
নিউজ ডেস্ক; প্যাংগং লেক পেরিয়ে আরও কিছুটা এগোলেই ভারতের সীমান্তবর্তী শেষ গ্রাম। সেই গ্রাম থেকে কয়েক কিলোমিটার এগোলেই পাহাড়ের মাথায় ভারতীয় সেনার শেষ ছাউনি। তারপর শুরু দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল। চারদিকে বরফে ঢাকা সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্গের সারি। সেই দুর্গম পর্বতসারির মধ্যেই মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে চ্যাং চেনমো শৃঙ্গ। এখনও পর্যন্ত কোনও পর্বতারোহীর পা পড়েনি এই অজেয় শৃঙ্গে। এবার সেই অজেয় শৃঙ্গের চূড়ায় ভারতের পতাকা ওড়ানোর লক্ষ্যেই অভিযানে বেরিয়ে পড়েছে সোনারপুরের ১৫ সদস্যের একটি পর্বতারোহী দল।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুর থেকে মঙ্গলবার চ্যাং চেনমো শৃঙ্গ জয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছেন ১৫ জন সদস্যের এই বিশেষ দল। দুর্গম ও এখনও পর্যন্ত অনাবিষ্কৃত এই শৃঙ্গে আরোহণের লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছে তাঁদের দীর্ঘ প্রস্তুতি ও অভিযান। অভিযাত্রীদের সামনে রয়েছে কঠিন আবহাওয়া, তীব্র ঠান্ডা, বরফে ঢাকা দুর্গম পথ এবং অক্সিজেনের স্বল্পতার মতো একাধিক চ্যালেঞ্জ।
অভিযানের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় সোমবার সোনারপুরে আয়োজিত একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। সোনারপুর আরোহী, Cafe Positive এবং Citizens for Social Justice-এর উদ্যোগে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে উপস্থিত ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি অরিন্দম মুখোপাধ্যায়, Café Positive-এর প্রতিষ্ঠাতা ডা. কল্লোল ঘোষ, Citizens for Social Justice-এর অ্যাডভোকেট অরিন্দম দাস, বিশিষ্ট পর্বতারোহী সত্যরূপ সিদ্ধান্ত এবং এভারেস্টজয়ী রুদ্রপ্রসাদ হালদার-সহ একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি।
অনুষ্ঠানে অভিযাত্রীদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি তাঁদের সাফল্য কামনা করা হয়। দীর্ঘদিনের প্রস্তুতির পর এই অভিযানে অংশ নিচ্ছেন দলের সদস্যরা। তাঁদের লক্ষ্য শুধু একটি দুর্গম শৃঙ্গের চূড়ায় পৌঁছনো নয়, বরং এমন একটি পর্বতশৃঙ্গে আরোহণের ইতিহাস তৈরি করা, যেখানে এখনও পর্যন্ত কোনও পর্বতারোহী পৌঁছতে পারেননি।
চ্যাং চেনমো শৃঙ্গের অবস্থানই এই অভিযানের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। প্যাংগং লেকের কাছাকাছি সীমান্তবর্তী অত্যন্ত দুর্গম এলাকায় অবস্থিত এই শৃঙ্গে পৌঁছনোর পথ সহজ নয়। সীমান্তের শেষ গ্রাম অতিক্রম করার পর পাহাড়ি পথে এগিয়ে যেতে হয়। তার পর রয়েছে ভারতীয় সেনার শেষ ছাউনি। সেখান থেকে আরও দুর্গম এলাকায় প্রবেশ করতে হবে অভিযাত্রীদের।
এই অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থানও অত্যন্ত কঠিন। উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায়। তার উপর বরফে ঢাকা পাহাড়ি পথ, হিমেল হাওয়া এবং দ্রুত বদলে যাওয়া আবহাওয়া অভিযাত্রীদের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ফলে শৃঙ্গ জয়ের পাশাপাশি প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পর্বতারোহণের ক্ষেত্রে কোনও ‘ভার্জিন পিক’ বা এখনও পর্যন্ত জয় না হওয়া শৃঙ্গে প্রথমবার আরোহণ একটি বিশেষ মর্যাদার বিষয়। কারণ পরিচিত কোনও রুট ধরে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। সম্ভাব্য পথ নির্বাচন, আবহাওয়ার পরিস্থিতি বিচার, বরফের গঠন এবং পাহাড়ের প্রকৃতি বুঝে এগোতে হয়। চ্যাং চেনমো অভিযানের ক্ষেত্রেও সেই চ্যালেঞ্জই অপেক্ষা করছে ১৫ সদস্যের দলের সামনে।
সোনারপুরের এই অভিযানের সঙ্গে যুক্ত উদ্যোক্তাদের আশা, এই অভিযান নতুন প্রজন্মের মধ্যে পর্বতারোহণের প্রতি আগ্রহ তৈরি করবে। একই সঙ্গে দুর্গম হিমালয় সম্পর্কে মানুষের আগ্রহও বাড়বে। শুধুমাত্র পর্যটন নয়, পর্বতারোহণের মতো কঠিন ও শৃঙ্খলাবদ্ধ অভিযানের মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে সাহস, দলগত কাজ এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করার মানসিকতা তৈরি করা সম্ভব বলেও মনে করছেন আয়োজকেরা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশিষ্ট পর্বতারোহীরাও অভিযাত্রীদের সঙ্গে নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন। বিশেষ করে এভারেস্টজয়ীদের অভিজ্ঞতা নতুন অভিযাত্রীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। পাহাড়ে ওঠার ক্ষেত্রে শারীরিক সক্ষমতার পাশাপাশি মানসিক দৃঢ়তা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কতটা জরুরি, সেই বার্তাও উঠে আসে অনুষ্ঠানে।
মঙ্গলবার সোনারপুর থেকে যাত্রা শুরু করার পর এখন অভিযাত্রীদের সামনে এক দীর্ঘ পথ। শেষ পর্যন্ত চ্যাং চেনমোর দুর্গম শৃঙ্গের চূড়ায় তাঁরা পৌঁছতে পারেন কি না, সেই দিকেই নজর থাকবে পর্বতারোহণপ্রেমীদের। তবে এই অভিযান ইতিমধ্যেই একটি বিশেষ তাৎপর্য তৈরি করেছে। কারণ যে শৃঙ্গে এখনও পর্যন্ত কোনও পর্বতারোহীর পদচিহ্ন পড়েনি, সেই শৃঙ্গের দিকে এবার এগিয়ে চলেছে বাংলার ১৫ সদস্যের একটি দল।
সাফল্যের জন্য প্রয়োজন অনুকূল আবহাওয়া, সঠিক পরিকল্পনা এবং প্রতিটি মুহূর্তে সতর্কতা। অভিযান যত এগোবে, ততই কঠিন হবে পথ। আর সেই কঠিন পথ পেরিয়ে যদি চ্যাং চেনমোর শীর্ষে পৌঁছতে পারেন সোনারপুরের এই অভিযাত্রীরা, তাহলে তা শুধু তাঁদের ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বাংলার পর্বতারোহণের ইতিহাসেও একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments