
নিউজ ডেস্ক;স্বাভাবিক অবস্থায় একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্লীহার ওজন সাধারণত ১৫০ থেকে ২০০ গ্রামের মধ্যে। কিন্তু ঝাড়খণ্ডের বছর তিরিশের এক রোগীর ক্ষেত্রে সেই প্লীহাই বেড়ে হয়েছিল প্রায় ৩ কেজি। অর্থাৎ স্বাভাবিক ওজনের তুলনায় প্রায় ১৫ থেকে ২০ গুণ বেশি। তার উপর পেটের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালিতে ছিল সম্পূর্ণ বা গুরুতর ব্লকেজ। অস্ত্রোপচারের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের আশঙ্কাও ছিল প্রবল। এমন জটিল পরিস্থিতির মধ্যেই প্রায় ছ’ঘণ্টার অস্ত্রোপচার করে বিশালাকার প্লীহাটি বাদ দিয়ে রোগীকে সুস্থ করে তুললেন কলকাতার টেকনো ইন্ডিয়া ডামা হেলথকেয়ারের চিকিৎসকেরা। অস্ত্রোপচারের পাঁচ দিন পর হাসপাতাল থেকে বাড়িও ফিরে গিয়েছেন ওই রোগী। আপাতত তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, এই রোগীর মূল সমস্যা তৈরি হয়েছিল লিভারে রক্ত পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম প্রধান রক্তনালি পোর্টাল ভেনে। সেখানে রক্ত জমাট বেঁধে থ্রম্বাস তৈরি হওয়ায় রক্তপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি হয়। এই অবস্থাকে পোর্টাল ভেন থ্রম্বোসিস বলা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে ওই রক্তনালির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় শরীর বিকল্প পথে রক্ত চলাচলের ব্যবস্থা তৈরি করতে শুরু করে। এর ফলে রোগীর পেটের ভিতরে একাধিক বড় কোল্যাটেরাল রক্তনালি তৈরি হয়েছিল।
সমস্যা আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন দেখা যায়, শুধু পোর্টাল ভেনেই নয়, পেটের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শিরাতেও ব্লকেজ রয়েছে। ফলে অস্ত্রোপচারের সময় রক্তপাত নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠতে পারত। চিকিৎসকদের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, এক দিকে অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে যাওয়া প্লীহা বাদ দেওয়া, অন্য দিকে পেটের ভিতরে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত রক্তনালি এবং ব্লকেজের কারণে সম্ভাব্য বিপুল রক্তক্ষরণ সামলানো।
রোগীর শারীরিক সমস্যার সূত্রপাতও ছিল গুরুতর। পোর্টাল ভেনের স্বাভাবিক রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে পেটের ভিতরে চাপ তৈরি হতে থাকে। এর জেরে এক পর্যায়ে রক্তবমির মতো গুরুতর উপসর্গও দেখা দেয় বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে চলা রক্তপ্রবাহের সমস্যার প্রভাব পড়ে প্লীহার উপরেও।
প্লীহার স্বাভাবিক কাজের মধ্যে রক্তের বিভিন্ন উপাদান ছাঁকাই অন্যতম। কিন্তু এই রোগীর ক্ষেত্রে প্লীহা অস্বাভাবিক ভাবে বড় হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সেখানে রক্তের বিভিন্ন উপাদান অতিরিক্ত মাত্রায় আটকে যেতে এবং নষ্ট হতে থাকে। এর ফলে রক্তে লোহিত রক্তকণিকা, শ্বেত রক্তকণিকা এবং অণুচক্রিকার মাত্রা কমে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই পরিস্থিতি রোগীর জন্য একাধিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
লোহিত রক্তকণিকা কমে গেলে দেখা দিতে পারে তীব্র রক্তাল্পতা। শ্বেত রক্তকণিকার মাত্রা কমে গেলে সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। আবার অণুচক্রিকা কমে গেলে রক্ত জমাট বাঁধার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অর্থাৎ একই সঙ্গে রক্তাল্পতা, সংক্রমণের ঝুঁকি এবং অস্ত্রোপচারের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের আশঙ্কা— তিনটি সমস্যাই ছিল ওই রোগীর ক্ষেত্রে।
এই জটিলতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসার সন্ধানে ঘুরেছেন ঝাড়খণ্ডের ওই রোগী। জানা গিয়েছে, প্রথমে নিজের রাজ্য থেকে দিল্লির একাধিক হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলেন তিনি। বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসকদের পরামর্শ নেওয়ার পর শেষ পর্যন্ত কলকাতায় আসেন। শহরের টেকনো ইন্ডিয়া ডামা হাসপাতালে গ্যাস্ট্রো সার্জেন সঞ্জয় মণ্ডলের পরামর্শ নেন তিনি।
এর পর শুরু হয় বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা। বিভিন্ন স্ক্যান এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরীক্ষার মাধ্যমে রোগীর পোর্টাল ভেনের সমস্যা, পেটের ভিতরের রক্তনালিগুলির অবস্থা এবং অস্বাভাবিক ভাবে বড় হয়ে যাওয়া প্লীহার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হয়। রিপোর্টগুলি বিশ্লেষণ করে চিকিৎসকেরা বুঝতে পারেন, অস্ত্রোপচার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তবে সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য অস্ত্রোপচারই প্রয়োজন বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অপারেশনের আগে চিকিৎসকদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল সম্ভাব্য রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা করা। কারণ দীর্ঘদিনের পোর্টাল ভেনের বাধার কারণে রোগীর শরীরে যে কোল্যাটেরাল রক্তনালিগুলি তৈরি হয়েছিল, সেগুলি অস্ত্রোপচারের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হলে দ্রুত বিপুল রক্তপাত হতে পারে। সেই ঝুঁকি মাথায় রেখেই অস্ত্রোপচারের পরিকল্পনা করা হয়।
অবশেষে শুরু হয় জটিল অস্ত্রোপচার। প্রায় ছ’ঘণ্টা ধরে চলে চিকিৎসকদের লড়াই। অস্ত্রোপচারে প্রায় ৩ কেজি ওজনের বিশাল প্লীহাটি বাদ দেওয়া হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় যে অঙ্গটির ওজন ১৫০ থেকে ২০০ গ্রামের মধ্যে থাকার কথা, সেটিই এতটা বড় হয়ে যাওয়ায় অস্ত্রোপচারও ছিল যথেষ্ট কঠিন।
চিকিৎসকদের সামনে শুধু প্লীহা বাদ দেওয়ার চ্যালেঞ্জই ছিল না। পেটের ভিতরের অস্বাভাবিক রক্তনালির জাল এবং একাধিক রক্তনালির ব্লকেজের কারণে প্রতিটি ধাপে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা অস্ত্রোপচারের পরে শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকেরা সফল ভাবে অপারেশন সম্পন্ন করেন।
অস্ত্রোপচারের পর রোগীকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। চিকিৎসকদের নজর ছিল রক্তপাত, রক্তের বিভিন্ন উপাদানের মাত্রা এবং সামগ্রিক শারীরিক অবস্থার উপর। ধীরে ধীরে তাঁর শারীরিক পরিস্থিতির উন্নতি হতে থাকে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, অস্ত্রোপচারের পাঁচ দিন পরই তাঁকে বাড়ি যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।
চিকিৎসকদের মতে, এই ধরনের ক্ষেত্রে মূল রোগের পাশাপাশি তার থেকে তৈরি হওয়া জটিলতাগুলিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পোর্টাল ভেনের রক্তপ্রবাহে দীর্ঘস্থায়ী বাধা থাকলে শরীর বিকল্প রক্তনালির পথ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে প্লীহার আকার অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে গিয়ে রক্তের বিভিন্ন উপাদানের মাত্রা কমে যাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
এই রোগীর ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও গুরুতর হয়েছিল কারণ পেটের একাধিক রক্তনালিতে ব্লকেজ ছিল এবং পোর্টাল ভেনের রক্তপ্রবাহও বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিল। ফলে চিকিৎসার প্রতিটি ধাপেই ঝুঁকি ছিল। শেষ পর্যন্ত পরিকল্পিত অস্ত্রোপচার এবং চিকিৎসকদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় সেই জটিলতা সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
কলকাতায় চিকিৎসা করাতে এসে নতুন জীবন ফিরে পাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ঝাড়খণ্ডের ওই তরুণ রোগীর ক্ষেত্রে। কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরে অবশেষে কলকাতায় এসে চিকিৎসা, দীর্ঘ অস্ত্রোপচার এবং তার পর দ্রুত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা— গোটা ঘটনাই চিকিৎসার জটিলতা এবং আধুনিক অস্ত্রোপচার ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
তবে চিকিৎসকেরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, পেটে অস্বাভাবিক ব্যথা, রক্তবমি, দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা বা রক্তাল্পতার মতো উপসর্গকে হালকা ভাবে নেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে রক্তবমির মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ পেটের ভিতরের রক্তনালি সংক্রান্ত জটিলতা দীর্ঘদিন অচিহ্নিত থাকলে পরবর্তী সময়ে একাধিক গুরুতর সমস্যা তৈরি হতে পারে।
এই রোগীর ক্ষেত্রে সময়ের সঙ্গে সমস্যাটি এতটাই জটিল হয়ে উঠেছিল যে প্লীহার স্বাভাবিক ১৫০–২০০ গ্রামের পরিবর্তে তার ওজন দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৩ কেজি। পোর্টাল ভেনের ব্লকেজ, পেটের ভিতরের একাধিক রক্তনালির সমস্যা এবং সম্ভাব্য অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ঝুঁকি— সবকিছুকে সামলে ছ’ঘণ্টার অস্ত্রোপচারে শেষ পর্যন্ত মিলেছে সাফল্য। আপাতত ভালো আছেন রোগী। চিকিৎসার পর স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথেই এগোচ্ছেন তিনি।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments