Last updated: August 26th, 2026 at 01:30 pm

নিউজ ডেস্ক: দিল্লি ও কলকাতার রাজনৈতিক অলিন্দে এখন একটাই চর্চা— লোকসভার পর কি তবে এবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভাতেও আড়াআড়ি ভাঙন স্পষ্ট হতে চলেছে? সংসদীয় গণতন্ত্র এবং দলত্যাগ-বিরোধী আইনের আইনি ও রাজনৈতিক সমীকরণ ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে পারদ চরম চড়েছে। একদিকে যখন শীর্ষ আদালত বিদ্রোহী দলত্যাগী সাংসদদের কাছ থেকে সুস্পষ্ট উত্তর তলব করেছে, ঠিক তখনই সংসদের বাইরে এবং ভেতরে শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে তীব্র বাগ্যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তন থেকে। বিধানসভা নির্বাচনে জোড়াফুল শিবিরের বিপর্যয় ও ভরাডুবির পর ঘাসফুল শিবিরের অন্দরে যে অসন্তোষের সলতে পাকানো হচ্ছিল, তা অবশেষে লোকসভায় বিরাট ধসের আকার ধারণ করে। তৃণমূলের টিকিটে লোকসভায় জয়ী হয়ে আসা জ্যষ্ঠ নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, বর্ষীয়ান সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার-সহ মোট ২০ জন লোকসভা সদস্য মূল দল থেকে আলাদা হয়ে ‘ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস অফ ইন্ডিয়া’ বা এনসিপিআই (NCPI)-এর সঙ্গে নিজেদের সংযুক্ত বা মার্জ করার কথা ঘোষণা করেন। শুধু তা-ই নয়, লোকসভার এই বড় অংশটি একযোগে কেন্দ্রে শাসকদল এনডিএ (NDA)-কে সমর্থন জানিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে নাটকীয় মোড় এনে দেয়।
স্বাভাবিকভাবেই দলের এই সিদ্ধান্তকে মেনে নেয়নি কালীঘাটের শীর্ষ নেতৃত্ব। তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তৎক্ষণাৎ এই দলত্যাগী ২০ জন সাংসদের পদ বাতিলের দাবিতে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার দ্বারস্থ হন। সংবিধানের দশম তফসিল বা দলত্যাগ-বিরোধী আইন প্রয়োগ করে দ্রুত পদক্ষেপের আর্জি জানানো হয়। কালীঘাট তৃণমূলের আইন বিশেষজ্ঞদের দাবি, এ জাতীয় আবেদনের ক্ষেত্রে নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে স্পিকারকে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরও স্পিকারের দফতর থেকে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা কড়া পদক্ষেপ না আসায়, শেষমেশ সুবিচারের আশায় সুপ্রিম কোর্টের দরজায় কড়া নাড়েন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
মঙ্গলবার দেশের শীর্ষ আদালতে এই গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার ডিভিশন বেঞ্চ মামলাটির প্রাথমিক পর্যালোচনা করে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ জারি করেছে। শীর্ষ আদালতের বেঞ্চ থেকে বিদ্রোহী ২০ জন এনসিপিআই সাংসদের উদ্দেশ্যেই নোটিস জারি করা হয়েছে এবং তাঁদের কাছ থেকে এই সংযুক্তিকরণ ও দলত্যাগের স্বপক্ষে লিখিত বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের এই পদক্ষেপে স্বাভাবিকভাবেই একপ্রকার ব্যাকফুটে চলে গিয়েছে বিদ্রোহী শিবির, এমনটাই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
অন্যান্য দিকে, আদালতের আইনি চাপ বৃদ্ধির পাশাপাশি লোকসভা সচিবালয়ও এবার নড়েচড়ে বসেছে। দলত্যাগ-বিরোধী আইনের ভিত্তিতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পেশ করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে লোকসভার সচিবালয় থেকে ওই ২০ জন সাংসদকে পৃথক নোটিস পাঠানো হয়েছে। তাঁদের পরিষ্কার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আগামী ৭ দিনের মধ্যে এই নোটিসের লিখিত উত্তর বা কৈফিয়ত পেশ করতে হবে। একসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট ও লোকসভা সচিবালয়ের জোড়া আইনি নোটিসের মুখে পড়ে রাজ্য রাজনীতির এই মেগা ভাঙন এখন চরম আইনি দোলাচলের মুখোমুখি।
তবে লড়াই শুধু দেশের রাজধানী দিল্লিতেই সীমাবদ্ধ নেই, তার সরাসরি তরঙ্গ এসে পড়েছে রাজ্য রাজনীতি ও কলকাতার বিধানসভাতেও। সুপ্রিম কোর্টের নোটিস জারির খবর প্রকাশ্যে আসতেই কালীঘাট শিবিরের প্রবীণ ও আগ্রাসী সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় তোপ দাগেন জোড়াফুল ছেড়ে যাওয়া শিবিরের বিরুদ্ধে। মহারাষ্ট্রের শিণ্ডে বনাম ঠাকরে শিবিরের ঐতিহাসিক আইনি লড়াইয়ের উদাহরণ টেনে কল্যাণবাবু মন্তব্য করেন, “আমাদের দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল কাঠামোটাকেই সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিতে চাইছে বর্তমান কেন্দ্রীয় শাসকদল। কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ আদালত সংবিধান রক্ষায় অত্যন্ত সজাগ। সুপ্রিম কোর্টও পুরো বিষয়টা উপলব্ধি করতে পেরেছে। এত বড় একটা বেআইনি এবং নিয়মবিরুদ্ধ কাজ হয়েছে যে আদালতও বুঝছে এর গভীরে কী রয়েছে।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, “স্পিকার পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না, অথচ লোকসভায় আমাদের আসল সাংসদদের পেছনের সারিতে ঠেলে দিয়ে ওই দলত্যাগীদের সামনের সারির আসন বরাদ্দ করে দেওয়া হয়েছে। তবে এবার নোটিসের উত্তর তো দিতেই হবে, স্পিকারকেও সিদ্ধান্ত জানাতে হবে। এবার সব পরিষ্কার হবে।” শুধু লোকসভায় থেমে না থেকে বিধানসভা নিয়েও চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি ছুড়ে দিয়ে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় সংযোজন করেন, “আমরা সংসদ দিয়ে আইনি লড়াই শুরু করেছি, এরপর এর রেশ গিয়ে পৌঁছাবে বিধানসভাতেও। এবার আমরা বিধানসভাতেও দেখছি ওদের। এত বড় লোভ কিসের? ওই চামচাগিরি এবার ছাড়িয়ে ছাড়ব!”
অন্যদিকে, লোকসভার মতোই রাজ্য বিধানসভাতেও এখন জোড়াফুল দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে— ‘কালীঘাট তৃণমূল’ এবং ‘ঋতব্রত তৃণমূল’। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বড় অংশের মতে, জাতীয় স্তরে এনসিপিআই-এর মতো রাজ্যে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন নতুন তৃণমূল শিবিরটিও আসলে বিজেপি ঘেঁষা অবস্থান গ্রহণ করেছে। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই চাঁচাছোলা আক্রমণ ও হুমকির কড়া জবাব দিয়েছে ঋতব্রত অনুগামী নতুন তৃণমূল শিবির। তাঁদের দাবি, দলের মূল আদর্শ ও কর্মীদের আসল আবেগ ধারণ করছেন তারাই, ফলে তাঁদেরই ‘আসল তৃণমূল’ হিসেবে গণ্য করা উচিত। কোনো হুমকিতে তাঁরা পিছপা হবেন না বলেও পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন দলটির নেতারা।
সব মিলিয়ে, সুপ্রিম কোর্টের এই নতুন নোটিস এবং লোকসভা সচিবালয়ের সাত দিনের সময়সীমা জারি হওয়ায় রাজ্যের রাজনৈতিক তাপমাত্রা এক ধাক্কায় অনেকটা বেড়ে গেল। সংসদ থেকে শুরু হওয়া এই আইনি ও রাজনৈতিক যুদ্ধ খুব শিগগিরই যে কলকাতার বিধানসভার অলিন্দেও ছড়িয়ে পড়তে চলেছে, তার স্পষ্ট সংকেত দিয়ে রাখল মঙ্গলবারের এই ঘটনাপ্রবাহ।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments