Homeউত্তর ২৪ পরগনাবসিরহাটবাড়িতে বাড়িতে জমছে ছোট এক টাকার কয়েন, ছেঁড়া নোট! বসিরহাটে খুচরোর সঙ্কটে বাড়ছে ক্ষোভ

বাড়িতে বাড়িতে জমছে ছোট এক টাকার কয়েন, ছেঁড়া নোট! বসিরহাটে খুচরোর সঙ্কটে বাড়ছে ক্ষোভ

নিউজ ডেস্ক; বাজারে গেলে এক টাকার ছোট কয়েন নিতে চাইছেন না কেউ। হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে লজেন্স বা বিস্কুট। ১০
resizeplus_WhatsApp Image 2026-08-29 at 1.35.39 AM

নিউজ ডেস্ক; বাজারে গেলে এক টাকার ছোট কয়েন নিতে চাইছেন না কেউ। হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে লজেন্স বা বিস্কুট। ১০ কিংবা ২০ টাকার নোট একটু বেশি ছেঁড়া, ফাটা বা ময়লা হলেই সেটিও নিতে আপত্তি করছেন দোকানদার থেকে সাধারণ ক্রেতা। ফলে বাড়িতে বাড়িতে জমতে শুরু করেছে ছোট এক টাকার কয়েন এবং পুরনো-ছেঁড়া নোট। বসিরহাট মহকুমার বিভিন্ন এলাকায় এমনই অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বৈধ মুদ্রা ও নোট থাকা সত্ত্বেও তা দিয়ে লেনদেন করতে না পারায় ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

ঘটনার ছবিটা আরও স্পষ্ট হয় এক বৃদ্ধ ভিক্ষুককে ঘিরে। পথচলতি এক যুবক তাঁকে সাহায্য করতে পকেট থেকে এক টাকার ছোট কয়েন বের করে হাতে দিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু কয়েনটি দেখেই বৃদ্ধ হাত সরিয়ে নেন। যুবক অবাক হয়ে জানতে চান, এক টাকার কয়েনটি তিনি নেবেন না কেন। বৃদ্ধের উত্তর, ‘কেউ নিতে চায় না।’ অর্থাৎ কয়েনটি তাঁর কাছে থাকলেও তা দিয়ে পরবর্তী সময়ে কোনও প্রয়োজন মেটানো যাবে না— এমনটাই তাঁর ধারণা।

এই ধারণাই এখন বসিরহাট মহকুমার বাজার অর্থনীতিতে কার্যত সমস্যা তৈরি করছে বলে অভিযোগ। এক টাকার বড় কয়েন নিয়ে তেমন আপত্তি নেই। কিন্তু ছোট আকারের নতুন এক টাকার কয়েন দেখলেই অনেকে তা নিতে চাইছেন না। ফলে যাঁদের হাতে এই কয়েন রয়েছে, তাঁরা তা দিয়ে কেনাকাটা করতে পারছেন না। অনেকে বাধ্য হয়ে সেই কয়েন বাড়িতে জমিয়ে রাখছেন।

শুধু কয়েন নয়, সমস্যার দ্বিতীয় দিকটি আরও বড়। বাজারে ঘুরে বেড়ানো ১০ এবং ২০ টাকার বহু নোটের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ বলে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ। ছেঁড়া, ফাটা, ময়লা কিংবা বহু পুরনো নোট পরবর্তী দোকানে চালানো যাচ্ছে না। ফলে একটি নোট একবার কোনও ব্যবসায়ীর হাতে এলে তিনিও সেটি নিতে অনীহা দেখাচ্ছেন। এর জেরে নগদ লেনদেনের পুরো ব্যবস্থাতেই তৈরি হচ্ছে অস্বস্তি।

কলেজপাড়া বাজারের আনাজ ব্যবসায়ী রতন মণ্ডল এবং পরিতোষ সাহাদের অভিযোগ, খদ্দেরকে এক টাকার ছোট কয়েন ফেরত দিলে অনেকেই তা নিতে চান না। অন্য দিকে ছেঁড়া নোট নিয়েও সমস্যা তৈরি হচ্ছে। পরিচিত ক্রেতাদের ক্ষেত্রে তাঁরা কখনও কখনও খাতায় হিসাব লিখে রাখছেন। সেই বাকি টাকা ৫০ বা ১০০ টাকা হলে পরে একসঙ্গে মিটিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু অপরিচিত ক্রেতাদের ক্ষেত্রে এমন ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে হিসাব মিটিয়ে চলে যেতে চান।

ফলে খুচরো না থাকা এবং ক্রেতার কয়েন বা বিকল্প হিসেবে দেওয়া লজেন্স-বিস্কুট নিতে অস্বীকার করার মধ্যে পড়ে বিপাকে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের দাবি, অনেক সময় পরিস্থিতি সামাল দিতে বাধ্য হয়ে কয়েক টাকা কম নিয়েও ক্রেতাকে ছেড়ে দিতে হচ্ছে। কারণ হাতে গ্রহণযোগ্য খুচরো নেই, আবার যে কয়েন রয়েছে সেটিও ক্রেতা নিতে চাইছেন না।

এই পরিস্থিতিতে বসিরহাটের বাজারে এখন অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। আনাজের দোকান থেকে মুদিখানা, মাছের বাজার থেকে ফুচকার ঠেলা— প্রায় সর্বত্রই লজেন্স বা বিস্কুটের প্যাকেট সাজিয়ে রাখতে হচ্ছে। খুচরো ফেরত দেওয়ার সময় টাকার বদলে সেগুলি ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন বিক্রেতারা। অটো, টোটো, রিকশা এবং বাসের ক্ষেত্রেও একই সমস্যার কথা শোনা যাচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের যুক্তি, এক টাকার খুচরো না থাকলে ক্রেতাকে কিছু একটা বিকল্প দিতেই হয়। কিন্তু ক্রেতাদের প্রশ্ন, তাঁরা তো টাকা দিয়েই পণ্য কিনছেন, তাহলে বাকি টাকার জায়গায় কেন তাঁদের লজেন্স বা বিস্কুট নিতে হবে? অনেকেই এই বিকল্প গ্রহণ করতে রাজি নন। ফলে সামান্য এক-দু’টাকার হিসাব নিয়েও তৈরি হচ্ছে বচসা।

কখনও সেই বচসা এতটাই বাড়ছে যে পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশকে ঘটনাস্থলে যেতে হচ্ছে বলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে। অর্থাৎ যে সমস্যা দেখতে সামান্য বলে মনে হতে পারে, তা ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন লেনদেনে বিরক্তি এবং ক্ষোভের কারণ হয়ে উঠছে।

বসিরহাটের এই সমস্যা অবশ্য একেবারে নতুন নয়। কয়েক বছর আগেও মহকুমার বিভিন্ন এলাকায় এক টাকার কয়েন নিয়ে একই ধরনের অনীহা তৈরি হয়েছিল। তখন খুচরোর সমস্যা দেখা দেওয়ার পরে প্রশাসনের তরফে সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হয়। প্রশাসনের প্রচারের ফলে কয়েক মাস পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছিল এবং মানুষ আবার এক টাকার কয়েন গ্রহণ করতে শুরু করেছিলেন।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই পুরনো সমস্যাই যেন নতুন করে ফিরে এসেছে। এবার তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ছেঁড়া ও জীর্ণ নোটের সমস্যা। প্রশাসনের এক কর্তার কথায়, বিষয়টি শুধু এক টাকার ছোট কয়েনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ১০ ও ২০ টাকার যে নোটগুলি বাজারে ঘুরছে, সেগুলির অনেকগুলির অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। সাধারণ মানুষ থেকে ব্যবসায়ী— সকলেই এতে সমস্যায় পড়ছেন।

হিঙ্গলগঞ্জ বাজারের মুদি ব্যবসায়ী চন্দ্রনাথ বাছাড়ের বক্তব্য, নতুন এবং পরিষ্কার ১০ ও ২০ টাকার নোটের জোগান যথেষ্ট না থাকায় ব্যবসায়ীদের সমস্যা বাড়ছে। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর এলাকায় যেখানে বহু মানুষ এখনও নগদ টাকার উপর নির্ভরশীল, সেখানে এই সমস্যা আরও প্রকট। তাঁর মতে, নিম্ন আয়ের মানুষজনই সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন।

কারণ ডিজিটাল লেনদেনের বিকল্প থাকলে ছোটখাটো খুচরোর সমস্যা অনেকটাই এড়ানো সম্ভব। শহরাঞ্চলে ফুচকা, চা, অটো কিংবা ছোট দোকানেও কিউআর কোডের মাধ্যমে টাকা দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। কিন্তু বসিরহাট মহকুমার বহু বাজার এবং ছোট ব্যবসায়ীর কাছে এখনও সেই সুবিধা সহজলভ্য নয়। ফলে নগদ টাকা এবং খুচরো মুদ্রার উপর নির্ভরতা বেশি।

এই সুযোগেই বিভিন্ন ধরনের গুজবও ছড়াচ্ছে বলে অভিযোগ। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, ছোট এক টাকার কয়েন নাকি সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে চলে যাচ্ছে। পরে সেই কয়েন গলিয়ে ধাতু হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও বাজারে কথা রয়েছে। তবে এই দাবির কোনও নির্ভরযোগ্য ভিত্তি এখনও সামনে আসেনি।

বরং প্রশ্ন উঠছে, যদি ছোট কয়েন সত্যিই কোনও কারণে সীমান্তের ওপারে চলে যায়, তা হলে দেশের মধ্যে থাকা কয়েনকে বৈধ মুদ্রা হিসেবে গ্রহণ করতে আপত্তি কেন? আর একটি নির্দিষ্ট আকারের এক টাকার কয়েনকে শুধু লোকমুখে প্রচলিত ধারণার ভিত্তিতে প্রত্যাখ্যান করারই বা কারণ কী? এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর নেই।

ব্যবসায়ীদের একাংশ আবার এর পিছনে কোনও ‘চক্রান্ত’ রয়েছে কি না, সেই সন্দেহও প্রকাশ করছেন। তবে সেই অভিযোগেরও কোনও নির্দিষ্ট প্রমাণ এখনও সামনে আসেনি। ফলে বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে গুজব, ভুল ধারণা এবং একে অন্যের দেখাদেখি বৈধ মুদ্রা প্রত্যাখ্যান করার প্রবণতা।

এর প্রভাব পড়ছে ঘরের ভিতরেও। বাজারে ছোট কয়েন চালানো না গেলে মানুষ সেগুলি আলাদা করে রেখে দিচ্ছেন। একই ভাবে কোনও দোকানদার ছেঁড়া নোট নিতে না চাইলে সেই নোটও অন্যের হাতে দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে একটি পরিবারের কাছে জমে থাকা কয়েন ও নোট ক্রমশ অন্য পরিবারের কাছেও পৌঁছতে পারছে না। বাজারে অর্থের স্বাভাবিক ঘূর্ণন ব্যাহত হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

ছোট ব্যবসায়ীদের সমস্যা আরও গুরুতর। তাঁদের প্রতিদিনের লেনদেনের শেষে নির্দিষ্ট পরিমাণ নগদ হাতে থাকে। খুচরো না থাকলে হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে যায়। আবার খুচরো থাকলেও ক্রেতা তা নিতে অস্বীকার করলে ব্যবসায়ীর হাতে সেই মুদ্রা জমতেই থাকে। অন্য দিকে নতুন পরিষ্কার নোটের জোগান কম থাকায় ১০ ও ২০ টাকার নোট নিয়েও একই সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। এক দিকে ছোট এক টাকার কয়েন নিয়ে মানুষের ভুল ধারণা দূর করতে হবে, অন্য দিকে বাজারে প্রচলিত নষ্ট নোট নিয়ে সাধারণ মানুষকে সঠিক তথ্য জানাতে হবে। কয়েক বছর আগে সচেতনতা প্রচারের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গিয়েছিল। এবারও একই ধরনের উদ্যোগ কতটা দ্রুত নেওয়া যায়, সেদিকেই নজর।

কারণ এক টাকার একটি কয়েনের মূল্য সামান্য হলেও তার চারপাশে তৈরি হওয়া অবিশ্বাসের অর্থনৈতিক প্রভাব একেবারেই ছোট নয়। খুচরো লেনদেনের উপর নির্ভরশীল সাধারণ মানুষ, ভিক্ষুক, হকার, পরিবহণকর্মী এবং ছোট ব্যবসায়ীরাই প্রথম ধাক্কাটি অনুভব করছেন।

বসিরহাটের মানুষের তাই দাবি, প্রশাসন দ্রুত স্পষ্ট করে জানাক কোন মুদ্রা এবং নোট বৈধ, কোন পরিস্থিতিতে তা গ্রহণ করা উচিত এবং ছেঁড়া বা ক্ষতিগ্রস্ত নোট বদলের ব্যবস্থা কী। একই সঙ্গে বাজারে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। নইলে আজ এক টাকার ছোট কয়েন, কাল অন্য কোনও নোট বা মুদ্রা নিয়ে একই ধরনের গুজব ছড়িয়ে পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে বসিরহাটে এখন এক অদ্ভুত আর্থিক পরিস্থিতি— টাকা আছে, কিন্তু সেই টাকা চালাতে সমস্যা। বাড়ির ড্রয়ারে জমছে ছোট এক টাকার কয়েন, আলমারি বা মানিব্যাগে পড়ে থাকছে ছেঁড়া নোট। আর বাজারে খুচরোর পরিবর্তে জায়গা করে নিচ্ছে লজেন্স-বিস্কুট। সমস্যাটি দ্রুত সমাধান না হলে এই অস্বস্তি যে আরও বড় ক্ষোভে পরিণত হতে পারে, সেই আশঙ্কাই করছেন ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved