Homeহাওড়াচিনির দাম খুঁজতে গিয়ে মিলল ওজনে গরমিল

চিনির দাম খুঁজতে গিয়ে মিলল ওজনে গরমিল

নিউজ ডেস্ক; এ যেন সত্যিই ‘কেঁচো খুঁড়তে কেউটে’। চিনি-সহ একাধিক নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম কেন হঠাৎ করে বাড়ছে, তার কারণ খুঁজতে
Screenshot 2026-08-26 122454

নিউজ ডেস্ক; এ যেন সত্যিই ‘কেঁচো খুঁড়তে কেউটে’। চিনি-সহ একাধিক নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম কেন হঠাৎ করে বাড়ছে, তার কারণ খুঁজতে গিয়ে হাওড়ার বিভিন্ন বাজারে উঠে এল অন্য এক অভিযোগ। দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি বহু ক্রেতার অভিযোগ, পণ্য কেনার সময় তাঁদের সঠিক ওজন দেওয়া হচ্ছে না। কোথাও এখনও ব্যবহার করা হচ্ছে পুরনো হাতপাল্লা। ফলে বাজারদর নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি এবার ওজনের কারচুপি রুখতেও নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

মঙ্গলবার হাওড়া সদর এবং হাওড়া গ্রামীণ এলাকার বিভিন্ন বাজার, দোকান ও গুদামে বিশেষ অভিযান চালায় এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চ (ইবি) এবং পুলিশ। কয়েকটি জায়গায় তাঁদের সঙ্গে ছিলেন খাদ্য দপ্তর ও জেলা মার্কেটিং দপ্তরের আধিকারিকরাও। মূলত খুচরো বাজারে চিনির দাম বৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধান, পণ্যের মজুত পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা এবং পাইকারি ও খুচরো দামের মধ্যে অস্বাভাবিক কোনও ফারাক রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করতেই এই অভিযান চালানো হয়।

অভিযানকারীরা বিভিন্ন বাজারে গিয়ে দোকান ও গোডাউনের স্টক পরীক্ষা করেন। ব্যবসায়ীরা কত দামে পণ্য কিনছেন এবং কত দামে তা বিক্রি করছেন, তার হিসাব খতিয়ে দেখা হয়। পাশাপাশি পণ্য মজুতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নথিপত্রও পরীক্ষা করেন আধিকারিকরা। কোনও ব্যবসায়ী অস্বাভাবিক পরিমাণে পণ্য মজুত করে কৃত্রিমভাবে বাজারে ঘাটতি তৈরি করছেন কি না, সেই বিষয়টিও নজরে রাখা হয়।

এ দিনের অভিযানে শুধু চিনিই নয়, আটা, ময়দা, বেসন, সুজি, আলু, পেঁয়াজ-সহ একাধিক নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম ও মজুতের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হয়। প্রশাসনের মূল উদ্দেশ্য, সরবরাহ ব্যবস্থায় কোথাও কোনও সমস্যা রয়েছে কি না এবং কোনও পণ্যের ক্ষেত্রে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো হচ্ছে কি না, তা চিহ্নিত করা।

অভিযানের দায়িত্বে থাকা এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চের আধিকারিক শ্রাবণী রায় জানান, খুচরো বাজারে চিনির দাম বেড়ে যাওয়ার খবর পাওয়ার পরই জনস্বার্থে এই নজরদারি শুরু করা হয়েছে। বিভিন্ন দোকান ও গুদামে গিয়ে পণ্য কত দামে কেনা হচ্ছে এবং কত দামে বিক্রি করা হচ্ছে, তা যাচাই করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা কতটা লাভ রেখে সাধারণ মানুষের কাছে পণ্য বিক্রি করছেন, সেটিও নজরে রাখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

তবে বাজারে গিয়ে আধিকারিকদের কাছে অন্য অভিযোগ জানান বহু ক্রেতা। তাঁদের বক্তব্য, বর্ষাকালে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়া নতুন কোনও ঘটনা নয়। আবহাওয়া, পরিবহণ ব্যবস্থা, সরবরাহ এবং চাহিদার ওঠানামার কারণে মরসুমভেদে দাম বাড়া-কমা করেই। কিন্তু সেই সুযোগে যেন ক্রেতাদের ওজনের ক্ষেত্রে ঠকানো না হয়, সে বিষয়ে প্রশাসনের নজরদারি আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

কদমতলা এলাকার বাসিন্দা রাজীব পাল নিয়মিত স্থানীয় বাজার থেকে আনাজ কেনেন। তাঁর বক্তব্য, পাইকারি বাজারে দাম ওঠানামা করলে খুচরো বাজারেও তার প্রভাব পড়ে। চাহিদা ও জোগানের উপরও পণ্যের দাম অনেকটাই নির্ভরশীল। কিন্তু ওজনের ক্ষেত্রে সাধারণ ক্রেতাদের যাতে প্রতারণার শিকার হতে না হয়, সে দিকে প্রশাসনের আরও নজর দেওয়া উচিত। মাছ, আনাজ-সহ বিভিন্ন বাজারে ব্যবহৃত ওজন মাপার যন্ত্র নিয়মিত পরীক্ষা করারও দাবি জানান তিনি।

ক্রেতাদের অভিযোগ পাওয়ার পর কয়েকটি দোকানে ব্যবহৃত ওজন মাপার যন্ত্র পরীক্ষা করেন ইবি-র আধিকারিকরা। বিশেষ করে এখনও কোথাও হাতপাল্লা ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেগুলিও দেখা হয়। যন্ত্রে কোনও ত্রুটি রয়েছে কি না বা ক্রেতাদের নির্ধারিত পরিমাণের তুলনায় কম পণ্য দেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রাথমিকভাবে নজরদারি চালানো হয়।

প্রশাসনের তরফে অবশ্য জানানো হয়েছে, কদমতলা বাজারে এ দিনের অভিযানে এখনও পর্যন্ত বড় ধরনের কোনও গরমিল ধরা পড়েনি। তবে তদন্ত বা নজরদারি এখানেই শেষ হচ্ছে না। আগামী এক সপ্তাহ হাওড়ার বিভিন্ন বাজারে একই ধরনের অভিযান চালানো হবে বলে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে। বাজারদর থেকে শুরু করে পণ্যের মজুত, সরবরাহ ব্যবস্থা, বিক্রয়মূল্য এবং ওজন—সব দিকেই নজর রাখা হবে।

এ দিন হাওড়া গ্রামীণ এলাকার একাধিক জায়গাতেও অভিযান চালানো হয়। উলুবেড়িয়ার নিমদিঘি এলাকার আনাজের বাজারে আধিকারিকরা পণ্যের দাম ও বিক্রির পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন। পাশাপাশি রাজাপুর থানার যদুরবেড়িয়া এলাকার একটি গুদাম এবং শ্যামপুর থানার খাডুবেড়িয়া এলাকায় একটি চিনির গোডাউনেও অভিযান চালানো হয়। সেখানে মজুত থাকা পণ্যের পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষা করেন আধিকারিকরা।

অভিযানে উপস্থিত ছিলেন হাওড়া গ্রামীণের পুলিশ সুপার অমিত ভার্মা, উলুবেড়িয়ার মহকুমাশাসক মানসকুমার মণ্ডল, উলুবেড়িয়ার এসডিপিও ঈশান সিনহা, বিডিও এবং সংশ্লিষ্ট থানার ওসিরা। জেলা মার্কেটিং এবং খাদ্য দপ্তরের আধিকারিকরাও অভিযানে অংশ নেন। ফলে বাজারদর ও মজুত সংক্রান্ত বিষয়টি শুধু পুলিশি নজরদারির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, প্রশাসনের একাধিক দপ্তরও সরাসরি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছে।

সরকারি আধিকারিকরা বিভিন্ন পাইকারি বাজার ও গুদামে গিয়ে মজুত থাকা পণ্যের হিসাব মিলিয়ে দেখেন। ব্যবসায়ীরা সংশ্লিষ্ট পণ্য কত দামে কিনেছেন এবং কত দামে তা বিক্রি করছেন, সে সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা হয়। একই সঙ্গে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে বাজারের বাস্তব পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেন তাঁরা।

হাওড়া গ্রামীণের পুলিশ সুপার অমিত ভার্মা জানান, মঙ্গলবার থেকেই এই বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। আগামী দিনগুলিতেও নিয়মিত নজরদারি চলবে। বাজারদরের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি দামে পণ্য বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

প্রশাসনের এই অভিযান মূলত সাধারণ মানুষের উপর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দামের চাপ কমানোর লক্ষ্যেই শুরু হয়েছে। তবে প্রথম দিনের অভিযানেই যে ওজনের কারচুপির মতো অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সামনে এল, তা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ বাজারে কোনও পণ্যের দাম কিছুটা বাড়লেও ক্রেতা যেন নির্ধারিত দামে নির্ধারিত পরিমাণ পণ্য পান, সেটিও নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব।

আগামী কয়েক দিন হাওড়ার বিভিন্ন বাজারে এই নজরদারি আরও বাড়ানো হবে। কোথাও মজুতদারি, কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো, অস্বাভাবিক লাভ বা ওজনে কারচুপি—কোনও ধরনের অনিয়ম ধরা পড়লে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে প্রশাসন। ফলে শুধু চিনির দাম নয়, গোটা বাজার ব্যবস্থার উপরই এখন নজর রাখতে শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলি।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved