
নিউজ ডেস্ক: রাশিয়ার একাধিক অঞ্চলে একযোগে বড়সড় ড্রোন হামলা চালাল ইউক্রেন। রবিবারের এই হামলাকে চলতি বছরে ইউক্রেনের অন্যতম বড় আকাশপথে হামলা বলে মনে করা হচ্ছে। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের দাবি, দেশটির ১৭টি অঞ্চলে মোট ৮২২টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। মস্কো এবং তার আশপাশের এলাকায় হামলার তীব্রতা ছিল বিশেষ ভাবে বেশি। মস্কো অঞ্চলের গভর্নর আন্দ্রেই ভোরোবিয়ভ জানিয়েছেন, পোদলস্কে একটি ওয়াইল্ডবেরিজ় গুদামে হামলার ঘটনায় ৮৩ বছরের এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। রোস্তভ অঞ্চলেও পাঁচ জনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। সব মিলিয়ে রাশিয়ার তরফে অন্তত ছয় জনের মৃত্যুর কথা জানা গিয়েছে।
রুশ প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, শনিবার রাত থেকে রবিবার সকাল পর্যন্ত রাশিয়ার বিভিন্ন অংশে ড্রোনের হামলা চলতে থাকে। এর মধ্যে মস্কোকে লক্ষ্য করে প্রায় ৬০০টি ড্রোন পাঠানো হয়েছিল বলে মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন জানিয়েছেন। রুশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বহু ড্রোন মাঝপথে ধ্বংস করে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে কিছু ড্রোন লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছতে সক্ষম হয় এবং বিভিন্ন এলাকায় আগুন ও ক্ষয়ক্ষতির খবর সামনে আসে।
মস্কো অঞ্চলের পোদলস্ক এলাকায় ওয়াইল্ডবেরিজ়ের একটি বড় গুদাম এই হামলার অন্যতম উল্লেখযোগ্য লক্ষ্য হয়ে ওঠে। হামলার পর সেখানে আগুন ধরে যায় এবং ঘন কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। রুশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই ঘটনায় এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। মস্কো অঞ্চলের আরও কয়েকটি জায়গায় বাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ডোমোদেদোভো এলাকার একটি গুদামেও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গিয়েছে।
ওয়াইল্ডবেরিজ় রাশিয়ার অন্যতম বড় অনলাইন খুচরো বিক্রয় সংস্থা। ইউক্রেন এর আগে সংস্থাটির কয়েকটি স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। কিয়েভের অভিযোগ, সংস্থাটির কিছু লজিস্টিক পরিকাঠামো রুশ সামরিক সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত। তবে ওয়াইল্ডবেরিজ়কে সরাসরি রুশ সামরিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখানোর দাবি স্বাধীন ভাবে যাচাই করা হয়নি। এবারের হামলায় সংস্থাটির গুদামে আগুন লাগার ঘটনাটি অবশ্য একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।
রাশিয়ার রোস্তভ অঞ্চলেও হামলার প্রভাব পড়ে। স্থানীয় প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেখানে পাঁচ জনের মৃত্যু হয়েছে। হামলায় বিভিন্ন পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে খবর। একই সময়ে ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার সামরিক শিল্প ও জ্বালানি পরিকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত কিছু লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার দাবি করেছে। রোস্তভ অঞ্চলে একটি ক্ষেপণাস্ত্র জ্বালানি উৎপাদনকারী কারখানাকে লক্ষ্য করার কথাও ইউক্রেনীয় সামরিক সূত্র জানিয়েছে। তবে যুদ্ধক্ষেত্রে কোনও পক্ষের করা সামরিক সাফল্যের দাবি স্বাধীন ভাবে যাচাই করা কঠিন।
রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের হিসাবে, ৮২২টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। এই সংখ্যার মধ্যে মস্কো এবং তার আশপাশের অঞ্চলে ধ্বংস করা ড্রোনও রয়েছে। এত বড় সংখ্যক ড্রোন একসঙ্গে ব্যবহারের ফলে রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উপর বড় চাপ তৈরি হয়। মস্কো শহরের দিকে আসা ড্রোনগুলির একটি বড় অংশ প্রতিহত করা হয়েছে বলে রুশ কর্তৃপক্ষের দাবি।
ইউক্রেনের এই হামলার পর পাল্টা আঘাত হানে রাশিয়াও। রবিবার ইউক্রেনের একাধিক শহর ও অঞ্চলে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলার খবর পাওয়া যায়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলির একটি ঘটে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জ়েলেনস্কির জন্মশহর ক্রিভি রিহ-তে। সেখানে একটি বড় ইস্পাত কারখানার পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হামলায় দু’জনের মৃত্যু এবং অন্তত ১৪ জনের আহত হওয়ার কথা জানিয়েছে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ।
ক্রিভি রিহ-র ওই ইস্পাত কারখানাটি ইউক্রেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প পরিকাঠামো। রুশ হামলায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা এবং কারখানার কয়েকটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রাশিয়ার তরফে অবশ্য তাদের হামলাগুলি ইউক্রেনের সামরিক ও শিল্প পরিকাঠামোকে লক্ষ্য করেই চালানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
শুধু ক্রিভি রিহ নয়, ইউক্রেনের আরও কয়েকটি এলাকাতেও রুশ হামলার খবর এসেছে। কিয়েভে ড্রোন হামলায় আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। শহরের একটি পরিচিত বইয়ের বাজারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে খবর। অন্য দিকে, সুমি ও জ়াপোরিঝঝিয়াতেও রুশ হামলায় হতাহতের খবর সামনে এসেছে। ফলে একই দিনে দুই দেশের ভূখণ্ডেই পাল্টাপাল্টি আকাশ হামলায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
রুশ হামলার পর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জ়েলেনস্কি পশ্চিমা দেশগুলির কাছে আরও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠানোর আবেদন জানিয়েছেন। ইউক্রেনের বক্তব্য, রাশিয়ার ধারাবাহিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকাতে আরও ইন্টারসেপ্টর এবং উন্নত এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম প্রয়োজন। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, দুই দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উপর চাপও তত বাড়ছে।
এই সংঘাতের প্রভাব ইউক্রেন ও রাশিয়ার সীমানা ছাড়িয়েও পৌঁছেছে। রবিবার রোমানিয়ার আকাশসীমায় একটি ড্রোন ঢুকে পড়ার পর ন্যাটোর এয়ার-পুলিশিং মিশনে থাকা স্পেনের একটি এফ-১৮ যুদ্ধবিমান সেটিকে গুলি করে নামায়। রোমানিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রক জানিয়েছে, ড্রোনটি তাদের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছিল। পরে ন্যাটোর এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ড্রোনটি সম্ভবত রাশিয়া থেকে এসেছিল। তবে রোমানিয়া নিজে ড্রোনটির উৎস সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি।
রোমানিয়ার ঘটনায় যুদ্ধের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এসেছে। ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার সংঘাতের জেরে ন্যাটো সদস্য দেশের আকাশসীমায় বার বার ড্রোন প্রবেশের ঘটনা আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। রবিবারের ঘটনাটি চলতি বছরে রোমানিয়ার আকাশসীমায় ড্রোন ভূপাতিত করার চতুর্থ ঘটনা বলে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে রবিবারের ঘটনাপ্রবাহে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আকাশযুদ্ধ নতুন মাত্রা পেয়েছে। রাশিয়ার ১৭টি অঞ্চলে ইউক্রেনের ব্যাপক ড্রোন হামলা, মস্কো অঞ্চলে বড় গুদামে আগুন, অন্তত ছয় জনের মৃত্যু এবং তার পরেই ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে রুশ হামলা—এক দিনের মধ্যে পরপর এই ঘটনাগুলি সংঘাতের তীব্রতা আরও বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে রোমানিয়ার আকাশসীমায় ড্রোন ঢোকার ঘটনায় যুদ্ধের প্রভাব ন্যাটোর সীমান্তের কাছেও আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments