
নিউজ ডেস্ক: একাধিক ক্রেডিট কার্ড এখন আর খুব অস্বাভাবিক বিষয় নয়। কারও কাছে কেনাকাটার জন্য একটি কার্ড, আবার অন্য কার্ডে বিমান বা হোটেল বুকিংয়ে সুবিধা, কোথাও ক্যাশব্যাক, কোথাও রিওয়ার্ড পয়েন্ট—সুবিধা অনুযায়ী অনেকেই একাধিক ব্যাঙ্কের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেন। কিন্তু প্রশ্ন হল, একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ কতগুলি ক্রেডিট কার্ড রাখতে পারেন? এক জনের নামে দু’টি, চারটি বা আরও বেশি কার্ড থাকলে কি RBI-এর কোনও নিয়ম ভাঙা হয়?
সহজ উত্তর হল, RBI কোনও ব্যক্তির হাতে সর্বোচ্চ কতগুলি ক্রেডিট কার্ড থাকতে পারবে, তার নির্দিষ্ট সংখ্যা বেঁধে দেয়নি। অর্থাৎ, কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের এমন কোনও সাধারণ নিয়ম নেই যে একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ দুই, তিন বা চারটি ক্রেডিট কার্ডই রাখতে পারবেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে কোনও গ্রাহক চাইলেই যতগুলি কার্ড আবেদন করবেন, সবকটিই ব্যাঙ্ক অনুমোদন করবে। কার্ড দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক বা কার্ড প্রদানকারী সংস্থা গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা এবং বিদ্যমান ঋণ ও ক্রেডিট ব্যবহারের তথ্য বিবেচনা করে। RBI-এর বর্তমান ক্রেডিট কার্ড নির্দেশিকাতেও একাধিক কার্ড থাকার ফলে মোট উপলব্ধ ঋণসীমা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কার্ড ইস্যুকারীদের ক্রেডিট সীমা নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে।
না। একই ব্যক্তির নামে বিভিন্ন ব্যাঙ্কের একাধিক ক্রেডিট কার্ড থাকা নিজে থেকে কোনও নিয়মভঙ্গ নয়। ধরুন, কারও কাছে একটি ব্যাঙ্কের দুটি এবং অন্য দু’টি ব্যাঙ্কের আরও দুটি কার্ড রয়েছে। শুধু কার্ডের সংখ্যা বেশি বলেই তাঁর বিরুদ্ধে কোনও সমস্যা তৈরি হবে না।
তবে প্রতিটি কার্ডের আলাদা ক্রেডিট লিমিট থাকায় মোট উপলব্ধ ঋণের পরিমাণও বেড়ে যায়। তাই নতুন কার্ড দেওয়ার আগে ব্যাঙ্ক গ্রাহকের সামগ্রিক আর্থিক পরিস্থিতি দেখার চেষ্টা করে। RBI-এর নির্দেশ অনুযায়ী, কার্ড ইস্যুকারীদের আবেদনকারীর স্বাধীন আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনা করে ক্রেডিট ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে হবে। পাশাপাশি, অন্য সংস্থার কাছ থেকে গ্রাহক ইতিমধ্যেই যে ক্রেডিট লিমিট পেয়েছেন, সেটিও বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ধরা যাক, আপনার কাছে ইতিমধ্যেই তিনটি ক্রেডিট কার্ড রয়েছে। তিনটি কার্ড মিলিয়ে আপনার মোট ক্রেডিট লিমিট ৫ লক্ষ টাকা। এবার আপনি চতুর্থ একটি কার্ডের জন্য আবেদন করলেন। সেই আবেদন পাওয়ার পর নতুন ব্যাঙ্ক শুধুমাত্র আপনার মাসিক বেতন বা আয় দেখেই সিদ্ধান্ত নেবে না।
আপনার আগে থেকে থাকা ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা, সেই কার্ডগুলির মোট সীমা, ঋণের দায়, পরিশোধের ইতিহাস এবং ক্রেডিট রিপোর্টের মতো বিষয়ও মূল্যায়নের অংশ হতে পারে। RBI-এর ক্রেডিট রিপোর্টিং সংক্রান্ত নির্দেশনায় ঋণদাতাদের ক্রেডিট তথ্য ব্যবহারের গুরুত্বের কথা বলা হয়েছে। ফলে কোনও নতুন ঋণ বা ক্রেডিট কার্ডের আবেদন করার সময় আপনার আগের আর্থিক দায়-দায়িত্ব এবং ক্রেডিট আচরণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের পর থেকে ক্রেডিট তথ্য আরও ঘন ঘন আপডেট করার বিষয়ে RBI নির্দেশ দিয়েছে। ফলে ঋণদাতাদের হাতে গ্রাহকের সাম্প্রতিক ক্রেডিট অবস্থার তুলনামূলকভাবে আপডেটেড তথ্য পৌঁছনোর কথা।
একেবারেই নয়। ধরুন, আপনার চারটি ক্রেডিট কার্ড রয়েছে এবং সব মিলিয়ে মোট ক্রেডিট লিমিট ৪ লক্ষ টাকা। এই ৪ লক্ষ টাকা আপনার আয় নয়, এটি আপনার জন্য অনুমোদিত সর্বোচ্চ ধার নেওয়ার সীমা। তাই পুরো সীমা ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই।
বরং মাসে আপনার হাতে যে পরিমাণ টাকা আসে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যে পরিমাণ বিল স্বচ্ছন্দে পরিশোধ করতে পারবেন, সেই অনুযায়ী ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করাই নিরাপদ। বিশেষ করে একাধিক কার্ড থাকলে মোট বকেয়া কত দাঁড়াচ্ছে, তার উপর নজর রাখা জরুরি।
কার্ডের বিল সময়মতো না মেটালে সুদ এবং প্রযোজ্য অন্যান্য চার্জের বোঝা বাড়তে পারে। ফলে শুধুমাত্র বেশি ক্রেডিট লিমিট রয়েছে বলে বেশি খরচ করা আর্থিক ভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
এখানেও একটি ভুল ধারণা রয়েছে। শুধু বেশি সংখ্যক ক্রেডিট কার্ড থাকা মানেই ক্রেডিট স্কোর খারাপ হয়ে যাবে—এমন নয়। আসল বিষয় হল, সেই কার্ডগুলি কী ভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে আপনার রেকর্ড কেমন।
নিয়মিত সময়ে বিল পরিশোধ করা, অতিরিক্ত ঋণের বোঝা না বাড়ানো এবং কার্ডের সীমার তুলনায় দায়িত্বশীল ভাবে ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, বার বার বকেয়া তৈরি হওয়া বা ঋণের চাপ অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে গেলে তা ভবিষ্যতের ক্রেডিট মূল্যায়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থাৎ, চারটি কার্ড থাকা একজন গ্রাহক আর্থিক ভাবে অত্যন্ত দায়িত্বশীল হতে পারেন, আবার একটি কার্ড থাকা সত্ত্বেও কেউ নিয়মিত বিল বকেয়া রেখে সমস্যায় পড়তে পারেন। তাই কার্ডের সংখ্যা নয়, ব্যবহারের ধরন এবং পরিশোধের অভ্যাস বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
একাধিক কার্ড নেওয়ার আগে প্রত্যেকটির বার্ষিক ফি, রিনিউয়াল চার্জ, সুদের হার, রিওয়ার্ড পয়েন্ট, ক্যাশব্যাক এবং অন্যান্য শর্ত ভালো ভাবে দেখে নেওয়া দরকার। একই ধরনের সুবিধা পাওয়া যায় এমন একাধিক কার্ড রাখার প্রয়োজনও সবসময় নেই।
যাঁরা একাধিক কার্ড ব্যবহার করেন, তাঁদের প্রত্যেকটির বিলের তারিখ আলাদা করে মনে রাখা জরুরি। একটি কার্ডের বিল মেটাতে গিয়ে অন্যটির পেমেন্টের তারিখ ভুলে গেলে অপ্রয়োজনীয় চার্জ বা সুদের চাপ তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া মোট ক্রেডিট লিমিটকে নিজের আয় বা হাতে থাকা অর্থ হিসেবে দেখা উচিত নয়। ক্রেডিট লিমিট যত বেশি হবে, তত বেশি খরচ করার সুযোগ তৈরি হয় ঠিকই, কিন্তু সেই টাকা শেষ পর্যন্ত ফেরত দিতে হয়।
সব মিলিয়ে, RBI কোনও নির্দিষ্ট সংখ্যায় ক্রেডিট কার্ড রাখার সীমা নির্ধারণ করেনি। কিন্তু নতুন কার্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ ভাবে গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা ও কার্ড ইস্যুকারীর নিজস্ব ঝুঁকি মূল্যায়নের উপর নির্ভর করতে পারে। তাই একাধিক কার্ড রাখা সম্ভব হলেও, নিজের আয়, পরিশোধের ক্ষমতা এবং মোট ঋণের দায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কার্ড ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments