পড়ুয়া এবং সাধারণ মানুষ সেখান থেকে জেলার অতীতের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এই উদ্যোগকে শুধু পুরোনো সাহিত্য সংরক্ষণের প্রকল্প হিসেবে দেখলে চলবে না। বর্ধমানের লোকগাথা, পুঁথি, নাটকের খাতা, পুরোনো পত্রিকা কিংবা গ্রামীণ ছড়া—প্রতিটিই এই জেলার সামাজিক স্মৃতির অংশ। এগুলির মধ্যে দিয়ে জানা যায় সাধারণ মানুষের জীবন, তাঁদের ভাষা, তাঁদের বিশ্বাস, তাঁদের আনন্দ-বেদনা এবং সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া সমাজের ছবি।

আজ যে বৃদ্ধ মানুষটি কোনও বিস্মৃত লোকগাথা মুখে মুখে বলে যেতে পারেন, তাঁর স্মৃতিই হয়তো আগামী দিনে সেই গাথার একমাত্র উৎস হয়ে উঠবে। তিনি চলে গেলে হয়তো গল্পটিও হারিয়ে যাবে চিরতরে। তাই সংরক্ষণের কাজ আগামী দিনের জন্য ফেলে রাখার সুযোগ নেই।

বর্ধমানের হারিয়ে যাওয়া সাহিত্য ও লোকঐতিহ্য আসলে কয়েকটি পুরোনো কাগজের বান্ডিল নয়। এগুলি একটি অঞ্চলের পরিচয়, মানুষের স্মৃতি এবং বহু প্রজন্মের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। তাই সময় থাকতে সেই সম্পদ খুঁজে বের করে নথিবদ্ধ ও ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষণ করাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।

No Comments

তাজা খবর

আরও পড়ুন

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved