Homeদার্জিলিংশিলিগুড়িখাবারের গুণমান নিয়ে কড়া প্রশাসন, শিলিগুড়িতে মিষ্টির কারখানা সিল, মালবাজারে চিনির গুদামেও অভিযান

খাবারের গুণমান নিয়ে কড়া প্রশাসন, শিলিগুড়িতে মিষ্টির কারখানা সিল, মালবাজারে চিনির গুদামেও অভিযান

নিউজ ডেস্ক; খাবারের গুণমান, পরিচ্ছন্নতা এবং খাদ্য সুরক্ষার নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে শনিবার দিনভর শিলিগুড়ি শহর
resizeplus_Screenshot 2026-08-30 135827_edited

নিউজ ডেস্ক; খাবারের গুণমান, পরিচ্ছন্নতা এবং খাদ্য সুরক্ষার নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে শনিবার দিনভর শিলিগুড়ি শহর এবং মালবাজার মহকুমার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালাল প্রশাসন। শিলিগুড়িতে পুরসভার নেতৃত্বে অভিযানে সামিল হয় পুলিশ এবং খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের আধিকারিকদের যৌথ দল। শহরের একাধিক মিষ্টির দোকান, বিরিয়ানি প্রতিষ্ঠান এবং রান্নাঘরে গিয়ে খাবার তৈরির পরিবেশ, পরিচ্ছন্নতা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, পরিকাঠামো এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র পরীক্ষা করা হয়। অভিযানে সেবক রোডের একটি পরিচিত মিষ্টির দোকানের কারখানায় গুরুতর অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতির অভিযোগ ওঠায় সেটি সিল করে দেওয়া হয়েছে।

একই দিনে জলপাইগুড়ির মালবাজার মহকুমাতেও বাজার, মিষ্টির দোকান এবং পাইকারি খাদ্যপণ্যের গুদামে অভিযান চালায় প্রশাসন ও পুলিশ। মেটেলি বাজারে একটি গুদামে বিপুল পরিমাণ চিনি মজুত থাকার অভিযোগে সেটি সিল করে দেওয়া হয়েছে। ফলে একই দিনে উত্তরবঙ্গের দুই গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রশাসনের নজরদারি ঘিরে ব্যবসায়ী মহলেও চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।

শনিবার সকালে শিলিগুড়ির সেবক রোডের একটি প্রসিদ্ধ মিষ্টির দোকানের কারখানায় হানা দেয় যৌথ দল। কারখানার ভিতরে ঢুকেই সেখানে খাবার তৈরির পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন আধিকারিকেরা। অভিযোগ, ঘিয়ের পাত্রের আশপাশে মাছি ঘুরছিল। কারখানার বিভিন্ন জায়গায় টিকটিকি এবং আরশোলা দেখা যায় বলেও প্রশাসনের তরফে অভিযোগ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, রান্না ও খাবার তৈরির জায়গার একাধিক অংশ নোংরা এবং অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় ছিল বলে দাবি আধিকারিকদের।

এমন পরিস্থিতি দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন শিলিগুড়ি পুর কমিশনার বীর বিক্রম রাই। খাবার তৈরির জায়গায় পরিচ্ছন্নতার ন্যূনতম মান বজায় না রাখার অভিযোগে কারখানাটির বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পরে কারখানার গেটে প্রশাসনের তরফে নোটিস সাঁটিয়ে সেটি সিল করে দেওয়া হয়।

প্রতিষ্ঠানের এক প্রতিনিধি অবশ্য আধিকারিকদের কাছে কিছুটা সময় দেওয়ার আবেদন জানান। তাঁর বক্তব্য ছিল, তাঁদের সময় দিলে পরবর্তী সময়ে কারখানায় আর কোনও ধরনের অব্যবস্থা থাকবে না। কিন্তু প্রশাসনের আধিকারিকেরা সেই আবেদনে সাড়া দেননি। নিয়ম মেনেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়।

পুর কমিশনারের বক্তব্য, খাবারের দোকান বা কারখানায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ কোনও ভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। শুধু খাবারের মান নয়, একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকগুলিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানান, একটি প্রতিষ্ঠানের রান্নার জায়গার মধ্যে আবর্জনায় ভর্তি ড্রেনের মতো পরিস্থিতি দেখা গিয়েছে। খাবারের মধ্যে পোকামাকড় থাকার অভিযোগও সামনে এসেছে। সেই কারণেই কারখানার সংশ্লিষ্ট অংশ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটিকে শো-কজ করা হয়েছে।

প্রশাসনের এই অভিযান অবশ্য শুধু একটি প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ ছিল না। দুপুরে বর্ধমান রোডের একটি নামী বিরিয়ানি দোকানেও অভিযান চালানো হয়। দোকানের বিক্রয়স্থলের পাশাপাশি রান্নাঘরও খুঁটিয়ে দেখেন আধিকারিকেরা। সেখানে বড় কোনও অনিয়ম ধরা পড়েনি বলেই প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে। তবে কয়েকটি জায়গায় নোংরা জমে থাকতে দেখা যায়। দোকান কর্তৃপক্ষকে সেই বিষয়ে সতর্ক করা হয় এবং ভবিষ্যতে পরিচ্ছন্নতার মান আরও উন্নত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

অভিযানের সময় প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় ব্যবসায়িক ও খাদ্য সংক্রান্ত নথিপত্রও পরীক্ষা করা হয়। খাবার তৈরির প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে রান্নাঘরের পরিবেশ—সব কিছুই নিয়ম মেনে চলছে কি না, তা যাচাই করেন আধিকারিকেরা।

এর পর সন্ধ্যায় বিধান মার্কেটের একটি পরিচিত মিষ্টির দোকানেও অভিযান চালানো হয়। সেখানে খাদ্যের গুণমান, খাবার তৈরির জায়গার পরিচ্ছন্নতা এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র খতিয়ে দেখা হয়। প্রশাসনের দাবি, ওই প্রতিষ্ঠানে তেমন কোনও অসঙ্গতি পাওয়া যায়নি। ফলে সেখানে তাৎক্ষণিক কোনও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি।

শিলিগুড়ির পাশাপাশি শনিবার মালবাজার মহকুমাতেও একই ভাবে নজরদারি চালানো হয়। সকালে মালবাজার থানার ওদলাবাড়ি এলাকায় বিভিন্ন দোকানে অভিযান চালায় প্রশাসনের দল। মুদি দোকান থেকে মিষ্টির দোকান—বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে খাদ্যসামগ্রীর গুণমান এবং সংরক্ষণ পদ্ধতি খতিয়ে দেখা হয়।

এর পর বিকেলে মেটেলি ব্লকের মেটেলি বাজার এবং চালসা বাজারে অভিযান চালানো হয়। মহকুমা প্রশাসন ও পুলিশের যৌথ দল একাধিক চাল, ডাল এবং চিনির গুদামে ঢুকে মজুত সামগ্রীর পরিমাণ, সংরক্ষণের পদ্ধতি এবং ব্যবসায়িক নথিপত্র পরীক্ষা করে। অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন মহকুমাশাসক উৎকর্ষ খান্ডাল এবং মহকুমা পুলিশ আধিকারিক সুদীপ্ত সরকার।

গুদামগুলিতে কতটা খাদ্যসামগ্রী মজুত করা হয়েছে এবং কী ভাবে তা রাখা হচ্ছে, সে বিষয়ে বিশেষ নজর দেওয়া হয়। বিশেষ করে চিনির মজুতের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের নির্দিষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের তরফে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, এক মাসের বেশি সময়ের জন্য চিনি গুদামজাত করে রাখা যাবে না।

এই অভিযানের সময় মেটেলি বাজারে একটি গুদাম সিল করে দেওয়া হয়। প্রশাসনের অভিযোগ, সেখানে প্রায় ৩৫০ বস্তা চিনি মজুত করে রাখা হয়েছিল। এত বিপুল পরিমাণ চিনি কী কারণে মজুত করা হয়েছিল এবং নির্ধারিত নিয়ম মানা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশাসন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করেছে।

মিষ্টির দোকান এবং কারখানাগুলিও প্রশাসনের নজর এড়ায়নি। মিষ্টি তৈরির জায়গায় গিয়ে খাবারের উপকরণ কী ভাবে রাখা হচ্ছে, রান্নাঘর কতটা পরিষ্কার, কর্মীদের কাজের পরিবেশ কেমন—এই বিষয়গুলি পরীক্ষা করা হয়। প্রশাসনের বক্তব্য, এক দিনের অভিযানেই কাজ শেষ হচ্ছে না। নিয়মিত নজরদারি চালানো হবে এবং কোথাও অনিয়ম ধরা পড়লে নোটিস দিয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মালবাজারের মহকুমাশাসক জানিয়েছেন, অভিযান ধারাবাহিক ভাবে চলবে। বিভিন্ন জায়গায় অসঙ্গতি ধরা পড়ছে বলেও তিনি দাবি করেন। যেসব প্রতিষ্ঠানে নিয়ম ভাঙার প্রমাণ মিলবে, তাদের নোটিস দেওয়া হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

খাদ্যসামগ্রীর গুণমান নিয়ে অভিযানের পাশাপাশি শিলিগুড়ি পুরসভা শহরের নির্মীয়মাণ ভবন নিয়েও ব্যবস্থা নিয়েছে। ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের একটি নির্মীয়মাণ বিল্ডিংয়ের বেসমেন্টে জল জমে থাকার অভিযোগ ওঠে। দীর্ঘদিন জল জমে থাকলে সেখানে ডেঙ্গির মশার প্রজননের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। সেই কারণেই ভবন কর্তৃপক্ষকে এক লক্ষ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

অর্থাৎ শনিবারের অভিযানে একদিকে যেমন খাবারের গুণমান এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে, তেমনই অন্য দিকে খাদ্যপণ্য মজুতের নিয়ম এবং শহরের নির্মীয়মাণ ভবনে মশার প্রজনন ঠেকাতেও কড়া পদক্ষেপ করেছে প্রশাসন।

প্রশাসনের এই তৎপরতার পিছনে মূল লক্ষ্য, সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। খাবার তৈরির জায়গায় সামান্য অবহেলাও বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে মিষ্টি, বিরিয়ানি বা অন্যান্য রান্না করা খাবার তৈরির ক্ষেত্রে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ থাকলে খাদ্যদূষণের সম্ভাবনা বাড়ে। একই ভাবে দীর্ঘদিন ধরে খাদ্যপণ্য মজুত রাখার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট নিয়ম মানা জরুরি।

শনিবারের অভিযানের পর ব্যবসায়ীদের একাংশের মধ্যে সতর্কতা বেড়েছে। প্রশাসনও স্পষ্ট করে দিয়েছে, নিয়ম না মানলে শুধু সতর্ক করে ছেড়ে দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠান সিল করা, শো-কজ এবং জরিমানার মতো পদক্ষেপ করা হবে।

এখন নজর, আগামী দিনে এই অভিযান কতটা ধারাবাহিক হয় এবং নিয়ম ভাঙা প্রতিষ্ঠানগুলির বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কারণ এক দিনের অভিযান নয়, নিয়মিত নজরদারির মাধ্যমেই খাবারের গুণমান এবং শহরের স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব বলে মনে করছে প্রশাসনের একাংশ।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved