
নিউজ ডেস্ক : শরীর পুরুষের, অথচ সাজ, অভিব্যক্তি এবং উপস্থাপনায় ফুটে উঠেছে নারীর এক অন্যরকম সত্তা। কপালে টিপ, শাড়ির সাজ, অলঙ্কার আর চোখেমুখের অভিব্যক্তিতে যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে ‘চিত্রাঙ্গদা’। তবে এই রূপান্তর শুধুমাত্র বাহ্যিক সাজসজ্জার প্রদর্শন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পরিচয়, আত্মসত্তা, অধিকার এবং সমাজের তৈরি করে দেওয়া লিঙ্গের সীমারেখা নিয়ে একটি গভীর বার্তা। আর সেই ভাবনাকেই সামনে রেখে প্রয়াত পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষকে অভিনব শ্রদ্ধা জানালেন আসানসোলের অভিনেতা সুমন চৌধুরী।
বাংলা সংস্কৃতিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চিত্রাঙ্গদা’ এমন এক চরিত্র, যার মধ্যে সৌন্দর্য, আত্মপরিচয়, আকাঙ্ক্ষা এবং নিজের অস্তিত্বকে নিজের মতো করে গ্রহণ করার প্রশ্ন একসঙ্গে উঠে আসে। সেই চিত্রাঙ্গদার ভাবনাকেই অন্য এক শিল্পভাষায় তুলে ধরেছেন সুমন। তাঁর স্থিরচিত্রের উপস্থাপনায় তাই শুধু একজন পুরুষ অভিনেতার নারী অবয়বে সেজে ওঠার বিষয়টি নেই। বরং শরীরের পরিচয়ের বাইরে মানুষের নিজস্ব সত্তাকে দেখার একটি প্রয়াস রয়েছে।
এই ভাবনার সঙ্গে গভীর ভাবে যুক্ত ঋতুপর্ণ ঘোষের শিল্পচর্চাও। রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্রাঙ্গদা’-কে নিজের দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করে ঋতুপর্ণ তৈরি করেছিলেন তাঁর ছবি ‘চিত্রাঙ্গদা: দ্য ক্রাউনিং উইশ’। সেই ছবিতে পরিচয়, শরীর, আকাঙ্ক্ষা এবং নিজের পছন্দ অনুযায়ী বাঁচার অধিকার—এই বিষয়গুলি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। সুমনের সাম্প্রতিক ফোটোশুটে সেই শিল্পভাবনারই প্রতিধ্বনি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে।
আসানসোলের অভিনেতা সুমন চৌধুরী বাংলা টেলিভিশনের পরিচিত মুখ। একাধিক ধারাবাহিকে অভিনয়ের পাশাপাশি এর আগেও তাঁকে ভিন্ন ধরনের চরিত্র ও সামাজিক বার্তাবাহী উপস্থাপনায় দেখা গিয়েছে। বিশেষ করে নারীসুলভ সাজ ও অভিনয়ের মাধ্যমে লিঙ্গপরিচয় এবং তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের অধিকার নিয়ে বার্তা দেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি কাজ করেছেন। এ বার সেই অভিজ্ঞতাকেই আরও শিল্পিত আঙ্গিকে সামনে আনলেন তিনি।
সুমনের এই বিশেষ ফোটোশুটে নজর কেড়েছে তাঁর শরীরী ভাষা এবং মুখের অভিব্যক্তি। কোথাও চোখেমুখে তীব্র যন্ত্রণা, কোথাও আত্মবিশ্বাস, আবার কোথাও নিজের পরিচয়কে নিজের মতো করে গ্রহণ করার মুক্তির অনুভূতি। ফলে ছবিগুলি নিছক সাজবদলের ছবি হয়ে থাকেনি। প্রতিটি ফ্রেমে যেন আলাদা একটি বক্তব্য তৈরি হয়েছে।
রূপসজ্জার ক্ষেত্রেও ছিল বিশেষ পরিকল্পনা। শাড়ি, অলঙ্কার, মেকআপ এবং চুলের সাজের সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করা হয়েছে সম্পূর্ণ চরিত্রের অবয়ব। কিন্তু সাজের চেয়েও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে অভিব্যক্তি। কারণ, শিল্পীর উদ্দেশ্য ছিল কেবল একজন নারী চরিত্রের বাহ্যিক রূপ ধারণ করা নয়, বরং সেই চরিত্রের ভিতরের দ্বন্দ্ব, আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে চোখেমুখে ফুটিয়ে তোলা।
রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্রাঙ্গদা’-র মূল ভাবনার দিকে তাকালেও দেখা যায়, সেখানে নারী-পুরুষের প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করার জায়গা রয়েছে। সমাজ যে ভাবে সৌন্দর্য, শক্তি কিংবা পরিচয়কে নির্দিষ্ট কিছু ছাঁচে দেখতে অভ্যস্ত, চিত্রাঙ্গদা সেই ছাঁচের বাইরে গিয়ে নিজের অস্তিত্বকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সুমনের উপস্থাপনাতেও সেই ভাবনারই একটি আধুনিক প্রতিফলন দেখা গিয়েছে।
এই কাজের মাধ্যমে এক দিকে যেমন ঋতুপর্ণ ঘোষের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন সুমন, অন্য দিকে বর্তমান সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে এনেছেন। মানুষের পরিচয়কে কেবল তার শরীর বা বাহ্যিক অবয়ব দিয়ে বিচার করা উচিত কি না, সেই প্রশ্নই যেন উঠে এসেছে তাঁর ছবিতে।
সমাজে লিঙ্গকে ঘিরে নানা ধরনের প্রচলিত ধারণা এখনও মানুষের ব্যক্তিসত্তাকে প্রভাবিত করে। পুরুষ মানেই একটি নির্দিষ্ট ধরনের আচরণ, নারী মানেই অন্য রকম—এই সরলীকৃত ধারণার বাইরে মানুষের নিজস্ব অনুভূতি ও পরিচয়ের জায়গাটিকে গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা রয়েছে সুমনের এই প্রয়াসে। তাঁর মতে, মানুষের ভিতরের সত্তাকে বোঝার জন্য শুধু বাহ্যিক পরিচয়ের দিকে তাকালে চলবে না।
এই কারণেই তাঁর ছবিগুলিতে একই সঙ্গে রয়েছে নান্দনিকতা এবং বক্তব্য। এক দিকে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্ট চরিত্রের অনুপ্রেরণা, অন্য দিকে ঋতুপর্ণ ঘোষের সিনেমার ভাবনা, আর তার সঙ্গে বর্তমান সমাজে পরিচয় ও বৈষম্য নিয়ে চলা আলোচনা—তিনটি স্তর একসঙ্গে মিশেছে এই উপস্থাপনায়।
সুমনের এই উদ্যোগ ইতিমধ্যেই সাংস্কৃতিক মহলে প্রশংসা কুড়িয়েছে বলে জানা গিয়েছে। কারণ, পরিচিত কোনও চরিত্রকে শুধুমাত্র অনুকরণ না করে তার অন্তর্নিহিত বক্তব্যকে নিজের মতো করে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন তিনি। একজন অভিনেতার কাছে শরীর ও মুখ যেমন অভিনয়ের মাধ্যম, তেমনই এখানে সেটিই হয়ে উঠেছে সামাজিক বক্তব্য প্রকাশের ভাষা।
ঋতুপর্ণ ঘোষের সৃষ্টিশীলতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ব্যক্তিগত অনুভূতি, সম্পর্ক, পরিচয় এবং সমাজের প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করার সাহস। তাঁর কাজের মধ্যে বার বার উঠে এসেছে মানুষের নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার এবং পরিচয়কে গ্রহণ করার বিষয়। তাই তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ‘চিত্রাঙ্গদা’-কে বেছে নেওয়া নিছক কাকতালীয় নয় বলেই মনে করছেন সাংস্কৃতিক মহলের একাংশ।
সুমনের স্থিরচিত্রে সেই শ্রদ্ধার জায়গাটিই আরও স্পষ্ট হয়েছে। পুরুষ শরীরের উপর নারীর অবয়ব তৈরি করে তিনি যেন দেখাতে চেয়েছেন—শরীরের পরিচয় আর মনের পরিচয় সব সময় এক সরল রেখায় চলে না। শিল্পের ভাষায় সেই জটিলতাকেই সামনে আনা হয়েছে।
এই কাজের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এখানে কোনও একটি নির্দিষ্ট পরিচয়কে প্রতিষ্ঠা করার চেয়ে পরিচয়ের বৈচিত্র্যকে স্বীকার করার কথা বলা হয়েছে। একজন মানুষকে তাঁর বাহ্যিক চেহারা, পোশাক কিংবা সামাজিক প্রত্যাশার ভিত্তিতে বিচার না করে তাঁর নিজস্ব সত্তাকে সম্মান করার প্রয়োজনীয়তার কথাই যেন উঠে এসেছে।
সুমনের চোখেমুখে তাই কখনও প্রতিবাদের ভাষা, কখনও আত্মবিশ্বাস, আবার কখনও নিজের পরিচয়কে খুঁজে পাওয়ার শান্তি। সেই কারণেই তাঁর এই ‘চিত্রাঙ্গদা’ শুধুমাত্র একটি ফোটোশুট নয়—বরং একজন শিল্পীর দৃষ্টিতে পরিচয় ও স্বাধীনতার প্রশ্নকে তুলে ধরার একটি প্রচেষ্টা।
ঋতুপর্ণ ঘোষ আজ আর নেই। কিন্তু তাঁর সিনেমা, ভাবনা এবং শিল্পের ভাষা এখনও বাংলা সংস্কৃতিতে আলোচনার বিষয়। সেই ভাবনাকে নিজের শরীর ও অভিনয়ের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের সামনে ফের তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন সুমন চৌধুরী। তাঁর এই উদ্যোগ তাই একই সঙ্গে শ্রদ্ধাঞ্জলি এবং সামাজিক বার্তা।
সব মিলিয়ে, ‘চিত্রাঙ্গদা’-র অবয়বে সুমনের এই স্থিরচিত্র যেন একটি কথাই মনে করিয়ে দেয়—পরিচয়ের গণ্ডি মানুষ তৈরি করেনি, সমাজ তৈরি করেছে। আর শিল্পের অন্যতম কাজ সেই গণ্ডির ভিতরের অদৃশ্য প্রশ্নগুলিকে দৃশ্যমান করে তোলা। ঋতুপর্ণ ঘোষকে স্মরণ করে সুমনের এই প্রয়াস সেই কাজটিই নিজের মতো করে করে গেল।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments