
নিউজ ডেস্ক:
মঙ্গলাহাটে তোলাবাজির অভিযোগের তদন্তে হাওড়ার প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলার শৈলেশ রাইকে গ্রেফতার করল হাওড়া সিটি পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। পুলিশ সূত্রে খবর, হাওড়া পুরনিগমের ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের প্রাক্তন কাউন্সিলারকে উত্তরপ্রদেশের গাজিপুর থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, মঙ্গলাহাটের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তোলাবাজির অভিযোগের তদন্ত করতে গিয়ে শৈলেশ রাইয়ের নাম সামনে আসে। এরপর থেকেই তাঁর সন্ধানে তল্লাশি শুরু হয়েছিল।
শৈলেশ রাই হাওড়ার রাজনীতিতে পরিচিত মুখ। এক সময় তিনি হাওড়া পুরসভার ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার ছিলেন এবং এলাকায় তৃণমূলের সঙ্গে যুক্ত নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা হাওড়ার রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ নেতা অরূপ রায়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবেও তাঁর পরিচিতি রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক গ্রেফতারের ঘটনায় সেই পুরনো রাজনৈতিক পরিচিতিও ফের আলোচনায় এসেছে।
পুলিশের দাবি, মঙ্গলাহাটে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বেআইনি ভাবে টাকা আদায়ের অভিযোগের তদন্ত চলাকালীন শৈলেশ রাইয়ের নাম উঠে আসে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে তদন্তকারীরা তাঁর গতিবিধি সম্পর্কে খোঁজখবর শুরু করেন। কিন্তু সেই সময় তিনি হাওড়ায় ছিলেন না বলেই তদন্তকারীদের কাছে তথ্য আসে। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে হাওড়া সিটি পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের একটি দল উত্তরপ্রদেশের গাজিপুরে পৌঁছয়। সেখানেই তাঁর দেশের বাড়ির সন্ধান মেলে বলে পুলিশ সূত্রে খবর।
এর পর অভিযানে গিয়ে শৈলেশ রাইকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর তাঁকে স্থানীয় আদালতে পেশ করা হয়। তাঁকে হাওড়ায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চায় হাওড়া পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। সেই কারণে ট্রানজিট রিমান্ডের আবেদন করা হয়। আদালতের অনুমতি পাওয়ার পর তাঁকে হাওড়ায় নিয়ে আসার প্রক্রিয়া শুরু হয়। শুক্রবার তাঁকে হাওড়া আদালতে পেশ করার কথা রয়েছে বলে তদন্তকারীদের সূত্রে জানা গিয়েছে।
মঙ্গলাহাট হাওড়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। দীর্ঘদিন ধরেই এই বাজারে বিপুল সংখ্যক ব্যবসায়ী ও শ্রমিকের আনাগোনা। ফলে সেখানে তোলাবাজি বা জোর করে টাকা আদায়ের মতো অভিযোগ সামনে এলে তা নিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই চাঞ্চল্য তৈরি হয়। পুলিশের বর্তমান তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, অভিযোগের ধরন ঠিক কী, কার কাছ থেকে কী ভাবে টাকা চাওয়া হয়েছিল এবং এই ঘটনায় আরও কেউ যুক্ত রয়েছেন কি না।
তদন্তকারীরা শৈলেশ রাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে চাইছেন। মঙ্গলাহাটের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ, অভিযোগের সময় তাঁর ভূমিকা এবং আর্থিক লেনদেনের কোনও সূত্র রয়েছে কি না—সব দিকই খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর।
শৈলেশ রাইয়ের বিরুদ্ধে অতীতেও গুরুতর অভিযোগে গ্রেফতারের নজির রয়েছে। ২০১৬ সালে হাওড়ার রাউন্ড ট্যাঙ্ক রোডে একটি আবাসনের নিরাপত্তারক্ষী বিজয় মল্লিক খুনের ঘটনায় তাঁর নাম তদন্তে উঠে আসে। পুলিশি তদন্তের পর ২০১৭ সালে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। সেই মামলায় দীর্ঘ সময় জেল হেফাজতে ছিলেন তিনি। তবে ২০২০ সালে হাওড়া আদালত ওই মামলায় শৈলেশ রাই-সহ ছয় অভিযুক্তকে বেকসুর খালাস করে। আদালতের রায়ে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।
ফলে বর্তমান গ্রেফতারের খবর সামনে আসতেই শৈলেশ রাইকে ঘিরে পুরনো ঘটনাও ফের সামনে এসেছে। তবে দুই মামলার মধ্যে কোনও যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনই কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর জায়গা নেই। বর্তমান ঘটনায় পুলিশ যে অভিযোগের তদন্ত করছে, তার ভিত্তিতেই পরবর্তী পদক্ষেপ হবে।
প্রাক্তন কাউন্সিলারের গ্রেফতারকে ঘিরে হাওড়ার রাজনৈতিক মহলেও আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে মঙ্গলাহাটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রে তোলাবাজির অভিযোগ কতটা বিস্তৃত এবং এর সঙ্গে কোনও রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের যোগ রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। যদিও তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়।
অন্যদিকে, পুলিশের তদন্তের পরবর্তী ধাপও গুরুত্বপূর্ণ। শৈলেশ রাইকে হাওড়ায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে মঙ্গলাহাটের অভিযোগ সম্পর্কে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা। অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত সম্ভাব্য ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা, আর্থিক লেনদেনের সূত্র খোঁজা এবং অভিযোগকারীদের বক্তব্য যাচাই—সবই তদন্তের অংশ হতে পারে।
এই ঘটনায় আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, অভিযোগের প্রকৃত ভিত্তি কতটা এবং তদন্তে কী কী তথ্য উঠে আসে। কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ বা গ্রেফতার হওয়া মানেই আদালতে তাঁর অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। ফলে মঙ্গলাহাটের তোলাবাজির অভিযোগে শৈলেশ রাইয়ের ভূমিকা শেষ পর্যন্ত কী ছিল, তা নির্ধারণ করবে তদন্ত এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়াই।
এখন নজর হাওড়া আদালতের দিকে। ট্রানজিট রিমান্ডের পর তাঁকে হাওড়ায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তদন্ত কোন দিকে এগোয়, সেই দিকেই তাকিয়ে পুলিশ এবং মঙ্গলাহাটের ব্যবসায়ী মহল। একই সঙ্গে এই ঘটনায় আরও কারও নাম সামনে আসে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মঙ্গলাহাটে তোলাবাজির অভিযোগে প্রাক্তন কাউন্সিলারের গ্রেফতার তাই শুধু একটি পুলিশি পদক্ষেপ নয়, হাওড়ার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলেও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হয়ে উঠেছে। তবে অভিযোগের সত্যতা এবং ঘটনার নেপথ্যে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে তদন্ত ও আদালতের পরবর্তী প্রক্রিয়াতেই।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments