Homeউত্তর ২৪ পরগনাপানিহাটি২ বছর ধরে যে মাঠে পুজো, সেখানেই তালা! পানিহাটিতে তীব্র উত্তেজনা

২ বছর ধরে যে মাঠে পুজো, সেখানেই তালা! পানিহাটিতে তীব্র উত্তেজনা

নিউজ ডেস্ক; ৬২ বছর ধরে যে মাঠে দুর্গাপুজোর আয়োজন হয়ে আসছে, সেই পুজোই এ বার বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি
Screenshot 2026-08-28 151343_edited

নিউজ ডেস্ক; ৬২ বছর ধরে যে মাঠে দুর্গাপুজোর আয়োজন হয়ে আসছে, সেই পুজোই এ বার বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ। পানিহাটির ত্রাণনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় রোড এলাকায় দীর্ঘদিনের দুর্গাপুজোর মাঠ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। গত মঙ্গলবার পুজোর জন্য মাঠ ব্যবহারের অনুমতির দাবিতে ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখান এলাকার বাসিন্দারা। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে খড়দহ থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, পানিহাটির গঙ্গার তীরবর্তী এলাকায় বেশ কিছু জমি নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরেই স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে একটি আন্তর্জাতিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিরোধ চলছে। অভিযোগ, ওই প্রতিষ্ঠান ‘পানিহাটি উন্নয়ন ট্রাস্ট’ নামে একটি সংস্থার মাধ্যমে ওই এলাকার একাধিক জমি কিনেছে। যদিও স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, জমি কেনার আড়ালে জোর করে দখল নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলাও চলছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে।

এই জমি-বিতর্কের মধ্যেই দুর্গাপুজোর মাঠকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এলাকার গড়ভবানী সোশিও কালচার ক্লাব, মহুয়ার সব পেয়েছি আসর এবং কলুর মাঠের উপর ওই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নিজেদের অধিকার দাবি করছে। এর মধ্যে ‘কলুর মাঠ’ নামের জায়গাতেই গত ৬২ বছর ধরে স্থানীয়রা দুর্গাপুজোর আয়োজন করে আসছেন। ফলে দীর্ঘদিনের পুজো আচমকা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বাসিন্দাদের মধ্যে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু দিন আগে মাঠটি পাঁচিল দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, সেখানে তালাও ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। এর ফলে পুজোর প্রস্তুতি তো দূরের কথা, সাধারণ মানুষও মাঠে ঢুকতে পারছেন না বলে দাবি এলাকাবাসীর। দুর্গাপুজোর সময় ঘনিয়ে আসায় বিষয়টি নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, সম্প্রতি এলাকার কয়েক জন মহিলা ওই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করে পুজোর জন্য মাঠ ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছিলেন। তাঁদের দাবি, বহু বছর ধরে ওই মাঠেই পুজো হয়ে আসছে। তাই এ বারও যাতে নির্বিঘ্নে পুজোর আয়োজন করা যায়, সেই আবেদন জানানো হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, সেই আবেদন গ্রহণ করা হয়নি। বরং পুজো না করার জন্য তাঁদের বলা হয়েছে বলে দাবি করেছেন তাঁরা।

স্থানীয় বাসিন্দা শ্রাবণী চট্টোপাধ্যায়ের অভিযোগ, কয়েক জন মহিলা মিলে ওই প্রতিষ্ঠানের কাছে গিয়েছিলেন পুজোর মাঠ ব্যবহারের বিষয়ে কথা বলতে। তাঁর দাবি, সেখানে তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয় এবং পুজো বন্ধ করার কথা বলা হয়। এই অভিযোগকে কেন্দ্র করেই এলাকায় ক্ষোভ আরও তীব্র হয়।

শ্রাবণীর আরও অভিযোগ, শুধু দুর্গাপুজোর মাঠ নিয়েই সমস্যা নয়। গঙ্গার ঘাট ব্যবহার নিয়েও স্থানীয়দের নানা সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে। তাঁর দাবি, এলাকার বাসিন্দাদের গঙ্গার ঘাটে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান কিংবা শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের মতো সামাজিক ও ধর্মীয় কাজও সেখানে করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁর। যদিও এই সমস্ত অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এখনও বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় বাসিন্দা কাঞ্চন সরকারের দাবি, এই জমি নিয়ে বিরোধ নতুন নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকেই সমস্যা শুরু হয়েছে। জমি নিয়ে আদালতে মামলা চললেও পুজোর মাঠে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁর। তাঁর প্রশ্ন, আদালতে বিষয়টি বিচারাধীন থাকা অবস্থায় কী ভাবে স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের পুজোর জায়গা বন্ধ করে দেওয়া হল?

মঙ্গলবারের বিক্ষোভের নেপথ্যে মূলত এই ক্ষোভই কাজ করেছে বলে স্থানীয়দের দাবি। দীর্ঘদিনের পুজো বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় এলাকার বাসিন্দারা একজোট হয়ে প্রতিবাদে নামেন। বিক্ষোভের জেরে এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে খড়দহ থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। পুলিশি হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি আপাতত নিয়ন্ত্রণে এলেও জমি ও পুজোর মাঠ নিয়ে স্থানীয়দের ক্ষোভ রয়েছে।

এলাকাবাসীর বক্তব্য, দুর্গাপুজো শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এই পুজোর সঙ্গে এলাকার বহু মানুষের দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্পর্কও জড়িয়ে রয়েছে। ৬২ বছর ধরে একই জায়গায় পুজো হয়ে আসায় একাধিক প্রজন্ম এই পুজোর সঙ্গে যুক্ত। ফলে হঠাৎ করে সেই জায়গায় পুজো বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রভাব স্থানীয় সামাজিক জীবনেও পড়বে বলে মনে করছেন তাঁরা।

অন্য দিকে, জমির মালিকানা নিয়ে আইনি বিরোধ থাকায় বিষয়টি আরও জটিল হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, আদালতে মামলা চলমান। সেই পরিস্থিতিতে পুজোর মাঠের ব্যবহার নিয়ে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলেই মনে করছেন বাসিন্দারা। তাঁদের বক্তব্য, জমি নিয়ে আইনি লড়াই আলাদা বিষয়, কিন্তু বহু দশকের ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান যাতে বন্ধ না হয়, তার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সমাধানের পথ বের করা দরকার।

এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনের তরফে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানটির কর্তাদেরও বৈঠকে ডাকা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে এই বিতর্ক নিয়ে প্রকাশ্যে বিস্তারিত মন্তব্য করতে চাওয়া হয়নি। তাঁদের বক্তব্য, প্রশাসন বৈঠকে ডেকেছে এবং সেখানে তাঁরা তাঁদের অবস্থান জানাবেন।

ফলে আপাতত সকলের নজর প্রশাসনিক বৈঠকের দিকে। দীর্ঘদিনের পুজো চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি মিলবে কি না, জমি নিয়ে চলা বিরোধের মধ্যে স্থানীয়দের জন্য কোনও বিকল্প ব্যবস্থা হবে কি না, নাকি বিষয়টি আরও আইনি জটিলতার দিকে যাবে— তা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

পানিহাটির এই ঘটনা ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক এবং সামাজিক মহলেও আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে বিরোধের মূল বিষয় যেহেতু জমির মালিকানা এবং পুজোর মাঠ ব্যবহারের অধিকার, তাই প্রশাসন ও আদালতের সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। স্থানীয় বাসিন্দারা অবশ্য স্পষ্ট জানিয়েছেন, ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে যে মাঠে দুর্গাপুজো হয়ে আসছে, সেই পুজো কোনও ভাবেই বন্ধ করতে দিতে চান না তাঁরা।

এখন দেখার, প্রশাসনিক আলোচনার মাধ্যমে এই দীর্ঘদিনের বিরোধের কোনও সমাধান বের হয় কি না। পুজোর আগে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে পানিহাটির ওই এলাকায় উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলেই আশঙ্কা স্থানীয়দের একাংশের।

No Comments

তাজা খবর

আরও পড়ুন

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved