
নিউজ ডেস্ক : নেপালের ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে নিখোঁজ দক্ষিণ ২৪ পরগনার ছয় পর্যটক। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সোনারপুরের এক সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। ৩২ জনের একটি দলের সঙ্গে নেপাল ভ্রমণে গিয়েছিলেন তাঁরা। বুধবার নেপাল-তিব্বত সীমান্তের রাসুয়াগাধি এলাকায় পৌঁছনোর পর ভয়াবহ হড়পা বান ও জলের স্রোতের মধ্যে পড়ে যান পর্যটকেরা। তার পর থেকেই ওই ছয় জনের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। ঘটনায় স্বাভাবিক ভাবেই উদ্বেগ বাড়ছে তাঁদের পরিজনদের মধ্যে।
নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন সোনারপুরের লোপামুদ্রা কুণ্ডু। পেশায় তিনি সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বারুইপুরের শিখা নস্কর বিশ্বাস, সরিষা এলাকার বাসিন্দা নিখিল রঞ্জন বিশ্বাস, ডায়মন্ড হারবারের কেয়া প্রামাণিক এবং ফলতার মিতালি মণ্ডল। আরও এক জন দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসিন্দা ওই দলের সঙ্গে ছিলেন বলে জানা গিয়েছে।
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ২১ অগাস্ট ৩২ জনের একটি দলের সঙ্গে নেপাল বেড়াতে রওনা দিয়েছিলেন তাঁরা। পরিকল্পনা অনুযায়ী নেপালের বিভিন্ন এলাকা ঘোরার পর বুধবার নেপাল-তিব্বত সীমান্তের দিকে যাওয়ার কথা ছিল দলের। সেই মতো সকালে তাঁরা রাসুয়াগাধি এলাকায় পৌঁছন।
সকাল সাড়ে ৮টা নাগাদ দলের সদস্যেরা রাসুয়াগাধির ইমিগ্রেশন অফিসে ছিলেন। নেপাল থেকে তিব্বতে যাওয়ার প্রক্রিয়ার জন্য সেখানে অপেক্ষা করছিলেন তাঁরা। ঠিক সেই সময়েই বিপর্যয় নেমে আসে। আচমকা প্রবল জলের স্রোত নেমে এসে কার্যত তছনছ করে দেয় গোটা এলাকা। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ইমিগ্রেশন অফিস-সহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা জলের তোড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এর পর থেকেই লোপামুদ্রা-সহ ওই ছয় পর্যটকের সঙ্গে আর কোনও ভাবে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি বলে পরিবারের দাবি। তাঁদের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া মেলেনি। স্বাভাবিক ভাবেই সময় যত গড়াচ্ছে, ততই উদ্বেগ বাড়ছে পরিবারগুলির মধ্যে।
বিপর্যয়ের পর রাসুয়াগাধি ও সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক ও অন্যান্য যোগাযোগ পরিষেবা ব্যাহত হওয়ায় নিখোঁজ পর্যটকেরা ঠিক কোথায় রয়েছেন, তাঁরা নিরাপদে কোনও জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন কি না—তা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে পরিবারের উৎকণ্ঠা আরও বাড়ছে।
পরিবারের সদস্যেরা ইতিমধ্যেই প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তাঁদের নিখোঁজ পরিজনদের সন্ধানে প্রশাসনের তরফেও পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে। ভারতীয় প্রশাসন এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় উদ্ধারকাজ চালানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কারণ, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জেরে বহু জায়গায় রাস্তা কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। কোথাও ধস নেমেছে, কোথাও রাস্তার উপর জমেছে কাদা ও পাথর। একাধিক জায়গায় সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধারকারী দলগুলির পক্ষে দুর্গত এলাকায় দ্রুত পৌঁছনো কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে নিখোঁজ পর্যটকদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পেতে সময় লাগছে।
নেপালের হিমালয় সংলগ্ন সীমান্ত এলাকায় এই ভয়াবহ হড়পা বান ও ধসের ঘটনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর সামনে এসেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং কয়েকশো মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভারতীয় নাগরিকও রয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধার করতে প্রশাসনের তরফে তৎপরতা শুরু হয়েছে।
প্রতিকূল আবহাওয়া এবং দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে উদ্ধারকাজ বার বার বাধার মুখে পড়ছে। প্রবল জলের স্রোতে রাস্তা ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক এলাকাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তার উপর কাদা ও পাথরের স্তূপ সরিয়ে এগোতে হচ্ছে উদ্ধারকারী দলকে। ফলে বিপর্যয়ের পর দীর্ঘ সময় কেটে গেলেও বহু নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান এখনও মেলেনি।
পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ নুওয়াকোটে পৌঁছেছেন। সড়কপথে দুর্গত এলাকায় গিয়ে পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন তিনি। পরে পরিকাঠামো উন্নয়নমন্ত্রী সুনীল লামসালকে সঙ্গে নিয়ে পায়ে হেঁটে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলি ঘুরে দেখেন। উদ্ধারকাজ কতটা এগিয়েছে এবং বিপর্যয়ের জেরে পরিকাঠামোর কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা সরেজমিনে খতিয়ে দেখেন তিনি।
এদিকে, নিখোঁজ ছয় পর্যটকের পরিবারের কাছে এখন একটাই প্রশ্ন—তাঁদের প্রিয়জনেরা কোথায়? বিপর্যয়ের পর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় পরিবারের সদস্যদের উৎকণ্ঠা ক্রমশ বাড়ছে। প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে কোনও খবরের অপেক্ষায় রয়েছেন তাঁরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি এলাকায় আকস্মিক হড়পা বান বা ধসের মতো পরিস্থিতিতে প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রাসুয়াগাধির মতো দুর্গম এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে উদ্ধার তৎপরতা চালানো আরও কঠিন হয়ে যায়। বর্তমানে নিখোঁজ পর্যটকদের দ্রুত শনাক্ত করা এবং তাঁরা কোথায় আটকে রয়েছেন তা খুঁজে বার করাই প্রশাসনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার ছয় পর্যটকের পরিবারের কাছে তাই প্রতিটি মুহূর্ত এখন উৎকণ্ঠার। কখন প্রশাসনের কাছ থেকে তাঁদের নিরাপত্তা সম্পর্কে নিশ্চিত খবর আসে, সেই অপেক্ষাতেই দিন কাটছে পরিজনদের। উদ্ধারকারী দল দুর্গত এলাকায় পৌঁছে তল্লাশি চালাতে পারলেই পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ছবি পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments