Homeকলকাতাফুটপাথের সেই মহিলাকেই রাখি পরালেন অগ্নিমিত্রা, ‘রাগের মাথায় বলা অন্যায় হয়েছে

ফুটপাথের সেই মহিলাকেই রাখি পরালেন অগ্নিমিত্রা, ‘রাগের মাথায় বলা অন্যায় হয়েছে

নিউজ ডেস্ক; কয়েক দিন আগেই পার্ক স্ট্রিটের ফুটপাথে দুধ গরম করা নিয়ে এক মহিলার সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েছিলেন রাজ্যের পুরমন্ত্রী
Untitled design

নিউজ ডেস্ক; কয়েক দিন আগেই পার্ক স্ট্রিটের ফুটপাথে দুধ গরম করা নিয়ে এক মহিলার সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েছিলেন রাজ্যের পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। সেই ঘটনার ভিডিয়ো সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয়েছিল তুমুল বিতর্ক। ফুটপাথবাসী মহিলার সঙ্গে মন্ত্রীর চোখ রাঙিয়ে কথা বলার দৃশ্য নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও কম জলঘোলা হয়নি। বঙ্গ বিজেপির নেতৃত্বকে যথেষ্ট অস্বস্তিতে ফেলেছিল সেই ঘটনা। তবে রাখিবন্ধনের দিনে যেন সেই বিতর্কিত পর্বের অন্য ছবি দেখা গেল কলকাতার রাস্তায়। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ফুটপাথবাসীদেরও হাতে রাখি পরাতে দেখা গেল অগ্নিমিত্রাকে। সঙ্গে খুদেদের হাতে তুলে দিলেন লাড্ডু এবং চকলেট।

রাখিবন্ধনের অনুষ্ঠানে গিয়ে নিজের আগের আচরণ নিয়েও মুখ খুলেছেন পুরমন্ত্রী। অগ্নিমিত্রার বক্তব্য, সেদিন পরিস্থিতি দেখে তিনি প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিলেন। বিশেষ করে রাস্তার উপর একটি ছোট শিশুকে পড়ে থাকতে দেখে তাঁর উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। তবে রাগের মাথায় কথা বলার ধরন ঠিক হয়নি বলেও কার্যত স্বীকার করে নিয়েছেন তিনি।

অগ্নিমিত্রা বলেন, ‘আমি আবারও বলছি, প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিলাম সেদিন। একটা ছ’মাসের বাচ্চা রাস্তায় শুয়ে আছে। সেখানে তার মা-ঠাকুমা কেউ নেই। হয়তো এ ভাবে বলা আমার অন্যায় হয়েছে। কিন্তু ফুটপাথে দুধ গরম করাও তো ঠিক নয়।’

এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এক দিকে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন মন্ত্রী, অন্য দিকে আগের ঘটনার ভাষা ও আচরণ নিয়ে কিছুটা নরম সুরও নিয়েছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, বিতর্কের পরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি না হওয়ার বার্তা দিতেই রাখিবন্ধনের মতো সামাজিক অনুষ্ঠানে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ছবি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল পার্ক স্ট্রিট এলাকায় ফুটপাথে থাকা এক পরিবারের জীবনযাপন নিয়ে। অভিযোগ ছিল, ফুটপাথেই ‘সংসার পেতে বসেছিলেন’ ওই মহিলা। সেখানে দুধ গরম করা নিয়েও আপত্তি জানান অগ্নিমিত্রা। সেই সময় তাঁর সঙ্গে মহিলার কথোপকথনের ভিডিয়ো প্রকাশ্যে আসে। ভিডিয়োটি ছড়িয়ে পড়ার পরে বিরোধীদের পাশাপাশি সমাজমাধ্যমের একাংশ থেকেও সমালোচনা শুরু হয়।

এর পরেই ওই মহিলা রাজ্য বিজেপি দপ্তরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ‘জনতার দরবারে’ হাজির হন। সেখানে নিজের পরিস্থিতির কথা জানান তিনি। তাঁকে আশ্বস্ত করে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। কলকাতা পুরসভার সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়।

এর পর শনিবার সমাজমাধ্যমে নিজেই ওই পরিবারের বিষয়ে একটি আপডেট দেন অগ্নিমিত্রা। তাঁর দাবি, পার্ক স্ট্রিটের ফুটপাথে থাকা সীতাদেবী এবং তাঁর পরিবারের জন্য তাঁদের পছন্দ অনুযায়ী থাকার জায়গার ব্যবস্থা করা হয়েছে। শুধু একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই নয়, পরিবারের স্বনির্ভরতার জন্য সীতাদেবীর একটি ছোট কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

অগ্নিমিত্রার বক্তব্য অনুযায়ী, এর ফলে পরিবারটিকে আর ফুটপাথে দিন কাটাতে হবে না। নতুন করে নিজেদের জীবন গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবেন তাঁরা। তাঁর বক্তব্য, মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা করাই সরকারের দায়িত্ব।

এই প্রসঙ্গে অগ্নিমিত্রা জানিয়েছেন, ‘সীতাদেবী এবং তাঁর পরিবারের জন্য তাঁদের পছন্দমতো জায়গায় বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই নয়, সীতাদেবীর জন্য একটি ছোট কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। যাতে তাঁকে আর ফুটপাথে জীবন কাটাতে না হয় এবং পরিবারটি স্বনির্ভরভাবে নতুন করে পথ চলতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, মানুষের প্রয়োজন বোঝা এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা করাই সরকারের অঙ্গীকার। অর্থাৎ আগের বিতর্ককে কেন্দ্র করে যে প্রশ্ন উঠেছিল— ফুটপাথবাসীদের শুধু উচ্ছেদ করলেই কি সমস্যার সমাধান হয়, নাকি তাঁদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও করতে হয়— সেই প্রশ্নের একটি প্রশাসনিক উত্তর দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ।

বঙ্গ বিজেপির এক নেতাও স্বীকার করেছেন, পার্ক স্ট্রিটের ঘটনাটি দলীয় নেতৃত্বের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়েছিল। তাঁর কথায়, অগ্নিমিত্রার বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে হয়তো আপত্তি ছিল না, কিন্তু বলার ধরন নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্ট মহিলার বাসস্থান এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হওয়ায় সেই বিতর্ককে আপাতত অতীত বলে দেখাতে চাইছে বিজেপি।

ওই বিজেপি নেতার কথায়, ‘অগ্নিমিত্রার ধমকের চোটে আমাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছিল। উনি ভুল কিছু হয়তো বলেননি। কিন্তু বলার ধরন ঠিক ছিল না। তবে ফুটপাথে থাকা ওই মহিলার জন্য বাসস্থান এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে ওটা এখন ক্লোজ়ড চ্যাপ্টার।’

তবে বিষয়টি নিয়ে কটাক্ষ করতে ছাড়েনি তৃণমূল। কালীঘাট তৃণমূলের এক নেতার দাবি, পার্ক স্ট্রিটের ওই একটি পরিবারকে পুনর্বাসন দিলেই কলকাতার ফুটপাথবাসীদের সমস্যার সমাধান হবে না। শহরের বিভিন্ন এলাকায় বহু মানুষ নানা কারণে ফুটপাথে বসবাস করতে বাধ্য হন। তাঁদের জন্যও স্থায়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলে দাবি তাঁর।

তাঁর কথায়, ‘শুধু পার্ক স্ট্রিটের ওই মহিলা কেন, কলকাতার রাস্তায় আরও বহু মানুষ নিরুপায় হয়ে ফুটপাথে থাকেন। তাঁদের থাকার ব্যবস্থাও রাজ্য সরকার করুক।’

অন্য দিকে, রাখিবন্ধন উপলক্ষে শুধু অগ্নিমিত্রার উদ্যোগেই নয়, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বিজেপির মহিলা মোর্চার তরফেও নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়। সাধারণ মানুষের সঙ্গে জনসংযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতির বার্তা দেওয়াই ছিল এই কর্মসূচিগুলির অন্যতম উদ্দেশ্য।

কলকাতার রাসবিহারী এলাকাতেও মহিলা মোর্চার উদ্যোগে রাখিবন্ধন উৎসবের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে উপস্থিত ছিলেন এলাকার বিধায়ক তথা রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। পথচলতি মানুষ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে রাখির বন্ধনে যুক্ত হন বিজেপির মহিলা কর্মী-সমর্থকেরা।

তবে অগ্নিমিত্রার ক্ষেত্রে এ দিনের কর্মসূচির রাজনৈতিক তাৎপর্য কিছুটা আলাদা। কারণ, কয়েক দিন আগেই যে ফুটপাথবাসী মহিলাকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সেই একই ধরনের প্রান্তিক মানুষের হাতেই রাখি পরানোর ছবি সামনে এসেছে। ফলে এটিকে নিছক উৎসবের কর্মসূচি হিসেবে দেখার পাশাপাশি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখছেন অনেকে।

এক দিকে বিতর্কিত ঘটনার পরে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন অগ্নিমিত্রা, অন্য দিকে সংশ্লিষ্ট পরিবারের পুনর্বাসন এবং কর্মসংস্থানের বিষয়টিও সামনে এনেছেন। ফলে পার্ক স্ট্রিটের সেই বিতর্ক নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনায় এলেও, এবার তার কেন্দ্রে রয়েছে পুনর্বাসনের প্রশ্ন।

সব মিলিয়ে রাখিবন্ধনের দিনে অগ্নিমিত্রা পালের ‘রাখি কূটনীতি’ যে শুধু উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকল না, তা বলাই যায়। বিতর্কের পর সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি, ফুটপাথবাসী পরিবারের পুনর্বাসনের দাবি এবং সরকারের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন— সবকিছু মিলিয়ে ঘটনাটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। এখন দেখার, পার্ক স্ট্রিটের এই উদ্যোগের পর কলকাতার অন্য ফুটপাথবাসীদের জন্যও একই ধরনের পুনর্বাসন পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা এগোয়।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved