
নিউজ ডেস্ক; কলকাতা ও হাওড়ার পর এ বার শিলিগুড়ি পুরসভাতেও বাড়তে চলেছে ওয়ার্ডের সংখ্যা। ৪৭ ওয়ার্ডের শিলিগুড়ি পুরসভায় আরও ১৬টি ওয়ার্ড যুক্ত হওয়ার পথে। নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, পুরসভার মোট ওয়ার্ডের সংখ্যা বেড়ে ৬৩ হওয়ার কথা। আর এই ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব প্রকাশ্যে আসতেই উত্তরবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর শিলিগুড়িতে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর।
বিরোধীদের অভিযোগ, জনসংখ্যার ভারসাম্য কিংবা নাগরিক পরিষেবা দেওয়ার প্রয়োজনকে সামনে রেখে ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের কথা বলা হলেও এর পিছনে রাজনৈতিক সমীকরণ কাজ করছে। বিশেষ করে ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি বিধানসভা এলাকার যে অংশ শিলিগুড়ি পুরসভার আওতায় রয়েছে, সেখানে তুলনামূলক বেশি সংখ্যক ওয়ার্ড তৈরি করার সিদ্ধান্তের মধ্যেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে বলে দাবি বিরোধীদের।
তাঁদের যুক্তি, শিলিগুড়ি বিধানসভা এলাকার তুলনায় ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি বিধানসভা এলাকায় বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি তুলনামূলক বেশি। ফলে ওই অংশে ওয়ার্ডের সংখ্যা বাড়িয়ে আসন পুনর্বিন্যাস করলে ভবিষ্যতের পুরভোটে বিজেপি সুবিধা পেতে পারে। যদিও বিজেপি এই অভিযোগ সরাসরি খারিজ করেছে। পদ্ম শিবিরের দাবি, জনসংখ্যা এবং নাগরিক পরিষেবার প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখেই বড় ওয়ার্ডগুলিকে ছোট করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, শিলিগুড়ি পুরসভার অন্তর্গত দার্জিলিং জেলার অংশে পাঁচটি পুরনো ওয়ার্ড ভেঙে ১১টি নতুন ওয়ার্ড তৈরি করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ১, ৪, ৫, ২৪ এবং ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডকে পুনর্বিন্যাস করে এই নতুন ওয়ার্ডগুলি তৈরি হবে। অর্থাৎ পাঁচটি ওয়ার্ডের জায়গায় তৈরি হবে মোট ১১টি ওয়ার্ড।
অন্য দিকে, জলপাইগুড়ি জেলার অন্তর্গত পুরসভার অংশেও বড়সড় পরিবর্তন আনার প্রস্তাব রয়েছে। ৩১, ৩৩, ৩৪, ৩৭, ৪০, ৪১, ৪২, ৪৩ এবং ৪৪ নম্বর—এই ন’টি ওয়ার্ডকে ভেঙে মোট ১৯টি ওয়ার্ড তৈরি করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ এই অংশে ন’টি পুরনো ওয়ার্ডের পরিবর্তে তৈরি হবে আরও ছোট আয়তনের ১৯টি ওয়ার্ড।
তবে সব ওয়ার্ডকে একই ভাবে ভাগ করা হচ্ছে না। পুরসভার ৪০ এবং ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডকে তিন ভাগে ভাগ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে এই দু’টি ওয়ার্ড থেকেই ছ’টি নতুন ওয়ার্ড তৈরি হবে। বাকি যে ওয়ার্ডগুলি পুনর্বিন্যাসের তালিকায় রয়েছে, সেগুলির ক্ষেত্রে একটি ওয়ার্ডকে দু’টি করে ভাগ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
ওয়ার্ডের সংখ্যা বৃদ্ধির এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সবচেয়ে সরব বাম নেতৃত্ব। শিলিগুড়ি পুরসভার প্রাক্তন মেয়র তথা রাজ্যের প্রাক্তন পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অশোক ভট্টাচার্য পুরো প্রক্রিয়াটিকেই অগণতান্ত্রিক বলে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, বর্তমানে শিলিগুড়ি পুরসভায় নির্বাচিত বোর্ড নেই। সেই পরিস্থিতিতে একজন প্রশাসনিক আধিকারিকের মাধ্যমে এত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক।
অশোকের দাবি, ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন ছিল। সর্বদলীয় বৈঠক ডাকার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের আপত্তি, পরামর্শ ও মতামত গ্রহণের সুযোগও থাকা উচিত ছিল। তাঁর অভিযোগ, কলকাতা ও হাওড়া পুরসভার ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তাঁর মতে, প্রয়োজনীয় নিয়ম মেনে প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হলে ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
সিপিএমের প্রাক্তন কাউন্সিলর দীপ্ত কর্মকারও এই সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। তাঁর অভিযোগ, সাধারণ মানুষের সুবিধার বদলে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক স্বার্থের কথা মাথায় রেখেই ওয়ার্ড বিভাজন করা হয়েছে।
একই সুর শোনা গিয়েছে শিলিগুড়ির প্রাক্তন মেয়র গৌতম দেবের বক্তব্যেও। তাঁর মতে, ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। সেখানে নির্দিষ্ট নিয়ম থাকা প্রয়োজন। সাধারণ মানুষের বক্তব্য শোনার জন্য গণশুনানি বা পাবলিক হিয়ারিংয়ের ব্যবস্থা করা উচিত ছিল। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট নাগরিকদের দাবি ও আপত্তি জানানোর সুযোগ দেওয়াও জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
গৌতমের অভিযোগ, সর্বদলীয় বৈঠক না করেই এবং সাধারণ মানুষের মতামত গ্রহণ না করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, এই পরিস্থিতিতে পুরো প্রক্রিয়ার পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তৃণমূলের দার্জিলিং জেলা সভাপতি কুন্তল রায়ও প্রক্রিয়াটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, জনসংখ্যার ভিত্তিতে ওয়ার্ড ভাগ করা হয়ে থাকলে কিছু নির্দিষ্ট বড় ওয়ার্ডকেও পুনর্বিন্যাসের আওতায় আনা উচিত ছিল। তাঁর প্রশ্ন, ২২, ৩২, ৩৬ এবং ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের মতো ওয়ার্ডগুলিকে কেন একই ভাবে ভাঙা হল না?
প্রয়োজনে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার কথাও জানিয়েছেন কুন্তল। তাঁর বক্তব্য, ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম ও পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
যদিও রাজনৈতিক দলগুলির এই অভিযোগ মানতে নারাজ শিলিগুড়ি পুরসভার প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ। পুরসভার এক আধিকারিক জানিয়েছেন, পুরো প্রক্রিয়াটি আইন মেনেই করা হয়েছে। তাঁর দাবি, West Bengal Municipal Corporation Act, 2006-এর ৭ নম্বর ধারা অনুসরণ করেই ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে এখানে নিয়ম ভাঙার কোনও প্রশ্ন নেই বলেই তাঁর বক্তব্য।
বিজেপির পক্ষ থেকেও রাজনৈতিক স্বার্থের অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। শিলিগুড়ি পুরসভার প্রাক্তন বিরোধী দলনেতা অমিত জৈনের দাবি, এই পুনর্বিন্যাসের সঙ্গে ভোটের অঙ্কের কোনও সম্পর্ক নেই। তাঁর মতে, পুরসভার মধ্যে থাকা দুই বিধানসভা এলাকার বেশ কিছু ওয়ার্ড আয়তন ও জনসংখ্যার দিক থেকে বড়। ফলে নাগরিক পরিষেবা আরও কার্যকর ভাবে পৌঁছে দিতে সেগুলিকে ছোট করা হচ্ছে।
অমিতের বক্তব্য, কোনও বড় ওয়ার্ডকে দু’টি ভাগ করা হচ্ছে, আবার কোথাও জনসংখ্যা ও এলাকার প্রয়োজন অনুযায়ী তিনটি ওয়ার্ড তৈরি করা হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য নাগরিক পরিষেবাকে আরও সুষম করা।
ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ির বিজেপি বিধায়ক শিখা চট্টোপাধ্যায়ও বিরোধীদের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর দাবি, সিপিএম ও কংগ্রেসের মতো দলগুলিকে মানুষ ইতিমধ্যেই প্রত্যাখ্যান করেছে এবং তৃণমূলও রাজ্যের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্ব হারিয়েছে। তাই ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস নিয়ে ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে রাজনৈতিক ভাবে প্রাসঙ্গিক থাকার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তাঁর কটাক্ষ।
তবে রাজনৈতিক বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্যের মধ্যেই মূল প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, ৪৭ থেকে ৬৩ ওয়ার্ড করার এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের মতামত কতটা প্রতিফলিত হবে। বড় ওয়ার্ড ভেঙে ছোট ওয়ার্ড তৈরি হলে নাগরিক পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বাস্তবে কতটা সুবিধা হবে, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
শিলিগুড়ি পুরসভা উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মানচিত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, অন্য দিকে দ্রুত বেড়ে ওঠা শহরতলি—দুই ধরনের এলাকার নাগরিক চাহিদা এক নয়। ফলে ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের সিদ্ধান্ত বাস্তবে পরিষেবা ব্যবস্থায় কী প্রভাব ফেলে, তা গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
অন্য দিকে, নির্বাচিত পুরবোর্ড না থাকা অবস্থায় এই ধরনের বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, সেটিও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। বিরোধীরা ইতিমধ্যেই আইনি পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছে। ফলে আগামী দিনে ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের খসড়া নিয়ে আপত্তি, রাজনৈতিক আলোচনা এবং সম্ভাব্য আইনি লড়াই—সব মিলিয়ে শিলিগুড়ি পুরসভা ফের রাজ্য রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসতে পারে।
এখন নজর থাকবে প্রশাসনিক ভাবে পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। ৬৩টি ওয়ার্ডের নতুন কাঠামো শেষ পর্যন্ত কী ভাবে কার্যকর হয়, কোনও আপত্তি বা দাবি-আপত্তির সুযোগ দেওয়া হয় কি না এবং এই সিদ্ধান্ত আদালতের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে কি না—সেই প্রশ্নগুলির উত্তরই আগামী দিনে স্পষ্ট হবে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments