Homeবিদেশভয়াবহ বন্যার পর ফের কোশীতে গর্জন! আচমকা জলপ্রবাহ বাড়ায় নেপালে নতুন সতর্কতা, নিখোঁজ বহু ভারতীয়

ভয়াবহ বন্যার পর ফের কোশীতে গর্জন! আচমকা জলপ্রবাহ বাড়ায় নেপালে নতুন সতর্কতা, নিখোঁজ বহু ভারতীয়

নিউজ ডেস্ক : ভয়াবহ হড়পা বানের ক্ষত এখনও শুকোয়নি। উদ্ধারকাজও পুরোপুরি শেষ হয়নি। তার মধ্যেই ফের নদীতে আচমকা জলপ্রবাহ বৃদ্ধির
6a913e52a462f

নিউজ ডেস্ক : ভয়াবহ হড়পা বানের ক্ষত এখনও শুকোয়নি। উদ্ধারকাজও পুরোপুরি শেষ হয়নি। তার মধ্যেই ফের নদীতে আচমকা জলপ্রবাহ বৃদ্ধির খবরে নতুন করে উদ্বেগ ছড়াল নেপালে। রবিবার ভুটে কোশি নদীর উপরিভাগে আচমকা জলের প্রবাহ এবং গর্জন বাড়তে শোনা গিয়েছে বলে খবর। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে দ্রুত সতর্কতা জারি করেছে নেপালের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (NDRRMA)। নদীর কাছাকাছি থাকা মানুষজনকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার পাশাপাশি প্রয়োজনে উঁচু এলাকায় সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

গত ২৬ অগস্টের ভয়াবহ হড়পা বানে নেপালের একাধিক এলাকা কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে রসুয়া, নুয়াকোট এবং ধাদিং জেলার বিস্তীর্ণ অংশে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। সেই বিপর্যয়ের পর এখনও বহু মানুষ নিখোঁজ। বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধারকারী দল তল্লাশি চালাচ্ছে। এর মধ্যেই নদীর জলপ্রবাহ ফের বাড়ার খবর পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।

NDRRMA-এর তরফে রবিবার জরুরি জনসুরক্ষা বার্তা জারি করা হয়। সেখানে নদীর নিম্ন অববাহিকায় থাকা বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে উদ্ধারকারী দল, স্থানীয় প্রশাসন এবং জরুরি পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মীদেরও প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের বক্তব্য, নদীর গতিপথে আচমকা পরিবর্তন হলে নতুন করে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ফলে কোনও রকম ঝুঁকি না নিয়ে আগে থেকেই প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক পদক্ষেপ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসনের কাছ থেকে ভুটে কোশি নদীতে জলপ্রবাহ বৃদ্ধির খবর পাওয়ার পরই NDRRMA এই সতর্কতা জারি করে। বিশেষ ভাবে নজরে রাখা হচ্ছে রসুয়া জেলার নদীতীরবর্তী এলাকা। শুধু তাই নয়, নেপাল-চিন সীমান্তের কাছাকাছি এলাকাতেও নদীর জলস্তর এবং স্রোতের গতিবিধির উপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

রসুয়া প্রশাসনের কাছে নদীর উপরিভাগ থেকে অস্বাভাবিক জলের গর্জন শোনার খবর পৌঁছেছে বলে NDRRMA জানিয়েছে। নদীর স্রোত আচমকা শক্তিশালী হওয়ার কোনও কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও নির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। নতুন কোনও তথ্য পাওয়া গেলে পরবর্তী আপডেট দেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে নেপালের বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষ।

অন্য দিকে, নুয়াকোট এবং ধাদিং জেলাতেও সতর্কতা জারি রাখা হয়েছে। নদী অববাহিকায় থাকা জরুরি পরিষেবাগুলিকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনকে প্রয়োজনে দ্রুত উদ্ধার ও সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। দুর্গত এলাকার বাসিন্দাদের নদীর ধারে না যাওয়ার এবং পরিস্থিতি দেখতে ভিড় না করারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এই নতুন সতর্কতার পিছনে আরও একটি বিষয় উদ্বেগ বাড়িয়েছে। মাত্র কয়েক দিন আগেই ফের একটি ব্যারিয়ার লেক ফেটে যাওয়ার খবর সামনে এসেছিল। পাহাড়ি এলাকায় অতিবৃষ্টি, ভূমিধস, নদীর গতিপথে বাধা এবং হিমবাহ বা প্রাকৃতিক জলাধারে অতিরিক্ত জল জমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে আচমকা জল নেমে আসার আশঙ্কা থাকে। ফলে ইতিমধ্যেই বিপর্যস্ত নদী অববাহিকায় নতুন করে জলপ্রবাহ বৃদ্ধির খবরকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে প্রশাসন।

মৃতের সংখ্যা বাড়ছে, নিখোঁজ বহু

এর মধ্যেই রসুয়া-ভুটে কোশি এলাকায় ভয়াবহ হড়পা বানের অভিঘাতের চিত্র আরও স্পষ্ট হচ্ছে। সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই বিপর্যয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭৫০ হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। দুর্গত এলাকার বিভিন্ন নিম্ন অববাহিকায় এখনও উদ্ধার অভিযান চলছে। বহু জায়গায় নদী, কাদামাটি এবং ধ্বংসস্তূপের মধ্যে নিখোঁজদের সন্ধান চালানো হচ্ছে।

নেপালের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত প্রায় ৩,০০০ জন নিখোঁজ অথবা তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে কি না, তা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। উদ্ধারকারী দলগুলি একদিকে জীবিতদের সন্ধান করছে, অন্য দিকে বিভিন্ন জায়গা থেকে দেহ এবং দেহাবশেষ উদ্ধারের কাজও চালিয়ে যাচ্ছে।

বিপর্যয়ের মাত্রা সবচেয়ে বেশি বোঝা যাচ্ছে দুর্গত জেলার প্রত্যন্ত এলাকাগুলির পরিস্থিতি থেকে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বহু জায়গায় পৌঁছনো কঠিন হয়ে পড়েছে। কোথাও রাস্তা ভেঙে গিয়েছে, কোথাও নদীর স্রোতে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে উদ্ধারকাজের পাশাপাশি দুর্গত মানুষদের কাছে প্রয়োজনীয় সাহায্য পৌঁছে দেওয়াও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নিখোঁজ বহু ভারতীয় নাগরিকও

নেপালের এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ভারতীয় নাগরিকদের নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বন্যা ও হড়পা বানে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকায় এখনও বহু ভারতীয় নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৮৭ জন ভারতীয় নাগরিক এবং ১২৮ জন ভারতীয় বংশোদ্ভূত (PIO)-এর এখনও কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি।

নিখোঁজদের তালিকায় বিভিন্ন সংগঠন ও বিভিন্ন রাজ্যের মানুষ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ইশা ফাউন্ডেশনের প্রায় ৮০ জন এবং বাংলার ৩৭ জন রয়েছেন বলেও জানা গিয়েছে। ফলে নিখোঁজ ভারতীয়দের সন্ধানে নেপাল প্রশাসনের পাশাপাশি ভারতীয় কর্তৃপক্ষও পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে।

তবে এর মধ্যেই কিছুটা স্বস্তির খবর দিয়েছে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক। রসুয়ার একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে আটকে পড়া চার ভারতীয় নাগরিককে উদ্ধার করা হয়েছে বলে MEA-এর তরফে জানানো হয়েছে। উদ্ধার হওয়া চারজন হলেন রিপু কুমার, চনেশ্বর নারজারি, কৃপা শঙ্কর এবং মহম্মদ মিনহাজউদ্দিন। তাঁদের নিরাপদে কাঠমান্ডু নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

বিদেশ মন্ত্রকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত নেপালের বন্যা কবলিত বিভিন্ন এলাকা থেকে ৮৮ জন ভারতীয় নাগরিককে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি আরও ১২০ জন ভারতীয় নাগরিক চিনের দিক থেকে নেপালে প্রবেশ করে নিরাপদে পৌঁছেছেন বলেও জানা গিয়েছে।

তবে নতুন করে ভুটে কোশি নদীর জলপ্রবাহ বাড়ার খবর প্রশাসনের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। ইতিমধ্যেই বিপর্যস্ত এলাকায় দ্বিতীয় দফায় কোনও বড় ধরনের বিপদ তৈরি হয় কি না, এখন সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। তাই নদীর কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষজনকে সতর্ক থাকার পাশাপাশি প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলার আবেদন করা হয়েছে।

এই মুহূর্তে নেপালের রসুয়া, নুয়াকোট এবং ধাদিং—তিন জেলাতেই নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। নদীর জলস্তর, স্রোতের গতি এবং পাহাড়ি এলাকার পরিস্থিতির উপর নিয়মিত নজর রাখছে প্রশাসন। পরিস্থিতির সামান্য পরিবর্তন হলেও যাতে দ্রুত মানুষকে নিরাপদ এলাকায় সরিয়ে নেওয়া যায়, সেই প্রস্তুতিও রাখা হচ্ছে।

ভয়াবহ বন্যার পর যখন এখনও নিখোঁজদের খোঁজ চলছে, মৃতের সংখ্যা বাড়ছে এবং বহু পরিবার স্বজনদের অপেক্ষায় রয়েছে, তখন কোশী নদীর নতুন এই গর্জন স্বাভাবিক ভাবেই আতঙ্ক বাড়িয়েছে। আগামী কয়েক ঘণ্টায় নদীর পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেই দিকেই এখন নজর নেপাল প্রশাসন থেকে শুরু করে দুর্গত এলাকার বাসিন্দা এবং নিখোঁজ ভারতীয়দের পরিবারের।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved