
নিউজ ডেস্ক: তিন দিন ধরে জলে রোমাঞ্চকর লড়াই। একের পর এক ইভেন্টে সাঁতারুদের দুরন্ত পারফরম্যান্স। শেষ পর্যন্ত পদক তালিকায় সবার উপরে থেকে ষষ্ঠ রাজ্য ফিনসুইমিং চ্যাম্পিয়নশিপের সেরা জেলা হল উত্তর ২৪ পরগনা। কোচবিহারের তুফানগঞ্জ সুইমিং পুলে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় জেলার পাশাপাশি ব্যক্তিগত বিভাগেও নজর কেড়েছে একাধিক সাঁতারু। তার মধ্যে কলকাতার সৌভিক দাস এবং আহেলী দাস নিজেদের ইভেন্টে চারটি করে সোনা জিতে প্রতিযোগিতার সেরা সাঁতারুর স্বীকৃতি পেয়েছেন।
এ বারের রাজ্য ফিনসুইমিং চ্যাম্পিয়নশিপে ১৫টি জেলার প্রায় ৪১০ জন প্রতিযোগী অংশ নেন। তিন দিন ধরে চলে বিভিন্ন বয়স ও বিভাগের একাধিক ইভেন্ট। শুরু থেকেই উত্তর ২৪ পরগনার সাঁতারুরা ধারাবাহিক ভাবে ভালো ফল করছিলেন। শেষ পর্যন্ত বিপুল সংখ্যক পদক এবং সর্বোচ্চ পয়েন্ট নিয়ে তারাই জেলার লড়াইয়ে চ্যাম্পিয়নের খেতাব নিজেদের দখলে রাখে।
উত্তর ২৪ পরগনার মোট সংগ্রহ ৮৫টি পদক। এর মধ্যে রয়েছে ৩২টি সোনা, ৩০টি রুপো এবং ২৩টি ব্রোঞ্জ। সব মিলিয়ে তাদের পয়েন্ট ২৭৩। পদক এবং পয়েন্ট—দুই ক্ষেত্রেই অন্য জেলাগুলির তুলনায় স্পষ্ট ব্যবধান তৈরি করে প্রতিযোগিতার শীর্ষস্থান দখল করেছে উত্তর ২৪ পরগনা।
দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে হাওড়া। তাদের ঝুলিতে মোট ৪৯টি পদক। তার মধ্যে ১৫টি সোনা, ১৯টি রুপো এবং ১৫টি ব্রোঞ্জ। সব মিলিয়ে হাওড়ার পয়েন্ট ১৪৭। অর্থাৎ চ্যাম্পিয়ন উত্তর ২৪ পরগনার সঙ্গে পয়েন্টের ব্যবধানও যথেষ্ট। তবু একাধিক ইভেন্টে ধারাবাহিক সাফল্য দেখিয়ে রানার্স আপের জায়গা নিশ্চিত করেছে হাওড়া।
তৃতীয় হয়েছে কলকাতা। কলকাতার সংগ্রহ ৩২টি পদক। তার মধ্যে ১৫টি সোনা, ১০টি রুপো এবং সাতটি ব্রোঞ্জ। মোট পয়েন্ট ১১২। ব্যক্তিগত বিভাগে কলকাতার সৌভিক দাস এবং আহেলী দাসের দুরন্ত পারফরম্যান্স অবশ্য জেলার সামগ্রিক ফলাফলেও আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।
ঘরের মাঠে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েও কোচবিহার পদক তালিকায় ষষ্ঠ স্থানে শেষ করেছে। আয়োজক জেলার মোট সংগ্রহ ২২টি পদক এবং ৭০ পয়েন্ট। ঘরের পরিবেশ এবং দর্শকদের সমর্থন সত্ত্বেও সামগ্রিক পদক তালিকায় প্রত্যাশিত জায়গা না পেলেও একাধিক ইভেন্টে স্থানীয় প্রতিযোগীদের লড়াই নজর কেড়েছে।
এ বারের প্রতিযোগিতায় দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং মুর্শিদাবাদ কোনও পদক জিততে পারেনি। অন্য দিকে উত্তর ২৪ পরগনা, হাওড়া এবং কলকাতার সাঁতারুরা ধারাবাহিক ভাবে পদক জিতে নিজেদের এগিয়ে রেখেছেন।
তবে জেলার লড়াইয়ের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে ব্যক্তিগত বিভাগে সৌভিক এবং আহেলীর পারফরম্যান্স। সর্বোচ্চ ২০ পয়েন্ট সংগ্রহ করে দু’জনেই চারটি করে সোনা জিতেছেন। পুরুষদের বিভাগে সৌভিক দাস একাধিক ইভেন্টে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। ৫০ মিটার, ১০০ মিটার এবং ২০০ মিটার সারফেস ইভেন্টে সোনা জেতার পাশাপাশি ৫০ মিটার অ্যাপনিয়া বিভাগেও প্রথম হয়েছেন তিনি।
অন্য দিকে মহিলাদের বিভাগে আহেলী দাসও একেবারে দাপুটে পারফরম্যান্স করেছেন। ৫০ মিটার এবং ১০০ মিটার সারফেস ইভেন্টে সোনা জেতার পাশাপাশি ৫০ মিটার বাইফিন এবং ৫০ মিটার অ্যাপনিয়া বিভাগেও প্রথম স্থান দখল করেছেন তিনি। চারটি আলাদা ইভেন্টে সোনা জিতে ব্যক্তিগত বিভাগে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন আহেলী।
ফিনসুইমিং সাধারণ সাঁতারের তুলনায় কিছুটা আলাদা। নির্দিষ্ট ধরনের ফিন বা পাখনা ব্যবহার করে পানির মধ্যে গতি বাড়ানো এই খেলাটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সারফেস, বাইফিন এবং অ্যাপনিয়ার মতো বিভিন্ন বিভাগে প্রতিযোগীদের দক্ষতা, গতি এবং জলের মধ্যে নিয়ন্ত্রণের পরীক্ষা হয়। ফলে একই প্রতিযোগিতায় একাধিক ইভেন্টে অংশ নেওয়া সাঁতারুদের জন্য শারীরিক সক্ষমতার পাশাপাশি প্রয়োজন হয় বিশেষ প্রশিক্ষণ ও মানসিক প্রস্তুতির।
এই রাজ্য চ্যাম্পিয়নশিপ তাই শুধুমাত্র পদক জেতার প্রতিযোগিতা নয়, জাতীয় স্তরে নতুন সাঁতারু বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। রাজ্য সংস্থার সম্পাদক কঙ্কন পানিগ্রাহী জানিয়েছেন, প্রতিটি ইভেন্টে প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় স্থান অর্জনকারী প্রতিযোগীরা আসন্ন জাতীয় ফিনসুইমিং চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলার হয়ে সরাসরি প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পাবেন।
অর্থাৎ তুফানগঞ্জের এই প্রতিযোগিতার ফলাফল শুধু রাজ্য স্তরেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এখানকার সফল সাঁতারুরাই পরবর্তী সময়ে জাতীয় মঞ্চে বাংলার প্রতিনিধিত্ব করবেন। ফলে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া প্রত্যেকের কাছেই এই তিন দিনের লড়াই ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
ক্রীড়ামহলের আশা, এবারের চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে বেশ কিছু নতুন প্রতিভা উঠে এসেছে। বিশেষ করে ১৫টি জেলা থেকে প্রায় ৪১০ জন প্রতিযোগীর অংশগ্রহণ রাজ্যে ফিনসুইমিংয়ের জনপ্রিয়তা এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিসর বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। জেলার প্রত্যন্ত এলাকা থেকেও প্রতিভাবান সাঁতারুরা উঠে এসে রাজ্য স্তরে নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগ পাচ্ছেন।
উত্তর ২৪ পরগনার সাফল্যও সেই ধারাবাহিকতারই প্রতিফলন। ৩২টি সোনা-সহ ৮৫টি পদক এবং ২৭৩ পয়েন্ট তাদের শক্তিশালী দলগত পারফরম্যান্সের প্রমাণ। অন্য দিকে হাওড়া এবং কলকাতাও নিজেদের জায়গা মজবুত করেছে। ব্যক্তিগত বিভাগে সৌভিক ও আহেলীর চারটি করে সোনা প্রতিযোগিতার আকর্ষণ আরও বাড়িয়েছে।
তিন দিনের প্রতিযোগিতা শেষে তাই একদিকে যেমন উত্তর ২৪ পরগনার হাতে উঠেছে রাজ্য চ্যাম্পিয়নশিপের মুকুট, তেমনই জাতীয় মঞ্চের দরজা খুলে গিয়েছে বহু তরুণ সাঁতারুর সামনে। আগামী দিনে তাঁদের পারফরম্যান্সের উপরেই নির্ভর করবে জাতীয় স্তরে বাংলার সাফল্যের অনেকটাইব্যক্তিগত বিভাগে সেরা
সৌভিক দাস: ৫০ মিটার সারফেস, ১০০ মিটার সারফেস, ২০০ মিটার সারফেস এবং ৫০ মিটার অ্যাপনিয়া—চারটি সোনা।
আহেলী দাস: ৫০ মিটার সারফেস, ১০০ মিটার সারফেস, ৫০ মিটার বাইফিন এবং ৫০ মিটার অ্যাপনিয়া—চারটি সোনা।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments