Homeদক্ষিণ ২৪ পরগনাভাঙড়আবাস যোজনার সমীক্ষাকে ঘিরে ভাঙড়ে সিপিএম-আইএসএফ সংঘর্ষ

আবাস যোজনার সমীক্ষাকে ঘিরে ভাঙড়ে সিপিএম-আইএসএফ সংঘর্ষ

নিউজ ডেস্ক; প্রধানমন্ত্রী গ্রামীণ আবাস যোজনায় উপভোক্তাদের নাম নথিভুক্তি এবং বাড়ি বাড়ি সমীক্ষাকে কেন্দ্র করে ফের রাজনৈতিক উত্তেজনা দক্ষিণ ২৪
resizeplus_Screenshot 2026-08-30 135359_edited

নিউজ ডেস্ক; প্রধানমন্ত্রী গ্রামীণ আবাস যোজনায় উপভোক্তাদের নাম নথিভুক্তি এবং বাড়ি বাড়ি সমীক্ষাকে কেন্দ্র করে ফের রাজনৈতিক উত্তেজনা দক্ষিণ ২৪ পরগনায়। ভাঙড় ২ নম্বর ব্লকের বেওতা ২ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের ওয়ারি গ্রামে আবাস যোজনার সমীক্ষার কাজ চলাকালীন সিপিএম এবং আইএসএফ কর্মীদের মধ্যে বচসা থেকে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে অভিযোগ। ঘটনায় দু’পক্ষেরই বেশ কয়েক জন আহত হয়েছেন। পরস্পরের বিরুদ্ধে পোলেরহাট থানায় অভিযোগ দায়ের করেছে দুই পক্ষ। অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।

রাজ্য জুড়ে বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী গ্রামীণ আবাস যোজনায় উপভোক্তাদের নাম নথিভুক্তি এবং তাঁদের যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য সমীক্ষা চলছে। সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী, ৩১ অগস্টের মধ্যে নাম নথিভুক্তি এবং বাড়ি বাড়ি সমীক্ষার কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে। সেই কাজেরই অংশ হিসেবে ভাঙড় ২ নম্বর ব্লকের বিভিন্ন গ্রামেও প্রশাসনের কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছেন।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, ভাঙড় ২ নম্বর ব্লকের মোট ১০টি গ্রাম পঞ্চায়েতে প্রায় ৭ হাজার পরিবার ইতিমধ্যেই আবাস যোজনায় নাম নথিভুক্ত করেছে। সেই তালিকা এবং সংশ্লিষ্ট পরিবারের পরিস্থিতি যাচাইয়ের কাজও চলছে। ওয়ারি গ্রামে সমীক্ষার জন্য স্থানীয় পঞ্চায়েত অফিসের কর্মীরা পৌঁছেছিলেন। তাঁদের কাজে সহযোগিতা করছিলেন স্থানীয় আইএসএফ কর্মীরা।

আর সেখানেই শুরু হয় রাজনৈতিক চাপানউতোর। স্থানীয় সিপিএম নেতাদের অভিযোগ, সমীক্ষকদের সহযোগিতা করার নামে আইএসএফ কর্মীরা নিজেদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বাড়ি চিহ্নিত করে দিচ্ছিলেন। এর ফলে আবাস যোজনার উপভোক্তার তালিকায় পক্ষপাত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তাঁরা। সিপিএমের অভিযোগ, তাঁদের সমর্থকদের অনেকেই যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারেন—এই আশঙ্কা থেকেই তাঁরা আপত্তি জানান।

এই বিষয়টি নিয়ে প্রথমে দুই পক্ষের মধ্যে বচসা শুরু হয়। কথাকাটাকাটি ক্রমে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে হাতাহাতি এবং শেষ পর্যন্ত সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে অভিযোগ। দু’পক্ষের বেশ কয়েক জন আহত হন। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের মধ্যে এই ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

ঘটনার একটি ভিডিয়ো ইতিমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সেই ভিডিয়োয় কয়েক জনকে মারামারিতে জড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে ওই ভিডিয়োর সত্যতা স্বাধীন ভাবে যাচাই করেনি ‘এই সময়’। ফলে ভিডিয়োয় দেখা ঘটনাটি ঠিক কোন সময়ের এবং সম্পূর্ণ ঘটনার কী প্রেক্ষাপট ছিল, তা নিয়ে নিশ্চিত ভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।

ঘটনা নিয়ে অবশ্য দুই রাজনৈতিক পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে। স্থানীয় আইএসএফ কর্মী হান্নান মোল্লার দাবি, আবাস যোজনার সমীক্ষাকে কেন্দ্র করে তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করা হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, সমীক্ষার কাজে সহযোগিতা করার সময় সিপিএমের কর্মীরাই প্রথমে তাঁদের উপর হামলা চালান। আইএসএফের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সমীক্ষার কাজে তাঁদের ভূমিকা ছিল সহযোগিতার, কোনও রকম পক্ষপাত তৈরি করার উদ্দেশ্য ছিল না।

অন্য দিকে, সিপিএম নেতা নূর মহম্মদ মোল্লার পাল্টা অভিযোগ, সমীক্ষার কাজে সহযোগিতার পরিবর্তে আইএসএফ কর্মীরাই সমস্যা তৈরি করছিলেন। তাঁর দাবি, আইএসএফ কর্মীরা জোর করে সমীক্ষার কাজে হস্তক্ষেপ করছিলেন এবং তাঁদের কর্মীদের উপর হামলা চালানো হয়।

ফলে আবাস যোজনার উপভোক্তা বাছাইয়ের মতো একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে ঘিরে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ফের প্রকাশ্যে চলে এল। গ্রামীণ এলাকায় সরকারি আবাস প্রকল্পের সুবিধা পাওয়া নিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই মানুষের আগ্রহ থাকে। বিশেষ করে যাঁদের নিজস্ব পাকা বাড়ি নেই বা যাঁদের বাড়ির অবস্থা খারাপ, তাঁদের কাছে এই প্রকল্পের তালিকায় নাম ওঠা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে তালিকা তৈরির সময় কোনও রকম রাজনৈতিক প্রভাব বা পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠলে তা নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

প্রশাসনের নির্দেশ অনুযায়ী, উপভোক্তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সমীক্ষার মাধ্যমে তাঁদের বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করার কথা। পরিবারের আর্থিক অবস্থা, বাড়ির ধরন এবং প্রকল্পের নির্ধারিত যোগ্যতার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া যাতে স্বচ্ছ থাকে, তা নিশ্চিত করাই এখন প্রশাসনের অন্যতম বড় দায়িত্ব।

ভাঙড় ২ নম্বর ব্লকে ইতিমধ্যেই প্রায় ৭ হাজার পরিবার আবাস যোজনায় নাম নথিভুক্ত করায় সমীক্ষার কাজও বড় আকারে চলছে। ১০টি গ্রাম পঞ্চায়েতের বিভিন্ন এলাকায় প্রশাসনিক কর্মীরা পর্যায়ক্রমে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছেন। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে এই কাজ শেষ করতে গিয়ে স্থানীয় স্তরে রাজনৈতিক কর্মীদের সহযোগিতা নেওয়া হলেও সেই সহযোগিতাই কোথাও কোথাও বিবাদের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে অভিযোগ।

ওয়ারি গ্রামের ঘটনা সেই সমস্যাকেই সামনে এনেছে। প্রশাসনিক সমীক্ষায় কারা সহযোগিতা করবেন এবং তাঁদের ভূমিকা কতটা থাকবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হলে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন এলাকার বাসিন্দাদের একাংশ।

সংঘর্ষের ঘটনায় আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে। অন্য দিকে, অভিযোগ পাওয়ার পর পোলেরহাট থানার পুলিশ ঘটনার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখছে। সংঘর্ষের সূত্রপাত কী ভাবে হয়েছিল, প্রথমে কারা হাতাহাতিতে জড়িয়েছিল, কত জন ঘটনায় অংশ নিয়েছিলেন এবং কারও বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ভাবে হামলার অভিযোগের সত্যতা রয়েছে কি না—সবই তদন্তের আওতায় রয়েছে।

পুলিশ স্থানীয় বাসিন্দা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করছে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিয়োটিও তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে। তবে ভিডিয়োটির সত্যতা এবং প্রেক্ষাপট যাচাই না করে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চাইছে না তদন্তকারীরা।

এই ঘটনার জেরে ফের প্রশ্ন উঠেছে, আবাস যোজনার মতো সরকারি প্রকল্পের সুবিধাভোগী নির্বাচন কতটা স্বচ্ছ ভাবে হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলি পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেও শেষ পর্যন্ত যোগ্য পরিবারগুলিই যাতে সরকারি সুবিধা পায়, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। কোনও রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কেউ বাদ পড়ছেন বা অযোগ্য কেউ সুবিধা পাচ্ছেন—এমন অভিযোগ সত্যি হলে তা প্রশাসনের ভাবমূর্তির উপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

আগামী ৩১ অগস্টের মধ্যে সমীক্ষা এবং নাম নথিভুক্তির কাজ শেষ করার নির্দেশ থাকায় হাতে সময়ও কম। ফলে রাজনৈতিক সংঘর্ষের কারণে যাতে কোনও এলাকায় সরকারি কাজ ব্যাহত না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে প্রশাসনকে। একই সঙ্গে সমীক্ষার কাজে যুক্ত কর্মী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

ওয়ারি গ্রামের ঘটনায় আপাতত সিপিএম এবং আইএসএফ—দুই পক্ষই নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছে। কার অভিযোগ সত্য, সংঘর্ষের প্রকৃত সূত্রপাত কোথায় এবং এই ঘটনার পিছনে আবাস যোজনার সমীক্ষা ছাড়া অন্য কোনও রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত কারণ ছিল কি না, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্পষ্ট নয়।

তবে একটি সরকারি প্রকল্পের উপভোক্তা বাছাইকে কেন্দ্র করে যে ভাবে রাজনৈতিক সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হল, তা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে। এখন পুলিশের তদন্ত এবং প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই নজর এলাকার মানুষের।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved