রংপুর হত্যার রহস্যনিউজ ডেস্ক : বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হয়ে গিয়েছিল। দুই পরিবারেই চলছিল প্রস্তুতি। নতুন জীবনের স্বপ্নে দিন গুনছিলেন বাংলাদেশের রংপুরের তরুণী আগামী চক্রবর্তী এবং তাঁর হবু স্বামী অদিত কর। কিন্তু সেই স্বপ্ন আচমকাই থেমে গেল এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে। রংপুরের কামাল কাছনা মাছুয়াপাড়া এলাকায় একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় এখন শোকের ছায়া। নিহতদের মধ্যে ছিলেন আগামীও। হবু স্ত্রীর এমন মর্মান্তিক পরিণতি মেনে নিতে পারছেন না অদিত। সমাজমাধ্যমে তাঁর একটি পোস্ট ইতিমধ্যেই আবেগঘন হয়ে উঠেছে।
অদিতের পোস্টে উঠে এসেছে তাঁদের শেষ দেখা হওয়ার স্মৃতি। বিয়ের আগে শেষ কয়েকটি দিনের সাধারণ মুহূর্তগুলিই এখন তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় স্মৃতি। অদিত লিখেছেন, ওই দিন আগামী তাঁকে বলেছিলেন, ‘‘আমরা তো কখনও কাপল পিক তুলিনি, চলো আজকে তুলি।’’ হবু স্ত্রীর সেই আবদারে সাড়া দিয়েছিলেন তিনি। দু’জনে মিলে ছবি তুলেছিলেন। তখন কে জানত, সেই ছবিই তাঁদের একসঙ্গে তোলা শেষ ছবি হয়ে থাকবে!
সেই ছবিটি সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে অদিত লিখেছেন, ‘‘চিন্তা করো না আগামী, আমি তোমার সঙ্গে ছিলাম, আছি, থাকব।’’ শোকের ভাষায় আরও লিখেছেন, ‘‘আমার জীবনের শেষ সম্বলটাও শেষ হয়ে গেল।’’ প্রিয় মানুষকে হারানোর পর তাঁর এই পোস্টই এখন ছুঁয়ে যাচ্ছে অনেককে।
আগামী চক্রবর্তী রংপুর জেলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েলের মেয়ে। ২৫ বছরের আগামী কারমাইকেল কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। এই বছরের শেষেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া অদিত করের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। দুই পরিবারেই সেই বিয়ে নিয়ে প্রস্তুতি চলছিল বলে জানা গিয়েছে।
কিন্তু শনিবার রাতে রংপুর নগরীর কামাল কাছনা মাছুয়াপাড়া এলাকার একটি তালাবন্ধ বাড়ি থেকে একে একে উদ্ধার হয় পরিবারের চার সদস্যের দেহ। মৃতদের মধ্যে ছিলেন ৬৫ বছরের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তাঁর স্ত্রী ৫০ বছরের প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ওরফে প্রার্থী এবং ১২ বছরের ছেলে আয়ুষ চক্রবর্তী ওরফে প্রিয়ম।
একটি পরিবারের চার সদস্যের এমন পরিণতিতে এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। পরে তদন্তে নেমে দুই যুবককে গ্রেফতার করে পুলিশ। ধৃতদের নাম মুগ্ধ দাস, বয়স ২৩, এবং সিদ্ধার্থ দাস, বয়স ১৯।
রবিবার সাংবাদিক বৈঠকে রংপুরের পুলিশ কমিশনার মহম্মদ আবদুল মাবুদ এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের ঘটনা নিয়ে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তের কথা জানান। পুলিশের দাবি, অভিযুক্ত দুই যুবক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে বসে মাদক সেবন করছিলেন। বিষয়টি দেখে তাঁদের বাধা দিয়েছিলেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক।
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, সেই বাধার জেরেই প্রথমে গণপতি চক্রবর্তীকে গামছা দিয়ে শ্বাসরোধ করে খুন করা হয়। এরপর অভিযুক্তদের পরিচয় প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। সেই কারণেই তাঁর স্ত্রী, মেয়ে এবং ছেলেকেও শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে তদন্তকারীদের দাবি।
পরিবারের সদস্যদের দেহ বাড়ির বিভিন্ন জায়গা থেকে উদ্ধার করা হয়। কারও দেহ সিঁড়ির কাছে, আবার কারও দেহ খাটের নীচে পাওয়া যায় বলে জানা গিয়েছে। পরিবারের তরফে আরও কিছু গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে। তবে ওই অভিযোগগুলির বিস্তারিত তদন্ত এখনও চলছে।
পুলিশের দাবি অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পরও অভিযুক্তরা কিছু সময় ওই বাড়িতে ছিলেন। এমনকি বাড়ির বাথরুমে স্নান করা এবং সেখানে খাবার খাওয়ার কথাও তদন্তে উঠে এসেছে। এরপর হত্যাকাণ্ডকে অন্য কোনও অপরাধের চেহারা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে পুলিশের দাবি।
পুলিশ জানিয়েছে, বাড়ির জিনিসপত্র এলোমেলো করে ঘটনাটিকে ডাকাতির ঘটনা বলে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের কাছে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা অন্য তথ্য সামনে আসে। শেষ পর্যন্ত দুই যুবককে গ্রেফতার করা হয়েছে।
তবে তদন্ত এখনও চলমান। ফলে পুলিশের হাতে থাকা তথ্য, অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং ফরেন্সিক তদন্তের ভিত্তিতে ঘটনার আরও কোনও দিক সামনে আসে কি না, সে দিকে নজর রয়েছে।
আগামী ও অদিতের শেষ দেখা হয়েছিল ঘটনার মাত্র দু’দিন আগে। অদিতের এক বন্ধুর দাবি, বুধবার দু’জনের শেষ সাক্ষাৎ হয়। পরের দিন রাতেও তাঁদের মধ্যে কথা হয়েছিল। তার পর আর আগামীকে ফোনে পাওয়া যায়নি।
এর মধ্যেই শনিবার পরিবারের মাধ্যমে ভয়াবহ খবর পান অদিত। গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি থেকে চার জনের দেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়তেই তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়, যে মানুষটির সঙ্গে কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখছিলেন, তিনি আর নেই।
অদিতের বন্ধুর দাবি, এই ঘটনায় তিনি মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত। কয়েক দিন আগেই নিজের বাবাকে হারিয়েছিলেন তিনি। তার পর হবু স্ত্রীকেও এমন নৃশংস ঘটনায় হারানোয় কার্যত ভেঙে পড়েছেন অদিত।
আগামীকে ঘিরেই তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বড় অংশ তৈরি হয়েছিল। সেই ভবিষ্যতের স্মৃতি এখন একটি ছবিতে আটকে রয়েছে। যে ছবি তোলার আবদার করেছিলেন আগামী নিজেই—‘‘আমরা তো কখনও কাপল পিক তুলিনি।’’
সাধারণ একটি আবদার। একটি সাধারণ ছবি। কিন্তু সেই মুহূর্তটাই যে তাঁদের শেষ স্মৃতি হয়ে থাকবে, তা সেদিন কেউ জানতেন না। এখন সেই ছবির দিকে তাকিয়েই আগামীকে মনে করছেন অদিত। আর রংপুরের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘিরে প্রশ্ন উঠছে, মাত্র কয়েক মুহূর্তের একটি বাধা কী ভাবে একটি গোটা পরিবারকে এমন ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিল।
পুলিশের তদন্তে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ নিয়ে যে তথ্য সামনে এসেছে, তার ভিত্তিতে দুই অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে মামলার তদন্ত ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় আরও তথ্য সামনে আসার অপেক্ষা রয়েছে। আপাতত চারটি প্রাণহানির ঘটনায় শোকস্তব্ধ রংপুর, আর হবু স্ত্রীকে হারিয়ে অদিতের কাছে সেই শেষ ছবিটিই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় স্মৃতি।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments