
নিউজ ডেস্ক; তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠা দিবসের কর্মসূচিকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা। কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশ অমান্য করে ক্যাথিড্রাল রোডে সভা করার অভিযোগে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে এফআইআর দায়ের করল কলকাতা পুলিশ। হেস্টিংস থানায় দায়ের হওয়া এই মামলায় শুধু মমতা নন, তৃণমূল ছাত্র পরিষদের ওই কর্মসূচির উদ্যোক্তাদেরও অভিযুক্ত করা হয়েছে। পুলিশের অভিযোগ, আদালতের নির্দিষ্ট নির্দেশ মেনে সভা পরিচালিত হয়নি এবং সভাকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি ও যান চলাচলে বিঘ্নের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ২৮ অগস্ট হেস্টিংস থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন সাব-ইনস্পেক্টর অপূ বৈদ্য। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই মামলা রুজু হয়েছে। পুলিশের দাবি, ক্যাথিড্রাল রোডে আয়োজিত ছাত্র পরিষদের সভা থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কর্মসূচির উদ্যোক্তারা এমন কিছু বক্তব্য ও আচরণ করেছেন, যার ফলে আদালতের নির্দেশ অমান্য হওয়ার পাশাপাশি সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল।
এই ঘটনায় হাই কোর্টের নির্দেশের বিষয়টিই এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ক্যাথিড্রাল রোডের একটি লেনে সভা করার অনুমতি ছিল। অন্য লেনটি যান চলাচলের জন্য খোলা রাখার কথা ছিল। পুলিশের অভিযোগ, বাস্তবে সেই নির্দেশ যথাযথ ভাবে মানা হয়নি। সভাকে ঘিরে লোকজন রাস্তার অন্য অংশেও চলে আসায় যান চলাচলে সমস্যা তৈরি হয় বলে দাবি পুলিশের।
পুলিশের আরও অভিযোগ, সভাস্থলে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে কয়েক জন সমর্থক পুলিশের দেওয়া ব্যারিকেড সরিয়ে দেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সেখানে মোতায়েন পুলিশকর্মীদের সঙ্গে কয়েক জন সমর্থকের ধস্তাধস্তিও হয় বলে অভিযোগ। ফলে সভাস্থল ঘিরে পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশকে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়।
এখানেই শেষ নয়। সভার সময় নিয়েও পুলিশের অভিযোগ রয়েছে। হাই কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী দুপুর ১২টা থেকে ৩টে পর্যন্ত সভা করার সময় নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। কিন্তু নির্ধারিত সময়সীমাও অতিক্রম করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। একই সঙ্গে সভাস্থলের আশপাশে মানুষের ভিড় এবং রাস্তার একটি অংশ কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যানজট তৈরি হয়।
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, আদালতের নির্দেশের মূল উদ্দেশ্য ছিল সভা এবং যান চলাচল— দু’টি বিষয়কেই সমন্বয় করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। সেই কারণেই রাস্তার একটি লেন সভার জন্য এবং অন্য লেন যান চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছিল। কিন্তু সভা চলাকালীন সেই ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়ে বলে পুলিশের দাবি।
মামলায় একাধিক ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ভারতীয় ন্যায় সংহিতার অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, সরকারি নির্দেশ অমান্য করা, অন্যের জীবন বা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বিপন্ন করা, সরকারি কর্মচারীকে দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া ও বলপ্রয়োগ এবং রাস্তাঘাটে যাতায়াতে বাধা সৃষ্টি সংক্রান্ত ধারায় মামলা করা হয়েছে।
তবে এই এফআইআরকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোর যে আরও বাড়বে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কারণ, ঘটনাটি শুধু একটি রাজনৈতিক সভাকে ঘিরে পুলিশের অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে গিয়েছে আদালতের নির্দেশ, প্রশাসনের ভূমিকা এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন।
শুক্রবার ক্যাথিড্রাল রোডে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভা শেষ হওয়ার পরই তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআর করার কথা জানিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। যাদবপুরে রাখিবন্ধন উৎসবের শেষে সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আদালতের নির্দেশ মেনে রাস্তার একটি অংশ ছেড়ে সভা করার কথা ছিল। কিন্তু সেই নির্দেশ অমান্য করে রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে তাঁর অভিযোগ।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য ছিল, ‘দেখলেন কী ভাবে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী হাই কোর্টের অর্ডার ভাঙলেন! রাস্তার একটি ফ্ল্যাঙ্ক ছেড়ে (সভা) করতে বলেছিল। গাছের নীচে থাকা লোককে ডেকে রাস্তা বন্ধ করিয়ে কী করলেন? আমি পুলিশকে বলেছি এফআইআর রুজু করতে আর ওঁর বিরুদ্ধে হাই কোর্টে মুভ করতে। ছাড়া হবে না।’
এর পরেই পুলিশের তরফে এফআইআর দায়ের হওয়ায় বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যদিও পুলিশ বলছে, মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের ভিত্তিতে নয়, তাদের নিজস্ব অভিযোগের ভিত্তিতেই মামলা রুজু করা হয়েছে। সাব-ইনস্পেক্টরের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে হেস্টিংস থানায় আইনানুগ প্রক্রিয়ায় এফআইআর হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রের দাবি।
তদন্তে এখন মূলত কয়েকটি বিষয় খতিয়ে দেখা হবে। প্রথমত, সভার সময়ে আদালতের নির্দেশ ঠিক কতটা মানা হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, রাস্তার কোন অংশে যান চলাচল বন্ধ হয়েছিল এবং কতক্ষণ ধরে যানজট তৈরি হয়েছিল। তৃতীয়ত, পুলিশের ব্যারিকেড সরানোর ঘটনা বা পুলিশকর্মীদের সঙ্গে ধস্তাধস্তির ঘটনায় কারা জড়িত ছিলেন। পাশাপাশি সভায় উপস্থিত বক্তাদের বক্তব্য এবং তাঁদের বক্তব্যের ফলে কোনও উস্কানিমূলক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল কি না, তাও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
এ ক্ষেত্রে সভাস্থলের ভিডিয়ো ফুটেজ গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়ে উঠতে পারে। ক্যাথিড্রাল রোডের আশপাশে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ, পুলিশের ক্যামেরায় ধরা পড়া ছবি এবং সভার বিভিন্ন ভিডিয়ো সংগ্রহ করে ঘটনাক্রম পুনর্গঠনের চেষ্টা করতে পারেন তদন্তকারীরা। ব্যারিকেড সরানোর ঘটনা বা পুলিশকর্মীদের সঙ্গে ধস্তাধস্তির অভিযোগের সত্যতাও সেই ফুটেজের মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব।
রাজনৈতিক মহলের নজর এখন আরও একটি সম্ভাব্য আইনি লড়াইয়ের দিকে। কারণ, মুখ্যমন্ত্রী আগেই জানিয়েছিলেন, শুধু থানায় এফআইআর নয়, হাই কোর্টেও বিষয়টি নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। ফলে পুলিশের তদন্তের পাশাপাশি আদালতে এই নির্দেশ অমান্যের অভিযোগ কী ভাবে বিচারাধীন হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অন্য দিকে, তৃণমূলের তরফে এই এফআইআরকে কী ভাবে দেখা হবে এবং দলীয় নেতৃত্বের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়েও রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠা দিবসের মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির পরেই দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে পুলিশের মামলা রাজনৈতিক সংঘাতকে আরও তীব্র করতে পারে।
সব মিলিয়ে, ক্যাথিড্রাল রোডের সভাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্ক এখন পৌঁছে গেল আইনি লড়াইয়ের পর্যায়ে। আদালতের নির্দেশ অমান্য হয়েছিল কি না, সভার কারণে সত্যিই যান চলাচল ব্যাহত হয়েছিল কি না এবং পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তির অভিযোগ কতটা সত্য— তদন্তেই তার উত্তর মিলবে। তবে এফআইআর দায়েরের ফলে আগামী দিনে রাজ্য রাজনীতিতে এই ঘটনাকে ঘিরে চাপানউতোর আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments