Homeপশ্চিম মেদিনীপুরবন ছেড়ে লোকালয়ে হাতির দল! দক্ষিণবঙ্গে তীব্র মানুষ-হাতি সংঘাত, চরম আর্থিক ক্ষতি

বন ছেড়ে লোকালয়ে হাতির দল! দক্ষিণবঙ্গে তীব্র মানুষ-হাতি সংঘাত, চরম আর্থিক ক্ষতি

নিউজ ডেস্ক: অরণ্যের নিস্তব্ধতা চিরে যখন অন্ধকার নেমে আসে, তখন থেকেই শুরু হয় এক অদৃশ্য আতঙ্ক। জঙ্গলমহলের চিরপরিচিত গাছপালার ফাঁক
Screenshot 2026-08-26 131655

নিউজ ডেস্ক: অরণ্যের নিস্তব্ধতা চিরে যখন অন্ধকার নেমে আসে, তখন থেকেই শুরু হয় এক অদৃশ্য আতঙ্ক। জঙ্গলমহলের চিরপরিচিত গাছপালার ফাঁক দিয়ে নেমে আসা বিশালকায় শরীরগুলো এখন আর কেবল বন্যপ্রাণের প্রতীক নয়, গ্রামবাসীর কাছে তা এক নিরবচ্ছিন্ন দুঃস্বপ্নের নাম। দক্ষিণবঙ্গের অরণ্যে যুগের পর যুগ ধরে বসবাস করতে করতে হাতির জীবনযাত্রা এবং স্বভাবগত আচরণে এসেছে আমূল পরিবর্তন। বদলে গিয়েছে তাদের চিরাচরিত খাদ্যাভ্যাসও। বনের প্রাকৃতিক খাবারের অভাব এবং লোকালয়ের সহজে লভ্য সুস্বাদু শস্যের টানে হাতির এই গতিপথ পরিবর্তন কার্যত ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকার জনজীবন ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে। তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে মানুষ ও হাতির সংঘাত, যার মাশুল দিতে হচ্ছে দুই পক্ষকেই।

বিশেষজ্ঞ ও বন্যপ্রাণ গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির শারীরিক পুষ্টি ও শক্তির জন্য প্রতিদিন গড়ে এক থেকে দেড় কুইন্টাল পর্যন্ত খাবারের প্রয়োজন হয়। বর্তমানে দক্ষিণবঙ্গের অরণ্যাঞ্চলে প্রায় ১৮০ থেকে ১৯০টি হাতির অবাধ বিচরণ রয়েছে। সহজ গাণিতিক হিসাবেই পরিষ্কার, এই বিপুল সংখক হাতির দৈনিক খাদ্যের চাহিদা ঠিক কতটা বিপুল। অথচ দক্ষিণবঙ্গের অরণ্য উত্তরবঙ্গের মতো ততটা গভীর বা বিস্তৃত নয়, কিংবা হাতিদের এই বিশাল খাদ্যের জোগান দেওয়ার উপযোগীও নয়। অরণ্যের স্বাভাবিক খাদ্যশৃঙ্খলে ঘাটতি দেখা দেওয়ায় বাধ্য হয়েই রাতের অন্ধকারে জঙ্গল ছেড়ে লোকালয়ের দিকে পা বাড়ায় হাতির পাল।

কৃষিপ্রধান জঙ্গলমহলে মাটির গন্ধ পেলেই হাতিরা হানা দেয় মাঠের পর মাঠে। ধান, তিল, আলু থেকে শুরু করে হরেক রকমের মরশুমি আনাজ— শুধু খেয়েই ক্ষান্ত হয় না গজরাজ, বিশাল পায়ে মাড়িয়ে নষ্ট করে দেয় বিঘা বিঘা জমির ফসল। মাঠ পেরিয়ে সেই খাবারের খোঁজ মাঝরাতে আছড়ে পড়ে গ্রামের কাঁচা-পাকা বসতবাড়িতে। ধান বা শস্যের গন্ধ শুঙে হাতির দল গুঁড়িয়ে দেয় মাটির দেওয়াল, ভেঙে ফেলে ঘরবাড়ি। আর এই আচমকা হানার মুখোমুখি পড়ে প্রাণ হারাচ্ছেন অস সতর্ক সাধারণ মানুষ।

মেদিনীপুরের মৃতরাজা নরেন্দ্রলাল খান মহিলা মহাবিদ্যালয়ের ভূগোলের অধ্যাপক প্রভাতকুমার শীট দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়ের উপর বিস্তৃত গবেষণা চালিয়ে আসছেন। তাঁর সংগৃহীত ঐতিহাসিক ও সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে এই সংকটের ভয়াবহ রূপটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অধ্যাপক শীটের গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যবর্তী সময়ে দক্ষিণবঙ্গে হাতির হানায় মোট ১১৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল। সেই সময়ে শস্যহানি ও সম্পত্তি ধ্বংসের কারণে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল প্রায় ১৫৯.৯৯ লক্ষ টাকা। একই সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মানুষের হাতে অথবা মানবঘটিত কারণে ১২ থেকে ১৫টি হাতির মৃত্যু ঘটেছিল।

তবে সময় যত গড়িয়েছে, এই সংঘাতের মাত্রা ততই আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৫ সালের সরকারি ও গবেষণার তথ্যে দেখা যায়, মাত্র এক বছরেই দক্ষিণবঙ্গে হাতির আক্রমণে ৭১ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ২০১৬ সালেও অকালে প্রাণ হারান ১৮ জন। বন দপ্তরের বর্তমান পরিসংখ্যান বলছে, দক্ষিণবঙ্গে প্রতি বছর হাতির হানায় গড়ে ৩১ থেকে ৫০ জন সাধারণ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। কেবল প্রাণহানিই নয়, প্রতি বছর প্রায় ২১০০ থেকে ২৫০০ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে চরম দুর্দশার মুখে পড়ছেন প্রায় চার থেকে ছয় হাজার কৃষক ও সাধারণ গ্রামীণ পরিবার। ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে প্রায় ১৫০০ থেকে ২০০০টি ঘরবাড়ি।

সংঘাতের এই নির্মম খেলায় রেহাই পাচ্ছে না বন্যপ্রাণও। একদিকে যেমন মানুষের প্রাণ যাচ্ছে, অন্যদিকে অকালে প্রাণ হারাচ্ছে অরণ্যের এই রক্ষকরাও। পরিসংখ্যানে প্রকাশ, দক্ষিণবঙ্গে প্রতি বছর গড়ে ১৫ থেকে ২০টি হাতির মৃত্যু হয়। ২০১৯ থেকে ২০২৪— এই পাঁচ বছরের সংক্ষিপ্ত সময়সীমার মধ্যেই অকালে প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ১১৬টি হাতি। এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর পেছনে কখনও কাজ করেছে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া বা রেল দুর্ঘটনার মতো মর্মান্তিক ঘটনা, আবার কখনও মানুষ-হাতির মুখোমুখি সংঘাতের চরম পরিণতি।

কিন্তু কেন দিন দিন এত তীব্র হয়ে উঠছে এই লড়াই? গবেষকরা জানাচ্ছেন, দক্ষিণবঙ্গের বহু হাতি এখন আর পরিযায়ী নয়, তারা একপ্রকার ‘রেসিডেনশিয়াল’ বা স্থায়ী বাসিন্দায় পরিণত হয়েছে। জঙ্গল ছেড়ে তারা লোকালয়ের সহজ লভ্য খাবারেই বেশি অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। মাঠে রাখা পাকা ধান, নতুন বীজতলা, তিল কিংবা আলুর লোভ এড়ানো তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।

অন্যদিকে, এই সংঘাতের পরোক্ষ প্রভাব পড়ছে আদিবাসী ও জঙ্গলনির্ভর মানুষের জীবিকায়। অতীতে বনের পারিপার্শ্বিক সম্পদই ছিল স্থানীয় মানুষের আয়ের মূল উৎস। কিন্তু বর্তমানে জঙ্গলে হাতির উপস্থিতি ও আতঙ্কের কারণে সাধারণ মানুষ শালপাতা, জ্বালানি কাঠ কিংবা মহুয়া ফুল সংগ্রহ করতে বনে যেতে ভয় পাচ্ছেন। বর্ষার সময়ে অত্যন্ত লাভজনক খাদ্য উপাদান ‘ছাতু’ (মাশরুম) তুলতেও অরণ্যে ঢোকার সাহস পাচ্ছেন না গ্রামবাসী।

এর বাইরেও রয়েছে এক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট। জঙ্গলমহলের আদিবাসী সমাজের সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে হাঁড়িয়া ও মহুয়া থেকে তৈরি ঐতিহ্যবাহী প্রথাগত পানীয়। চাল পচানো হাঁড়িয়া বা মহুয়ার তীব্র মিষ্টি গন্ধ হাতির ঘ্রাণেন্দ্রিয়কে প্রবলভাবে আকৃষ্ট করে। লোকালয়ে প্রবেশ করে হাতির দল স্রেফ এই পানীয়ের গন্ধে ঘরের চাল ও মাটির দেওয়াল ভেঙে ভেতরে ঢোকে এবং হাঁড়ি-কলসি উল্টে তা পান করে, নষ্ট করে দেয় পরিবারের সঞ্চিত খাদ্যসামগ্রী। একদিকে ফসল নষ্ট হয়ে কমছে বার্ষিক আয়, অন্যদিকে সংসারের সঞ্চয় ধ্বংস হওয়ায় ক্ষোভ ও আতঙ্ক গ্রাস করছে জঙ্গলমহলকে।

অধ্যাপক প্রভাতকুমার শীট মনে করেন, এই মানব-হাতী সংঘাতকে কেবল প্রাণহানি বা আর্থিক ক্ষতির নিছক পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে। তাঁর মতে, “মানুষ-হাতির সংঘাতকে শুধুমাত্র কতজন মারা গেলেন বা কত টাকার ফসল নষ্ট হলো, সেই সমীকরণে দেখলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো যাবে না। এর অন্তরালে জড়িয়ে রয়েছে স্থানীয় মানুষজনের দীর্ঘমেয়াদী মানসিক স্বাস্থ্য, ভঙ্গুর জীবিকা এবং সামাজিক নিরাপত্তার মারাত্মক মৌলিক প্রশ্নাবলি।” দিনের পর দিন আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করা, এক রাতে অর্জিত ফসল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া এবং জীবিকার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে জঙ্গলমহলে তৈরি হচ্ছে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়, যার দ্রুত ও স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved