
নিউজ ডেস্ক; দাদা আর কোনও দিন ফিরবেন না। তবু শেষ বারের মতো ভাই-বোনের সেই চেনা বন্ধনটুকু ছুঁয়ে দেখতে চেয়েছিলেন বোন। ময়নাতদন্তের জন্য দেহ নিয়ে যাওয়ার ঠিক আগে মৃত দাদার নিথর হাতেই রাখি পরিয়ে দিলেন তিনি। সোনারপুর থানার ভিতরে তখন শোকের ভারী পরিবেশ। চোখের সামনে প্রিয় দাদার নিথর দেহ। কাঁদতে কাঁদতে বোনের মুখ থেকে বেরিয়ে এল একটাই আর্তনাদ— ‘‘শেষ রাখি পরিয়ে দিলাম। আর কোনও দিন রাখি পরাতে পারব না তোকে!’’
বৃহস্পতিবার বারুইপুর থেকে ফেরার পথে ভয়াবহ পথ দুর্ঘটনায় দুই তরুণের মৃত্যুর পর শুক্রবার এই হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সাক্ষী থাকল সোনারপুর থানা। মৃত দুই যুবকের এক জন সাগ্নিক সেন। বয়স মাত্র ২১। তাঁরই বোন শুক্রবার দুপুরে দাদার হাতে শেষ বারের মতো রাখি পরান। দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো অন্য যুবক শৌনক ভট্টাচার্যের বয়স ২২। দু’জনেই যাদবপুর এলাকার বাসিন্দা।
পরিবার এবং পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মঙ্গলবার রাতে বারুইপুরে একটি জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়েছিলেন যাদবপুরের পাঁচ যুবক। অনুষ্ঠান শেষ করে ভোরের দিকে একটি গাড়িতে করে কামালগাজির দিকে ফিরছিলেন তাঁরা। কিন্তু ফেরার পথেই ঘটে যায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা। চৌহাটি সংলগ্ন এলাকায় একটি স্কুলের সামনে আচমকা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়িটি রাস্তার পাশের একটি গাছে সজোরে ধাক্কা মারে। এর পর গাড়িটি একটি পাঁচিলেও ধাক্কা দেয়।
ধাক্কার অভিঘাত এতটাই তীব্র ছিল যে গাড়িটির সামনের এবং পিছনের অংশ কার্যত দুমড়ে-মুচড়ে যায়। একটি টায়ারও খুলে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই গাড়িটির চেহারা বদলে যায়। দুর্ঘটনার ভয়াবহতা দেখে স্থানীয় বাসিন্দারাও স্তম্ভিত হয়ে যান। গাড়ির ভিতরে থাকা পাঁচ জনের মধ্যে দু’জন ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। বাকি তিন জনকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
আহত তিন যুবককে এম আর বাঙুর হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। তাঁদের চিকিৎসা চলছে। মৃত এবং আহত সকলের বয়সই ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে বলে জানা গিয়েছে। একই বয়সের পাঁচ তরুণের একটি রাতের সফর যে ভাবে মর্মান্তিক পরিণতি পেল, তা নিয়ে তাঁদের পরিবার এবং পরিচিতদের মধ্যে গভীর শোক নেমে এসেছে।
প্রাথমিক ভাবে পুলিশ জানতে পেরেছে, দুর্ঘটনার সময় গাড়িটির গতি অত্যন্ত বেশি ছিল। প্রায় ১০০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা বা তারও বেশি গতিতে গাড়িটি চলছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অতিরিক্ত গতির কারণে গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল কি না, সেটিই এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পাশাপাশি দুর্ঘটনার সময় গাড়িতে থাকা যুবকেরা মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন কি না, সেই বিষয়টিও তদন্ত করছে পুলিশ।
এর পাশাপাশি আরও একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে— গাড়ি চালানোর সময় চালক ঘুমিয়ে পড়েছিলেন কি না। গভীর রাতে বা ভোরের দিকে দীর্ঘ সময় গাড়ি চালালে চালকের ক্লান্তি দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে ঠিক কী হয়েছিল, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। সোনারপুর থানার পুলিশ গোটা ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে।
দুর্ঘটনার খবর পরিবারের কাছে পৌঁছনোর পর বুধবারই মৃত ও আহতদের পরিবারের সদস্যরা সোনারপুর থানায় পৌঁছন। প্রিয়জনকে হারানোর খবর মেনে নেওয়া তাঁদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। এক দিকে হাসপাতালে আহত তিন যুবকের চিকিৎসা নিয়ে উদ্বেগ, অন্য দিকে দুই পরিবারের কাছে নেমে আসে শোকের ছায়া।
এর মধ্যেই শুক্রবার দুপুরে সাগ্নিকের দেহ ময়নাতদন্তের জন্য নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়। সেই সময় থানায় পৌঁছেছিলেন তাঁর বোন। শেষ বারের মতো দাদাকে রাখি পরানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেন তিনি। ভাই-বোনের সম্পর্কের এই বিশেষ দিনে জীবিত দাদার হাতে রাখি পরানোর বদলে তাঁকে শেষ বিদায়ের আগে নিথর হাতে রাখি পরাতে হবে— এমন পরিস্থিতি যে কতটা যন্ত্রণার, তা যেন ওই দৃশ্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
দাদার হাত ধরে রাখি পরানোর সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন তরুণী। বার বার কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলতে থাকেন, ‘‘শেষ রাখি পরিয়ে দিলাম। আর কোনও দিন রাখি পরাতে পারব না তোকে!’’ থানায় উপস্থিত পুলিশকর্মী, পরিবারের সদস্য এবং অন্যদের মধ্যেও সেই দৃশ্য আবেগ তৈরি করে। অনেকের চোখেই জল চলে আসে।
প্রতি বছর রাখি পূর্ণিমায় ভাই-বোনের সম্পর্কের উদ্যাপন হয়। বোন ভাইয়ের হাতে রাখি পরিয়ে তাঁর দীর্ঘায়ু ও মঙ্গল কামনা করেন। ভাইও বোনকে সুরক্ষার আশ্বাস দেন। কিন্তু এ বার সাগ্নিকের বোনের কাছে সেই রাখিই হয়ে উঠল বিদায়ের প্রতীক। যে হাতে এত দিন রাখি পরিয়েছেন, সেই হাতই এ দিন ছিল নিথর। দুর্ঘটনার আকস্মিকতা এই শোককে আরও গভীর করে তুলেছে।
এ দিকে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে পুলিশ বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখছে। গাড়িটির গতি কত ছিল, চালকের শারীরিক পরিস্থিতি কেমন ছিল, গাড়ির কোনও যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল কি না— সবই তদন্তের আওতায় রয়েছে। দুর্ঘটনাস্থলের পরিস্থিতিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজও পরীক্ষা করে দেখা হতে পারে।
স্থানীয়দের বক্তব্য, চৌহাটি সংলগ্ন এলাকায় সকালের সময়ে যানবাহনের চলাচল থাকে। একটি স্কুলের সামনে এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটায় স্বাভাবিক ভাবেই নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গাড়িটি যদি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অন্য দিকে চলে যেত, তা হলে পথচারী বা স্থানীয় মানুষেরও ক্ষতি হতে পারত বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।
তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনার নির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চাইছে না পুলিশ। মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো, অতিরিক্ত গতি অথবা চালকের ঘুমিয়ে পড়া— কোনও সম্ভাবনাই আপাতত উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না। তদন্তের পরেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
একটি জন্মদিনের অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে পাঁচ তরুণের সফর যে ভাবে থেমে গেল, তা তাঁদের পরিবার কোনও দিন ভুলতে পারবে না। দুই পরিবার হারাল তরতাজা দুই সন্তানকে। হাসপাতালে লড়াই করছেন আরও তিন জন। আর সাগ্নিকের বোনের কাছে এ বছরের রাখি হয়ে রইল এক অসহনীয় স্মৃতি— দাদার নিথর হাতে শেষ রাখি পরানোর স্মৃতি।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments