Homeবিদেশহড়পা বানে ছারখার নেপাল, জোড়া রাজ্যে সতর্কতা,উদ্ধার ৮ মৃতদেহ

হড়পা বানে ছারখার নেপাল, জোড়া রাজ্যে সতর্কতা,উদ্ধার ৮ মৃতদেহ

1759655609_nepal

নিউজ ডেস্ক: বর্ষার মাঝপথেই প্রকৃতির রুদ্র রূপের সাক্ষী থাকল ওপার বাংলা তথা ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেপাল। তিব্বত সীমান্তবর্তী পার্বত্য অঞ্চলে আকস্মিক হড়পা বানের জেরে ভেসে গেল একাধিক গ্রাম, তছনছ হয়ে গেল একের পর এক পরিকাঠামো প্রকল্প। নেপালের পাহাড়ি নদীতে জলস্ফীতির মাত্রা এতটাই ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে যে, তার রেশ এসে পৌঁছেছে এপারেও। বিহার ও উত্তরপ্রদেশের গণ্ডক নদী অববাহিকায় চরম সতর্কতা জারি করেছে স্থানীয় প্রশাসন। প্রকৃতির এই তাণ্ডবে বড়সড় ক্ষয়ক্ষতি এবং প্রাণহানির আশঙ্কা করছে নেপাল সরকার। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতিমধ্যেই নামানো হয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীকে।

পাহাড় বেয়ে নামছে মৃত্যুর মিছিল, জলমগ্ন একের পর এক গ্রাম

স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সূত্রের খবর অনুযায়ী, নেপালের রাসুয়া জেলার পার্বত্য অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে সিয়াপ্রু বেসি এবং তিমুরে এলাকা পুরোপুরি জলমগ্ন। আচমকা তিব্বতীয় পার্বত্য এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ জল ধেয়ে আসায় ভোতে কোশী নদী মুহূর্তের মধ্যে ভয়ঙ্কর রূপ নেয়। স্থানীয় বাসিন্দারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই নদীর খরস্রোতা জল ঢুকে পড়ে বসতি এলাকায়। চোখের নিমেষে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট এবং নির্মাণাধীন একাধিক পরিকাঠামো প্রকল্প জলের তলায় তলিয়ে যায়।

রাসুয়া জেলার প্রধান জেলা প্রশাসক নরেন্দ্র পারিয়ার এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, “যে মাত্রায় হড়পা বান এসেছে, তাতে বেশ কয়েকটি গ্রাম যে সম্পূর্ণ ভেসে গিয়েছে তা নিশ্চিত। পরিকাঠামো নির্মাণের কাজে যুক্ত থাকা একাধিক যন্ত্রপাতি ও শিবির ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে। তবে দুর্গম পাহাড়ি পথ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কারণে এই মুহূর্তে ঠিক কতটা প্রাণহানি ঘটেছে বা সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি কতখানি হয়েছে, তার নিখুঁত হিসাব দেওয়া সম্ভব নয়। বড় মাপের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।”

রেসকিউ অপারেশনে সেনা, প্রধানমন্ত্রী দিলেন কড়া নির্দেশ

নেপালের এই চরম বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে উদ্ধারকাজে কোনো খামতি রাখতে চাইছে না দেশের শীর্ষ প্রশাসন। নেপালের প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং উদ্ধার এবং ত্রাণকাজের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করছেন। তিনি জানিয়েছেন, ইতিমধ্যেই বন্যাকবলিত দুর্গম এলাকাগুলোতে একাধিক রেসকিউ টিম পাঠানো হয়েছে। পুলিশ, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী (APF) এবং নেপাল সেনাকে একযোগে উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রশাসনের তরফে ভোতে কোশী এবং তার শাখা নদীগুলোর তীরবর্তী এলাকায় রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। নদীর নিম্ন অববাহিকায় বসবাসকারী সমস্ত মানুষকে অবিলম্বে নিরাপদ এবং উঁচু জায়গায় সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। সরকারের তরফে জারি করা জরুরি বুলেটিনে বলা হয়েছে, পাহাড়ি ধস এবং নদীর জলস্তর আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তাই পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কাউকেই যেন নদীর কাছাকাছি ঘেঁষতে না দেওয়া হয়।

ভারতের ওপর কতটা প্রভাব? কপালে ভাঁজ বিহার-উত্তরপ্রদেশের

নেপালের এই বিপর্যয়ে ঘুম উড়েছে ভারতের সীমান্তবর্তী দুই রাজ্যের। ভূগোল অনুযায়ী, নেপালের ভোতে কোশী নদীর উৎপত্তি তিব্বতের মালভূমি অঞ্চলে। সেখান থেকে প্রবাহিত হয়ে নদীটি নেপালের অভ্যন্তরে ত্রিশূলী নদীর সঙ্গে মিশেছে। এই ত্রিশূলী নদীই পরবর্তীতে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে ‘গণ্ডক’ নদী নামে।

ফলে ভোতে কোশী নদীতে বিপুল পরিমাণ জল বাড়লে বা হিমবাহ নিঃসৃত অতিরিক্ত জল চলে এলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে ভারতের উত্তরপ্রদেশ এবং বিহারের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে। ইতিমধ্যেই গণ্ডক নদীর জলস্তর দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। বিহারের পশ্চিম চম্পারণ, গোপালগঞ্জ, সরন এবং উত্তরপ্রদেশের কুশীনগর ও মহারাজগঞ্জের নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোতে বন্যা সতর্কবার্তা জারি করেছে স্থানীয় প্রশাসন। দুই রাজ্যের নদী কমিশন ও বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরকে ২৪ ঘণ্টা প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। বাঁধগুলোর পরিস্থিতি প্রতি মুহূর্তে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

অতীতেও একই ট্র্যাজেডি: স্মৃতি ফেরাল তিব্বতের বরফধস

নেপালের ভোতে কোশী নদীতে প্রকৃতির এমন তাণ্ডব অবশ্য নতুন নয়। পাহাড়ি এই নদীর ভয়ঙ্কর রূপ এর আগেও বহুবার দেখেছে নেপালবাসী। গত বছরের স্মৃতি এখনো এই এলাকার মানুষের মনে টাটকা। গত বছর ঠিক একই সময়ে ভোতে কোশী নদীর প্রবল বন্যায় কমপক্ষে ৯ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন এবং প্রায় ২৪ জন মানুষ নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন। সেবার নেপাল ও চীনের মধ্যে সংযোগকারী ঐতিহাসিক ‘ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ’ বা মৈত্রী সেতু জলের তোড়ে সম্পূর্ণ ভেসে যায়। এর ফলে টানা কয়েক মাস দুটি দেশের মধ্যে স্থলপথে বাণিজ্য ও পরিবহন ব্যবস্থা স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল, যার প্রভাব পড়েছিল সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতেও।

আন্তর্জাতিক পরিবেশবিদ ও আঞ্চলিক জলবায়ু পর্যবেক্ষকদের মতে, এই অঞ্চলে বারংবার আকস্মিক বন্যার মূল কারণ হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলের ক্রমাগত উষ্ণায়ন। গত বছর তিব্বত অংশে থাকা একটি ‘গ্লেসিয়াল লেক’ বা হিমবাহ-উপরিস্থ হ্রদের বাঁধ ভেঙে (GLOF – Glacial Lake Outburst Flood) বিপুল জলরাশি ভোতে কোশীতে এসে পড়েছিল। আবহাওয়াবিদদের প্রাথমিক অনুমান, এ বছরেও অতিবৃষ্টির সঙ্গে তিব্বতের পার্বত্য এলাকায় বরফ গলার গতি বৃদ্ধি পাওয়াতেই ভোতে কোশী নদী এভাবে আচমকা রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছে। পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলছেন, বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব যেভাবে হিমালয়ের ওপর পড়ছে, তাতে আগামী দিনে এ ধরনের হড়পা বান ও দুর্যোগের মাত্রা আরও বাড়বে।

বর্তমানে নেপাল প্রশাসনের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো বন্যাকবলিত এলাকা থেকে মানুষজনকে জীবিত উদ্ধার করা এবং তাঁদের খাদ্য ও সুপেয় জলের সংস্থান করা। তবে পাহাড়ি প্রতিকূল আবহাওয়া এবং অবিরাম বৃষ্টির কারণে হেলিকপ্টার মারফতে ত্রাণ পৌঁছানোর কাজে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন নজর গোটা দক্ষিণ এশিয়ার।

No Comments

    একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

    LINKS

    ABOUT US

    ফোন নম্বর

    +৯১ ৮৪২০৬৫৮৯৯৯

    আমাদের ঠিকানা

    আর্চ স্কোয়ার X2 বিল্ডিং
    কলেজ মোড়, সেক্টর ৫
    কলকাতা - ৭০০০৯১

    Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved