নেপাল যাওয়ার পথে জালে! আফগান যুবকের কাছে একাধিক ভারতীয় নথি | NGTV Newsনিউজ ডেস্ক; নেপাল যাওয়ার আগেই ইন্দো-নেপাল সীমান্তে পুলিশের জালে আফগানিস্তানের এক যুবক। পানিট্যাঙ্কি স্থলবন্দরের অভিবাসন দফতরে ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্সের জন্য পৌঁছতেই ধরা পড়ল যুবক। তাঁর বিরুদ্ধে আগে থেকেই লুক আউট সার্কুলার বা নোটিস ছিল বলে পুলিশ সূত্রে দাবি। শুধু ওই আফগান নাগরিকই নন, তাঁর সঙ্গে থাকা এক ভারতীয় বন্ধুকেও আটক করে গ্রেফতার করা হয়েছে। ধৃতদের কাছ থেকে ভারতীয় আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত নথি এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স উদ্ধার হয়েছে বলে তদন্তকারীদের দাবি।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃত আফগান যুবকের নাম আবদুল্লা খান। দীর্ঘদিন ধরে ভারতে থাকার সুযোগ নিয়ে তিনি টাকা দিয়ে জাল পদ্ধতিতে ভারতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করেছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। তাঁর সঙ্গে ধৃত ভারতীয় যুবকের নাম শঙ্কর বণিক। তিনি বিধাননগরের দত্তাবাদ এলাকার বাসিন্দা বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। আবদুল্লা হাওড়ার শিবপুর এলাকায় থাকতেন বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।
ঘটনার সূত্রপাত পানিট্যাঙ্কি স্থলবন্দরের অভিবাসন দফতরে। তদন্তকারীদের দাবি, গত রবিবার দুপুরে আবদুল্লা এবং শঙ্কর নেপালের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার আগে ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্সের জন্য সেখানে যান। নিয়ম মেনে তাঁদের নথিপত্র যাচাই করার সময় ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিস বা FRRO-র সংশ্লিষ্ট সিস্টেমে আবদুল্লার নাম পরীক্ষা করা হয়। তখনই তাঁর বিরুদ্ধে লুক আউট সার্কুলার রয়েছে বলে জানা যায়।
বিষয়টি সামনে আসতেই অভিবাসন দফতরের আধিকারিকরা দু’জনকে আটক করেন। পরে তাঁদের খড়িবাড়ি থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর শুরু হয় জিজ্ঞাসাবাদ। জেলা পুলিশের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ও রাজ্যস্তরের গোয়েন্দা সংস্থার আধিকারিকরাও জিজ্ঞাসাবাদে অংশ নেন বলে সূত্রের খবর। রাতভর দীর্ঘ জেরায় ধৃতদের কাছ থেকে তাঁদের ভারতে থাকার সময়কাল, পরিচয়পত্র সংগ্রহ এবং বিদেশ যাওয়ার পরিকল্পনা সম্পর্কে তথ্য জানার চেষ্টা করা হয়।
তদন্তকারীদের দাবি, আবদুল্লা এবং শঙ্কর নেপাল হয়ে থাইল্যান্ড যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসাবেই তাঁরা পানিট্যাঙ্কি সীমান্তে পৌঁছেছিলেন বলে প্রাথমিক ভাবে মনে করছেন তদন্তকারীরা। তবে ঠিক কী উদ্দেশ্যে থাইল্যান্ড যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল, সেখানে তাঁদের কী কাজ ছিল এবং এর পিছনে আরও কেউ যুক্ত ছিলেন কি না, তা এখনও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে উদ্ধার হওয়া ভারতীয় নথিগুলিকে। একজন বিদেশি নাগরিকের কাছে আধার কার্ড, ভোটার কার্ড এবং ড্রাইভিং লাইসেন্সের মতো একাধিক ভারতীয় নথি কী ভাবে এল, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা। নথিগুলি কী ভাবে তৈরি হয়েছিল, কোন ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছিল এবং সেগুলি তৈরির ক্ষেত্রে কোনও ব্যক্তি বা চক্র সাহায্য করেছিল কি না—এই সমস্ত বিষয়ই তদন্তের আওতায় রয়েছে।
পুলিশের দাবি, দীর্ঘদিন ভারতে থাকার সুবাদে আবদুল্লা টাকার বিনিময়ে বেআইনি উপায়ে ভারতীয় নথি তৈরি করেছিলেন। তবে এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে নথিগুলির উৎস এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি রেকর্ড পরীক্ষা করা হচ্ছে। তদন্ত সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত নথিগুলি কী ভাবে তৈরি হয়েছিল, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো হয়নি।
এদিকে, আবদুল্লার বিরুদ্ধে FRRO-র তরফে লুক আউট নোটিস থাকার বিষয়টিও তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। সাধারণত কোনও ব্যক্তিকে নজরদারির আওতায় রাখার ক্ষেত্রে এই ধরনের সতর্কতা জারি করা হয়। সেই নোটিস থাকা সত্ত্বেও কী ভাবে তিনি দেশের এক প্রান্ত থেকে পানিট্যাঙ্কি সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছলেন, এত দিন কোথায় ছিলেন এবং তাঁর গতিবিধি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির কাছে কী তথ্য ছিল—এসব প্রশ্নও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ধৃত দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে একাধিক ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর। নথিপত্র জাল করা, প্রতারণা, ইমিগ্রেশন ও ফরেনার্স অ্যাক্ট এবং আধার আইনের বিভিন্ন ধারায় তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তদন্তকারীরা মনে করছেন, জাল নথি তৈরির সঙ্গে আরও কেউ যুক্ত কি না, তা জানতে ধৃতদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।
এই কারণেই ধৃতদের আদালতে পেশ করে পুলিশ রিমান্ডের আবেদন করতে চলেছে বলে জানা গিয়েছে। রিমান্ডে নিয়ে তাঁদের কাছ থেকে নথি তৈরির উৎস, যোগাযোগের নেটওয়ার্ক এবং বিদেশ যাওয়ার পরিকল্পনা সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হবে। একই সঙ্গে তাঁদের মোবাইল ফোন এবং অন্যান্য যোগাযোগের মাধ্যম খতিয়ে দেখেও তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হতে পারে।
পানিট্যাঙ্কি ইন্দো-নেপাল সীমান্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থলপথ। প্রতিদিন এই সীমান্ত দিয়ে বহু মানুষ যাতায়াত করেন। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তে ইমিগ্রেশন যাচাইয়ের সময় লুক আউট নোটিস থাকা এক বিদেশি নাগরিক ধরা পড়ার ঘটনায় নিরাপত্তা সংস্থাগুলির তৎপরতা বেড়েছে। বিশেষ করে ভারতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহারের অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে।
এখন তদন্তকারীদের নজর মূলত তিনটি বিষয়ের দিকে—আবদুল্লার ভারতে থাকার প্রকৃত ইতিহাস, ভারতীয় পরিচয়পত্রগুলি কী ভাবে তাঁর হাতে এল এবং নেপাল হয়ে থাইল্যান্ড যাওয়ার পরিকল্পনার পিছনে আসল উদ্দেশ্য কী ছিল। একই সঙ্গে তাঁর ভারতীয় বন্ধু শঙ্কর বণিকের ভূমিকা নিয়েও বিস্তারিত তদন্ত চলছে।
ঘটনার তদন্ত যত এগোবে, ততই স্পষ্ট হতে পারে এই ঘটনায় শুধুই দু’জনের ভূমিকা ছিল, নাকি এর পিছনে আরও বড় কোনও নথি জালিয়াতি বা যাতায়াতের নেটওয়ার্ক রয়েছে। আপাতত আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ থেকে কী তথ্য উঠে আসে, সেদিকেই নজর রয়েছে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments