
নিউজ ডেস্ক; কোনও আগাম বিজ্ঞপ্তি নয়, যাত্রীদের জানানোও হয়নি কিছু। শনিবার সকালে আচমকাই বন্ধ হয়ে গেল পূর্ব মেদিনীপুরের মহিষাদল এলাকার গেঁওখালি থেকে দক্ষিণ ২৪ পরগনার নুরপুরের মধ্যে ফেরি পরিষেবা। গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে আচমকা পরিষেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েন নিত্যযাত্রী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ। নদীপথে দ্রুত যাতায়াতের সুযোগ না থাকায় অনেককেই বাধ্য হয়ে ঘুরপথে তমলুক, বাগনান হয়ে নুরপুর এবং সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছতে হয়েছে। ফলে অতিরিক্ত সময় ও খরচ—দুই-ই গুনতে হয়েছে যাত্রীদের।
শনিবার সকালে অন্যান্য দিনের মতোই গেঁওখালি ফেরিঘাটে যাত্রীদের ভিড় ছিল বলে স্থানীয় সূত্রে খবর। নুরপুরের দিকে যাওয়ার জন্য অনেকে ঘাটে পৌঁছন। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাঁরা জানতে পারেন, ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। পরিষেবা বন্ধের বিষয়ে আগে থেকে কোনও বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি বলেই অভিযোগ যাত্রীদের। ফলে অনেকেই বিষয়টি বুঝতে না পেরে ঘাটে এসে সমস্যায় পড়েন।
গেঁওখালি-নুরপুর জলপথ পূর্ব মেদিনীপুর এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার মধ্যে যাতায়াতের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে স্থানীয়দের দাবি। সড়কপথে ঘুরে গেলে যেখানে বেশি সময় লাগে, সেখানে ফেরি পরিষেবা ব্যবহার করে তুলনামূলক দ্রুত এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছনো যায়। কাজের প্রয়োজনে, ব্যবসার কারণে কিংবা নিত্যদিনের যাতায়াতে বহু মানুষ এই জলপথের উপর নির্ভর করেন। ফলে হঠাৎ ফেরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব পড়ে সরাসরি যাত্রীদের উপর।
পরিষেবা বন্ধ থাকায় অনেক যাত্রীকে বিকল্প পথ বেছে নিতে হয়। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, তমলুক, বাগনান হয়ে ঘুরে নুরপুরের দিকে যেতে হয়েছে তাঁদের। এতে শুধু যাত্রাপথ দীর্ঘ হয়নি, বেড়েছে যাতায়াতের খরচও। বিশেষ করে যাঁদের নির্দিষ্ট সময়ে কর্মস্থল বা অন্য কোনও কাজে পৌঁছনোর প্রয়োজন ছিল, তাঁদের সমস্যায় পড়তে হয়েছে সবচেয়ে বেশি।
হঠাৎ পরিষেবা বন্ধের কারণ জানতে চাওয়া হলে ফেরি সার্ভিসের মালিকের তরফে বৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, শনিবার বৃষ্টির কারণে যাত্রী সংখ্যা তুলনামূলক ভাবে কম ছিল। সেই পরিস্থিতিতে ভেসেল চালানো ব্যয়সাধ্য হয়ে পড়ছিল। তাই সাময়িক ভাবে পরিষেবা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
তবে এই যুক্তি মানতে নারাজ যাত্রীদের একাংশ। তাঁদের প্রশ্ন, যাত্রী কম হওয়ার কারণে পরিষেবা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তা আগে থেকে জানানো হল না কেন? আগাম বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলে অনেকেই ঘাট পর্যন্ত এসে ফিরে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে পড়তেন না। বিকল্প যাতায়াতের ব্যবস্থাও আগে থেকে করতে পারতেন তাঁরা। আচমকা পরিষেবা বন্ধ হয়ে যাওয়াতেই মূলত ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে খবর।
ফেরি পরিষেবা বন্ধের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। বিষয়টি জানতে পেরে তড়িঘড়ি গেঁওখালি ফেরিঘাটে পৌঁছে যান স্থানীয় বিধায়ক সুভাষচন্দ্র পাঁজা। সেখানে ফেরি সার্ভিসের মালিকের সঙ্গে তিনি আলোচনা করেন। যাত্রীদের অসুবিধার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে বলে জানা গিয়েছে।
বিধায়কের উপস্থিতিতে পরিষেবা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত এবং তার কারণ নিয়ে আলোচনা হয়। যাত্রীদের আগে থেকে না জানিয়ে কেন পরিষেবা বন্ধ করা হল, সেই প্রশ্নও ওঠে। দীর্ঘক্ষণ আলোচনার পর ফেরি সার্ভিসের মালিক নিজের ভুল স্বীকার করেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে।
ঘটনার পর ফেরি পরিষেবা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। যাত্রীদের একাংশের দাবি, আবহাওয়ার কারণে কখনও পরিষেবা সাময়িক বন্ধ রাখার প্রয়োজন হতে পারে। নদীর পরিস্থিতি অনুকূল না থাকলে নিরাপত্তার কারণে ভেসেল চলাচল বন্ধ রাখাও স্বাভাবিক। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত যাত্রীদের আগাম জানানো জরুরি। বিশেষ করে এই জলপথের উপর নির্ভরশীল বহু মানুষ প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় ধরে নিজেদের যাতায়াতের পরিকল্পনা করেন। আচমকা পরিষেবা বন্ধ হয়ে গেলে তাঁদের বিকল্প ব্যবস্থা করার সুযোগ থাকে না।
স্থানীয়দের বক্তব্য, গেঁওখালি-নুরপুর ফেরি শুধু পর্যটন বা সাধারণ যাতায়াতের একটি মাধ্যম নয়। দুই জেলার মানুষের দৈনন্দিন যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এই পরিষেবার গুরুত্ব রয়েছে। নদী পেরিয়ে সরাসরি যাতায়াতের সুযোগ থাকায় সময় ও অর্থ দু’টোই বাঁচে। সেই পরিষেবা বন্ধ থাকলে সড়কপথে দীর্ঘ ঘুরপথ নিতে হয়। ফলে সমস্যায় পড়েন সাধারণ যাত্রীরা।
শনিবারের ঘটনায় ফের একবার সেই সমস্যাই সামনে এল। একটি পরিষেবা বন্ধ রাখার প্রশাসনিক বা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের সঙ্গে যাত্রী পরিষেবার দায়বদ্ধতার বিষয়টিও যে জড়িত, তা নিয়েই এখন আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে আগাম কোনও বিজ্ঞপ্তি না দেওয়ার অভিযোগ ঘিরেই বেশি ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
ফেরি সার্ভিসের মালিক পরে ভুল স্বীকার করায় আপাতত পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তবে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে পরিষেবা বন্ধের আগে যাত্রীদের যথাযথ ভাবে জানানোর ব্যবস্থা করা হবে কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয়দের দাবি, ফেরি পরিষেবা পরিচালনায় আবহাওয়া, যাত্রী সংখ্যা কিংবা অন্য কোনও কারণে পরিবর্তন এলে ঘাটে নোটিস দেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় ভাবে প্রচারের ব্যবস্থা করা উচিত।
গেঁওখালি এবং নুরপুরের মধ্যে জলপথের উপর নির্ভরশীল মানুষের কাছে শনিবারের ঘটনা তাই শুধু এক দিনের দুর্ভোগের ঘটনা নয়। তাঁদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে একই ভাবে পরিষেবা বন্ধ হলে ফের একই সমস্যায় পড়তে হবে। সেই কারণে ফেরি পরিষেবার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম এবং আগাম যাত্রী-বার্তার ব্যবস্থা করার দাবি উঠেছে
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments