Last updated: August 30th, 2026 at 04:08 pm

উত্তর ২৪ পরগনার গোবরডাঙায় আচমকাই শিয়ালের হামলায় আতঙ্ক ছড়াল। শনিবার দুপুরে পায়রাগাছির মধ্যপাড়া গ্রামে একটি শিয়ালের তাণ্ডবে একে একে আক্রান্ত হন ছ’জন গ্রামবাসী। কারও পায়ে কামড়, কারও শরীরে আঁচড়—এক ঘণ্টার মধ্যেই পরপর হামলার ঘটনায় কার্যত আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয় গোটা এলাকায়। আহতদের উদ্ধার করে হাবরা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ ও বন দপ্তরের কর্মীরা। তবে সন্ধ্যা পর্যন্ত বহু খোঁজাখুঁজির পরেও হামলাকারী শিয়ালটির কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত সেটিকে ধরতে গ্রামের ভিতরেই খাঁচা পেতেছে বন দপ্তর।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, পায়রাগাছি মধ্যপাড়া গ্রামের চারপাশে রয়েছে জঙ্গল, বাঁশঝাড় এবং ঝোপঝাড়। ফলে এলাকায় মাঝেমধ্যেই শিয়ালের দেখা মেলে। তবে এত দিন পর্যন্ত শিয়াল নিয়ে বড় ধরনের কোনও সমস্যা হয়নি। সাধারণত লোকজনের উপস্থিতি টের পেলেই জঙ্গলের দিকে পালিয়ে যেত তারা। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে একটি শিয়ালের আচরণে অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, ওই শিয়ালটি মানুষ দেখলেই আচমকা তেড়ে আসছে।
শনিবার দুপুরে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নেয়। বাড়ির সামনে বসেছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা স্বপ্না বিশ্বাস। আচমকাই পাশের জঙ্গল থেকে একটি শিয়াল বেরিয়ে এসে তাঁর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাঁর পায়ের মাংসে কামড় বসিয়ে ফের দ্রুত জঙ্গলের দিকে পালিয়ে যায় প্রাণীটি। প্রথমে ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেই মনে করেছিলেন স্থানীয়রা। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই একের পর এক মানুষ আক্রান্ত হতে শুরু করায় পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পারেন তাঁরা।
স্থানীয়দের দাবি, প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে মোট ছ’জন শিয়ালের কামড় বা আঁচড়ের শিকার হন। শুধু রাস্তায় চলাচলকারী মানুষ নয়, বাড়ির সামনেও গিয়ে হামলা চালিয়েছে প্রাণীটি। আচমকা সামনে এসে কামড়ে দিয়ে কিংবা আঁচড় কেটে ফের জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়েছে সেটি। এমনকি গ্রামের একটি কুকুরকেও শিয়ালটি আক্রমণ করেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
হঠাৎ করে মানুষের উপরে শিয়ালের এই ধরনের আক্রমণের ঘটনায় স্বাভাবিক ভাবেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই বাড়ির দরজা-জানালা বন্ধ করে ভিতরে থাকতে শুরু করেন। প্রয়োজন ছাড়া কেউ বাইরে বেরোতে চাইছেন না। আবার কেউ কেউ হাতে লাঠি নিয়ে দল বেঁধে রাস্তায় বেরিয়েছেন। জঙ্গলের ধারেকাছে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছেন গ্রামবাসীরা।
আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসার জন্য হাবরা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। একই সঙ্গে ঘটনার খবর দেওয়া হয় গোবরডাঙা থানায়। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে। পরে বন দপ্তরকেও খবর দেওয়া হয়। বিকেলের দিকে বন দপ্তরের কর্মীরা গ্রামে পৌঁছে শিয়ালটির সন্ধানে তল্লাশি শুরু করেন।
গ্রামের আশপাশের জঙ্গল, বাঁশঝাড় এবং ঝোপঝাড়ে দীর্ঘ সময় ধরে খোঁজ চালানো হলেও প্রাণীটির দেখা মেলেনি। স্থানীয়দের আশঙ্কা, হামলার পরে সেটি কোনও ঘন ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে। ফলে ফের কখন মানুষের উপরে হামলা চালাবে, তা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত শিয়ালটিকে ধরার জন্য গ্রামের ভিতরে খাঁচা বসানোর সিদ্ধান্ত নেয় বন দপ্তর। খাঁচা বসানোর পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদেরও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে জঙ্গল বা বাঁশঝাড়ের আশপাশে একা না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে খবর।
এলাকাবাসীরা জানিয়েছেন, আগে মাঝেমধ্যে শিয়াল দেখা গেলেও তারা সাধারণত মানুষের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখত। ফলে শনিবারের মতো আচরণ তাঁদের কাছে একেবারেই অস্বাভাবিক। কেন প্রাণীটি আচমকা এতটা আক্রমণাত্মক হয়ে উঠল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বন দপ্তরের তরফে শিয়ালটি উদ্ধার হওয়ার পরে তার শারীরিক অবস্থা এবং আচরণ পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
এই ঘটনার পরে গ্রামবাসীদের একাংশ জঙ্গলের লাগোয়া এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর দাবি তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য, গ্রামে বসতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জঙ্গল ও মানুষের বসতির দূরত্বও অনেক জায়গায় কমেছে। ফলে বন্যপ্রাণীর আনাগোনা নজরে এলেই দ্রুত বন দপ্তরকে জানানো জরুরি। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের একা বাইরে না পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছেন স্থানীয়রা।
শিয়ালটি এখনও ধরা না পড়ায় উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। বন দপ্তরের খাঁচায় সেটি ধরা পড়ে কি না, এখন সেদিকেই নজর স্থানীয়দের। শনিবারের পর গ্রামে রাত নামতেই যেন আরও সতর্ক হয়ে উঠেছে পায়রাগাছির মধ্যপাড়া। জঙ্গলঘেরা এই এলাকায় ফের যাতে কোনও মানুষ আক্রান্ত না হন, সেই লক্ষ্যেই পুলিশ ও বন দপ্তরের নজরদারি চলছে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments