
নিউজ ডেস্ক; রেশন ব্যবস্থায় অনিয়ম এবং নিম্নমানের খাদ্যশস্য নিয়ে অভিযোগের মধ্যেই আচমকা রেশন দোকানে হাজির খাদ্যমন্ত্রী অশোক কীর্তনিয়া। শনিবার বাঁকুড়া-১ নম্বর ব্লকের কেঞ্জাকুড়া পঞ্চায়েতের হরেকৃষ্ণপুর গ্রামের একটি রেশন দোকানে সারপ্রাইজ় ভিজ়িট করেন তিনি। দোকানে ঢুকে মজুত থাকা চাল, ডাল এবং গম সরেজমিনে পরীক্ষা করে দেখেন মন্ত্রী। খাদ্যশস্যের মান নিয়ে রেশন ডিলারকে সতর্ক করার পাশাপাশি স্থানীয় গ্রাহকদেরও সচেতন হওয়ার বার্তা দেন তিনি।
মন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, রেশন দোকান থেকে নিম্নমানের খাদ্যশস্য দেওয়া হলে তা কোনও ভাবেই গ্রহণ করা উচিত নয়। পোকা ধরা বা খারাপ চাল-গম দেওয়া হলে তা বাড়িতে না নিয়ে গিয়ে দোকানেই প্রতিবাদ করতে হবে। তাঁর কথায়, ভালো মানের খাদ্যশস্য পাওয়া গ্রাহকদের অধিকার এবং সেই মান বজায় রাখা রেশন ডিলারের দায়িত্ব।
এ দিন বাঁকুড়া সফরে প্রথমে আদিবাসী প্রধান ধুলকুমারী গ্রামে যান খাদ্যমন্ত্রী। সেখানে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের অভাব-অভিযোগের কথা শোনেন। রেশন পরিষেবা ঠিকঠাক মিলছে কি না, খাদ্যশস্যের মান নিয়ে কোনও সমস্যা রয়েছে কি না, সেই বিষয়েও বাসিন্দাদের কাছে জানতে চান তিনি। পরে কেঞ্জাকুড়া পঞ্চায়েতের হরেকৃষ্ণপুর গ্রামের রেশন দোকানে পৌঁছন অশোক।
সাধারণত আগে থেকে নির্দিষ্ট কর্মসূচি অনুযায়ী বিভিন্ন জায়গায় মন্ত্রীর পরিদর্শন হয়ে থাকে। কিন্তু এ দিনের রেশন দোকান পরিদর্শন ছিল আচমকাই। ফলে মন্ত্রী দোকানে পৌঁছনোর পর রেশন ব্যবস্থার বাস্তব পরিস্থিতি সরাসরি খতিয়ে দেখার সুযোগ পান। দোকানে থাকা চাল, ডাল ও গম পরীক্ষা করেন তিনি। খাদ্যশস্যের মজুত, গুণমান এবং গ্রাহকদের কী দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়েও খোঁজ নেন।
পরিদর্শনের সময় রেশন ডিলারদের উদ্দেশে কড়া বার্তা দেন মন্ত্রী। কোনও গ্রাহককে খারাপ বা নিম্নমানের খাদ্যশস্য দেওয়া যাবে না বলে সতর্ক করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, রেশন দোকান থেকে খাদ্যশস্য নিয়ে যাতে কোনও গ্রাহককে অভিযোগ করতে না হয়, সে বিষয়ে ডিলারদের দায়িত্বশীল হতে হবে।
এর পরেই স্থানীয় গ্রাহকদের উদ্দেশে আরও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন খাদ্যমন্ত্রী। রেশন দোকানে দাঁড়িয়ে থাকা উপভোক্তাদের তিনি বলেন, দোকান থেকে পোকা ধরা চাল বা গম দেওয়া হলে তা বাড়িতে নিয়ে যাওয়া যাবে না। দোকানেই বিষয়টি জানিয়ে প্রতিবাদ করতে হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানানোর কথাও বলা হয়েছে।
অশোকের এই বার্তায় মূলত রেশন গ্রাহকদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়ার আহ্বানই উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে রেশন ব্যবস্থায় নিম্নমানের চাল, গম কিংবা অন্যান্য খাদ্যশস্য দেওয়ার অভিযোগ বিভিন্ন জায়গা থেকে সামনে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকেরা সমস্যার কথা জানালেও বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করেন না। সেই জায়গা থেকেই গ্রাহকদের আরও সক্রিয় হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন মন্ত্রী।
রেশন ব্যবস্থায় দুর্নীতি নিয়েও এ দিন সরব হন অশোক। তাঁর দাবি, দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে সরকার কোনও রকম নরম মনোভাব দেখাবে না। ইতিমধ্যে অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় কয়েক জন রেশন ডিলারের লাইসেন্স সাসপেন্ড করা হয়েছে এবং কাউকে কাউকে জেলেও পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি। শুধু ডিলার নয়, সরকারি আধিকারিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলেও সাসপেনশনের মতো পদক্ষেপ করা হয়েছে বলে তাঁর দাবি।
খাদ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, রেশন ব্যবস্থায় দুর্নীতি বা অনিয়মের সঙ্গে কোনও ভাবেই আপস করবে না সরকার। সরকারি খাদ্যশস্য যাতে সঠিক মানে এবং সঠিক উপভোক্তার কাছে পৌঁছয়, তা নিশ্চিত করাই তাঁদের লক্ষ্য। সেই কারণে মাঠে নেমে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার পাশাপাশি গ্রাহকদেরও সচেতন করা হচ্ছে।
এ দিনের পরিদর্শনে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গেও সরাসরি কথা বলেন মন্ত্রী। তাঁদের কাছে জানতে চান, রেশন নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে কি না এবং দোকান থেকে দেওয়া খাদ্যশস্যের মান কেমন। গ্রাহকদের অভিজ্ঞতা শুনে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলি নোট করেন সংশ্লিষ্ট আধিকারিকরা।
স্থানীয় বাসিন্দা কান্ত মুর্মু জানান, খাদ্যমন্ত্রী তাঁদের সঙ্গে কথা বলে রেশন পরিষেবা নিয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন। বিশেষ করে চাল ও গমের মান কেমন, নিয়মিত রেশন পাওয়া যাচ্ছে কি না—এই বিষয়গুলি জানতে চেয়েছেন তিনি। সম্প্রতি আটার পরিবর্তে গম দেওয়া হচ্ছে বলেও মন্ত্রীকে জানান স্থানীয়রা। তাঁদের বক্তব্য, এই ব্যবস্থায় তাঁরা সন্তুষ্ট।
খাদ্যমন্ত্রীর এই আচমকা পরিদর্শনকে ঘিরে স্থানীয় রেশন গ্রাহকদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কারণ, মন্ত্রী সরাসরি দোকানে গিয়ে খাদ্যশস্য পরীক্ষা করায় রেশন ডিলারদের উপর নজরদারি যে আরও বাড়ছে, সেই বার্তাই স্পষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রাহকদেরও জানানো হয়েছে, রেশন দোকান থেকে যা দেওয়া হচ্ছে তা যাচাই করে নেওয়া এবং নিম্নমানের হলে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করা তাঁদের অধিকার।
রাজ্যের রেশন ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও নিয়মমাফিক করার লক্ষ্যেই এ ধরনের আচমকা পরিদর্শন এবং নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে বলে খাদ্য দপ্তর সূত্রে খবর। আগামী দিনে অন্য এলাকাতেও এমন পরিদর্শন হতে পারে। ফলে রেশন ডিলারদের পাশাপাশি গ্রাহকদেরও সতর্ক থাকার বার্তা দিয়ে গেলেন খাদ্যমন্ত্রী।
সব মিলিয়ে বাঁকুড়ার হরেকৃষ্ণপুরে শনিবারের সারপ্রাইজ় ভিজ়িটে অশোক কীর্তনিয়ার বার্তা ছিল দ্বিমুখী—ডিলারদের জন্য কড়া সতর্কবার্তা, আর গ্রাহকদের জন্য প্রতিবাদী হওয়ার আহ্বান। রেশন দোকানে খারাপ খাদ্যশস্য দেওয়া হলে নীরবে তা মেনে না নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে আপত্তি জানানোর পরামর্শই দিয়েছেন তিনি।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments