Homeজলপাইগুড়িগোরুমারাদু’দশকের হাড়ভাঙা খাটুনি, আয় সাকুল্যে ৩০ টাকা! গোরুমারার অরণ্যকন্যাদের ক্ষোভের আগ্নেয়গিরি

দু’দশকের হাড়ভাঙা খাটুনি, আয় সাকুল্যে ৩০ টাকা! গোরুমারার অরণ্যকন্যাদের ক্ষোভের আগ্নেয়গিরি

নিউজ ডেস্ক; এক-দু’বছর নয়, টানা প্রায় দুই দশক ধরে পাটের তৈরি হস্তশিল্পের সামগ্রী বিক্রি করে সংসারে বাড়তি আয় করছেন জলপাইগুড়ির
resizeplus_Screenshot 2026-08-29 200122_edited

নিউজ ডেস্ক; এক-দু’বছর নয়, টানা প্রায় দুই দশক ধরে পাটের তৈরি হস্তশিল্পের সামগ্রী বিক্রি করে সংসারে বাড়তি আয় করছেন জলপাইগুড়ির গোরুমারা এলাকার বনবস্তির বহু মহিলা। পর্যটকদের হাতেই নিজেদের তৈরি পাটের ব্যাগ, মোবাইল কভার, চাবির রিং-সহ নানা সামগ্রী তুলে দিয়ে এত দিন ধরে রোজগারের পথ তৈরি করেছেন তাঁরা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বাজারে কাঁচামাল থেকে শুরু করে অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়েছে। অথচ তাঁদের তৈরি পণ্যের নির্ধারিত দাম রয়ে গিয়েছে সেই আগের জায়গাতেই। তাই এবার নিজেদের পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য চেয়ে পাটের তৈরি সামগ্রীর দাম বাড়ানোর দাবি তুলেছেন বনবস্তির মহিলারা।

গোরুমারার জঙ্গলে পর্যটকদের আনাগোনা থাকলে স্থানীয় হস্তশিল্পীদের তৈরি সামগ্রীও বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়। জঙ্গল সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা শতাধিক মহিলা দীর্ঘদিন ধরে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের হাতে তৈরি পাটের সামগ্রী পর্যটকদের কাছে স্থানীয় সংস্কৃতি ও গ্রামীণ শিল্পের পরিচয় বহন করে। ছোট আকারের চাবির রিং থেকে শুরু করে মোবাইল রাখার কভার, ব্যাগ—বিভিন্ন ধরনের জিনিস তৈরি করেন তাঁরা।

কিন্তু সমস্যার জায়গা হল, দীর্ঘ সময় ধরে পণ্যের দাম কার্যত অপরিবর্তিত। বর্তমানে যে মোবাইল কভার বা ছোট ব্যাগ ৩০ টাকায় বিক্রি হয়, তার দাম প্রায় দুই দশক আগে নির্ধারিত হয়েছিল বলে দাবি মহিলাদের। অন্য দিকে, পাটের তৈরি চাবির রিংয়ের দাম মাত্র ১০ টাকা। এই দামে সামগ্রী বিক্রি করে তাঁদের হাতে যে অর্থ থাকে, তা দিয়ে সংসারে উল্লেখযোগ্য আর্থিক উন্নতি করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ।

মহিলাদের বক্তব্য, তাঁরা যে পাট-সহ বিভিন্ন কাঁচামাল ব্যবহার করেন, তার দাম আগের তুলনায় অনেকটাই বেড়েছে। উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য খরচও বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে তাঁদের তৈরি সামগ্রীর বিক্রয়মূল্য বাড়েনি। ফলে দিনের পর দিন একই দামে পণ্য বিক্রি করতে গিয়ে লাভের পরিমাণ কমছে। দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেও সেই কারণে প্রত্যাশিত আর্থিক স্বচ্ছলতা আসছে না তাঁদের জীবনে।

বর্তমানে অবশ্য গোরুমারার জঙ্গল পর্যটকদের জন্য বন্ধ রয়েছে। প্রতি বছর বর্ষার মরশুমে জঙ্গল বন্ধ রাখার নিয়ম অনুযায়ী এই সময় পর্যটকদের প্রবেশ বন্ধ। ফলে বনবস্তির মহিলাদের তৈরি পাটের সামগ্রী বিক্রির অন্যতম বড় বাজারও আপাতত বন্ধ। তবে জঙ্গল ফের খুললে পর্যটকদের ভিড় আবার বাড়বে। সেই সময় যাতে নতুন দামে তাঁদের তৈরি সামগ্রী বিক্রি করা যায়, তার জন্য এখন থেকেই উদ্যোগী হয়েছেন তাঁরা।

এই দাবিকে সামনে রেখে সম্প্রতি বন দপ্তরের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন মহিলারা। রামসাই এলাকার দু’টি এবং গোরুমারা দক্ষিণ রেঞ্জের দু’টি স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যরা যৌথ ভাবে তাঁদের দাবি জানিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। তাঁদের মূল দাবি, বর্তমানে ৩০ টাকা নির্ধারিত পাটের তৈরি মোবাইল কভার ও ব্যাগের দাম বাড়িয়ে ৫০ টাকা করা হোক। অর্থাৎ, প্রায় ২০ টাকা দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন তাঁরা।

মহিলাদের বক্তব্য, দাম বাড়ানোর দাবি কোনও অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়ার জন্য নয়। তাঁদের যুক্তি, দীর্ঘদিন ধরে একই দামে পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। অথচ কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তাঁদের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ফলে পুরনো দামে পণ্য বিক্রি করলে শ্রমের যথাযথ মূল্য মিলছে না। তাঁদের তৈরি সামগ্রীর দাম পুনর্নির্ধারণ করা হলে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলির আর্থিক পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হতে পারে বলে তাঁদের আশা।

এই দাবির সঙ্গে যুক্ত মহিলাদের মধ্যে সেলিমা খাতুন, মাম্পি বর্মন, অনিমা রায় এবং সুভদ্রা কোরা-সহ অনেকে একই সুরে নিজেদের সমস্যার কথা জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, বছরের পর বছর ধরে তাঁরা একই দামে পাটের সামগ্রী তৈরি ও বিক্রি করে আসছেন। এর মধ্যে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস থেকে কাঁচামাল—সব কিছুর দাম বেড়েছে। অথচ তাঁদের পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি হয়নি। ফলে এই হস্তশিল্পের মাধ্যমে পরিশ্রম করেও আর্থিক উন্নতির পথ খুব বেশি প্রশস্ত হচ্ছে না।

বনবস্তির মহিলাদের এই হস্তশিল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকার ইতিহাসও বেশ পুরনো। প্রায় ২০ বছর ধরে গোরুমারা এলাকার পর্যটনকেন্দ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে তাঁদের এই কাজের যোগ রয়েছে। জঙ্গলে বেড়াতে আসা পর্যটকদের কাছে স্থানীয় ভাবে তৈরি সামগ্রী বিক্রি করেই তাঁরা উপার্জন করেন। এর ফলে এক দিকে যেমন পর্যটকদের হাতে স্থানীয় শিল্প পৌঁছে যায়, তেমনই অন্য দিকে প্রত্যন্ত বনবস্তির মহিলাদের জন্য ঘরে বসে বা স্থানীয় এলাকায় কাজের সুযোগ তৈরি হয়।

তবে পর্যটনের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তাঁদের আয়ও অনেকটাই পর্যটকদের আনাগোনার উপর নির্ভর করে। জঙ্গল বন্ধ থাকলে বিক্রিও কমে যায়। আবার জঙ্গল খুললে পর্যটকদের ভিড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের তৈরি সামগ্রীর চাহিদা বাড়ে। তাই জঙ্গল খোলার আগেই পণ্যের নতুন দাম নির্ধারণ করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের আশা, পর্যটন মরশুম শুরু হওয়ার আগে সিদ্ধান্ত হয়ে গেলে নতুন দামে সামগ্রী বিক্রি করা সম্ভব হবে।

এই পুরো ব্যবস্থায় পণ্যের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে বন দপ্তরের ভূমিকা রয়েছে। সেই কারণেই মহিলারা সরাসরি বন দপ্তরের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন। তাঁদের দাবি, বর্তমান বাজারদর এবং উৎপাদন খরচ বিবেচনা করে পাটের সামগ্রীর মূল্য পুনর্নির্ধারণ করা হোক। শুধু পণ্যের দাম বাড়ানো নয়, দীর্ঘদিন ধরে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত মহিলাদের জীবিকা ও পরিশ্রমের বিষয়টিও প্রশাসন বিবেচনা করুক—এমনই আবেদন তাঁদের।

বিষয়টি নিয়ে বন দপ্তরের কোনও আধিকারিক প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে চাননি। তবে দপ্তর সূত্রে খবর, মহিলাদের তৈরি পাটের সামগ্রীর দাম বাড়ানো হবে কি না, সে বিষয়ে এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ফলে স্মারকলিপি দেওয়ার পর এখন প্রশাসনের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন বনবস্তির এই হস্তশিল্পীরা।

গোরুমারা জঙ্গল ফের পর্যটকদের জন্য খুললে আবার ব্যস্ত হয়ে উঠবে পর্যটনকেন্দ্রিক বাজার। সেই সময় পর্যটকদের হাতে নিজেদের তৈরি পণ্য তুলে দিয়ে নতুন দামে কতটা আয় করতে পারবেন, তা নির্ভর করছে বন দপ্তরের সিদ্ধান্তের উপর। দুই দশক ধরে এই কাজ করে আসা মহিলাদের আশা, এবার অন্তত তাঁদের পরিশ্রম এবং বাড়তে থাকা উৎপাদন খরচের কথা বিবেচনা করে সামগ্রীর দাম বাড়ানোর অনুমতি দেওয়া হবে।

তাঁদের কাছে ৩০ থেকে ৫০ টাকা হওয়া শুধু একটি পণ্যের দামের পরিবর্তন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের শ্রমের স্বীকৃতি, পরিবারের আর্থিক সুরক্ষা এবং প্রত্যন্ত এলাকার মহিলাদের স্বনির্ভর হয়ে ওঠার লড়াই। এখন গোরুমারার জঙ্গল খোলার আগে বন দপ্তর তাঁদের এই দাবিতে কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকেই নজর বনবস্তির শতাধিক মহিলা হস্তশিল্পীর।

No Comments

তাজা খবর

আরও পড়ুন

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved