Homeকলকাতাআফতাবের সেল থেকে মোবাইল-রাউটার উদ্ধারের পর প্রেসিডেন্সি জেলে ‘সারপ্রাইজ় ভিজ়িট’ মুখ্যমন্ত্রীর

আফতাবের সেল থেকে মোবাইল-রাউটার উদ্ধারের পর প্রেসিডেন্সি জেলে ‘সারপ্রাইজ় ভিজ়িট’ মুখ্যমন্ত্রীর

নিউজ ডেস্ক; প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারে বন্দি আফতাব আনসারির সেল থেকে সম্প্রতি একাধিক মোবাইল ফোন, সিমকার্ড, রাউটার-সহ বেশ কিছু বৈদ্যুতিন সামগ্রী উদ্ধারের
resizeplus_Screenshot 2026-09-02 182402_edited

নিউজ ডেস্ক; প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারে বন্দি আফতাব আনসারির সেল থেকে সম্প্রতি একাধিক মোবাইল ফোন, সিমকার্ড, রাউটার-সহ বেশ কিছু বৈদ্যুতিন সামগ্রী উদ্ধারের ঘটনা ঘিরে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছিল। সেই ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যেই মঙ্গলবার আচমকা প্রেসিডেন্সি জেলে হাজির হলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বৃষ্টির মধ্যেই তাঁর এই আকস্মিক পরিদর্শনকে ঘিরে প্রশাসনিক মহলে তৎপরতা শুরু হয়। জেলে গিয়ে শুধু কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলাই নয়, বন্দিদের সঙ্গেও সরাসরি কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। জেলের ভিতরে মোবাইল ফোনের ব্যবহার থেকে শুরু করে খাবার, ব্যায়াম এবং অন্যান্য পরিষেবা সম্পর্কে তাঁদের কাছ থেকেই তথ্য নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।

মঙ্গলবার দুপুরে কোনও পূর্বঘোষণা ছাড়াই প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারে পৌঁছে যান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর এই আকস্মিক সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল জেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সংশোধনাগারের ভিতরে লাগানো সিসিটিভি ক্যামেরাগুলির ফুটেজ কী ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, কোথা থেকে তা মনিটর করা হয় এবং নজরদারি ব্যবস্থার কার্যকারিতা কতটা—এসব বিষয় খতিয়ে দেখেন তিনি। একই সঙ্গে কারা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সংশোধনাগারের সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন।

মুখ্যমন্ত্রীর এই সফরের ঠিক আগেই প্রেসিডেন্সি জেলে তল্লাশি চালিয়ে আফতাব আনসারির সেল থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদ্যুতিন সামগ্রী উদ্ধারের কথা সামনে আসে। কারা দপ্তরের তল্লাশিতে একটি আইফোন, তিনটি স্মার্টফোন এবং তিনটি সিমকার্ড উদ্ধার করা হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। এর পাশাপাশি দু’টি রাউটার, দু’টি কার্ড রিডার এবং ১২৮ জিবি ক্ষমতার একটি পেনড্রাইভও পাওয়া যায় বলে সূত্রের খবর।

শুধু মোবাইল বা যোগাযোগের সরঞ্জামই নয়, তল্লাশিতে আরও কিছু সামগ্রী উদ্ধার হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। একটি হেডফোন, তিনটি ওটিজি এবং নগদ ৩১ হাজার টাকা পাওয়া গিয়েছিল বলে কারা সূত্রে দাবি করা হয়েছে। এতগুলি সামগ্রী কী ভাবে সংশোধনাগারের নিরাপত্তা এড়িয়ে সংশ্লিষ্ট সেলে পৌঁছল, তা নিয়েই স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে। কারা দপ্তরের তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযানের পর জেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

আফতাব আনসারি বর্তমানে প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারে বন্দি। কলকাতার আমেরিকান সেন্টারের সামনে জঙ্গি হামলা এবং খাদিমকর্তা অপহরণ মামলার মতো গুরুতর অপরাধে তাঁর নাম রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর তিনি জেলবন্দি। ফলে তাঁর সেল থেকে একাধিক যোগাযোগ-সংক্রান্ত বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম উদ্ধারের বিষয়টি প্রশাসনের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রীর আকস্মিক জেল পরিদর্শন তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে প্রশাসনিক মহল। জেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কড়া, নিয়মিত নজরদারি ঠিক ভাবে হচ্ছে কি না এবং বন্দিদের মধ্যে বেআইনি ভাবে মোবাইল ব্যবহারের কোনও প্রবণতা রয়েছে কি না—সেসব বিষয় সম্পর্কে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ করেন তিনি।

বন্দিদের সঙ্গে কথা বলার সময় তাঁদের পরিচয় জানতে চান মুখ্যমন্ত্রী। একই সঙ্গে জেলে কী ধরনের খাবার দেওয়া হয়, খাবারের পরিমাণ ও মান কেমন, অন্যান্য পরিষেবা ঠিকঠাক মিলছে কি না—এসব বিষয়ও জানতে চান। এক বন্দির সঙ্গে কথোপকথনের সময় তিনি জানতে চান, সেদিন তাঁদের খাবারে কী ছিল। ওই বন্দি জানান, রুটি ও তরকারি দেওয়া হয়েছে।

এর পরেই জেলে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন করেন মুখ্যমন্ত্রী। হিন্দিতে তিনি বন্দিদের কাছে জানতে চান, সংশোধনাগারের ভিতরে মোবাইল ফোন ব্যবহার করা হয় কি না। জবাবে এক বন্দি জানান, এ ভাবে মোবাইল ব্যবহার করা হয় না। বন্দির উত্তরের পর মুখ্যমন্ত্রী মন্তব্য করেন, ‘খুব চালাক।’ কথোপকথনের এই অংশটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ তার কিছু দিন আগেই আফতাবের সেল থেকে একাধিক মোবাইল ও যোগাযোগের সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনা সামনে এসেছিল।

জেলের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে সিসিটিভি নজরদারির পাশাপাশি বন্দিদের দৈনন্দিন জীবনযাপন নিয়েও খোঁজ নেন মুখ্যমন্ত্রী। সংশোধনাগারে নিয়মিত ব্যায়ামের ব্যবস্থা রয়েছে কি না, বন্দিরা শরীরচর্চার সুযোগ পান কি না—সেই বিষয়েও জানতে চান তিনি। বন্দিদের তরফে ইতিবাচক উত্তর পাওয়া যায় বলে জানা গিয়েছে।

এর পর সংশোধনাগারের রান্নাঘর বা হেঁশেলেও যান মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে তখন বড় বড় ডেকচিতে রান্নার কাজ চলছিল। রান্নাঘরে গিয়ে তিনি মেনু সম্পর্কেও জানতে চান। রান্নার দায়িত্বে থাকা কর্মী জানান, বিকেল বা সন্ধ্যার খাবারে আলু ও চালকুমড়োর তরকারি, ছোলা সেদ্ধ এবং মুগ ডাল রয়েছে।

বন্দিদের কাছ থেকেও খাবার নিয়ে সরাসরি মতামত জানতে চান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁদের দেওয়া খাবারের মান এবং পরিমাণ যথেষ্ট কি না, সে প্রশ্নের উত্তরে বন্দিরা ভালো এবং পর্যাপ্ত খাবার পাওয়ার কথা জানিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। তবে খাবার পরিবেশনের সময় নিয়েও একটি বিষয় নজরে আসে। মুখ্যমন্ত্রী বিকেলের খাবার চারটে থেকে সাড়ে চারটের মধ্যে দেওয়ার পরামর্শ দেন।

তবে এর সঙ্গে বাস্তব সমস্যার কথাও উঠে আসে। সংশোধনাগার কর্তৃপক্ষের তরফে জানানো হয়, অনেক বন্দিকে বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে আদালতে হাজিরা দিতে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁদের একটা অংশ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জেলে ফিরে আসেন না। ফলে বিকেলের খাবার নির্দিষ্ট সময়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে আদালতে হাজিরা দেওয়া বন্দিদের বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হয়।

মুখ্যমন্ত্রীর আচমকা পরিদর্শনের ফলে এক দিকে যেমন বন্দিদের দৈনন্দিন পরিষেবা নিয়ে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, অন্য দিকে জেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। বিশেষ করে সেল থেকে মোবাইল, সিমকার্ড, রাউটার ও অন্যান্য বৈদ্যুতিন সামগ্রী উদ্ধারের পর এই নজরদারি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কারাগারের ভিতরে মোবাইল ফোনের অবৈধ ব্যবহার দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ। মোবাইলের মাধ্যমে বাইরে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হলে জেলের ভিতর থেকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, বন্দিদের সঙ্গে বাইরের যোগাযোগ বজায় রাখা বা নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্য আদানপ্রদানের মতো ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সেই কারণে সংশোধনাগারে মোবাইল নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত তল্লাশি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন নিরাপত্তা আধিকারিকেরা।

আফতাবের সেল থেকে উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর তালিকা সেই প্রশ্নকেই আরও সামনে এনেছে। একটি আইফোন থেকে শুরু করে একাধিক স্মার্টফোন, সিমকার্ড, রাউটার ও পেনড্রাইভ—এতগুলি ইলেকট্রনিক ডিভাইস জেলের ভিতরে কী ভাবে পৌঁছল, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে এই সরঞ্জামগুলি কত দিন ধরে ব্যবহার করা হচ্ছিল এবং এর মাধ্যমে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

মুখ্যমন্ত্রীর মঙ্গলবারের সফরে তাই বন্দিদের সঙ্গে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কথা বলার পাশাপাশি প্রশাসনিক নজরদারির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ থেকে শুরু করে রান্নাঘর, খাবারের মান, ব্যায়ামের সুযোগ—জেলের একাধিক দিক নিজে দেখে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি।

এ দিনের পরিদর্শনের পর প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কড়া করা হয় কি না, নিয়মিত তল্লাশি বাড়ানো হয় কি না এবং সিসিটিভি নজরদারির পদ্ধতিতে কোনও পরিবর্তন আসে কি না, সেদিকেও নজর থাকবে। পাশাপাশি বন্দিদের পরিষেবা ও খাবারের মান নিয়েও প্রশাসনের তরফে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তা দেখার বিষয়।

আফতাবের সেল থেকে উদ্ধার হওয়া মোবাইল ও বৈদ্যুতিন সরঞ্জামের ঘটনা যে সংশোধনাগারের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে, তা স্পষ্ট। তার পরেই মুখ্যমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শন সেই বার্তাই দিচ্ছে যে জেলের ভিতরের নিরাপত্তা এবং নজরদারি নিয়ে প্রশাসন বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে দেখছে।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved