
নিউজ ডেস্ক
সরকারি হাসপাতালের প্রেসক্রিপশন। রোগের বিবরণে লেখা—‘Wife Bite’, অর্থাৎ স্ত্রীর কামড়! শুধু তাই নয়, চিকিৎসকের পরামর্শের জায়গায় নাকি লেখা রয়েছে, ‘স্ত্রীর থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন’। এমনই একটি প্রেসক্রিপশন ঘিরে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে সমাজমাধ্যমে। দাবি করা হচ্ছে, কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালের ফিজ়িক্যাল মেডিসিন বিভাগের এই প্রেসক্রিপশন। যদিও ভাইরাল হওয়া নথিটির সত্যতা এখনও নিশ্চিত করেনি সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম। তবে ঘটনাটি নিয়ে যথেষ্ট অস্বস্তিতে পড়েছে পিজি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের চিকিৎসকেরা।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বিষয়টি নিছক রসিকতা নাকি পরিকল্পিত ভাবে তৈরি করা কোনও ভুয়ো নথি—তা খতিয়ে দেখতে থানার দ্বারস্থ হয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার ভবানীপুর থানায় অভিযোগ জানিয়ে পুরো বিষয়টি তদন্তের আর্জি জানানো হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ভাইরাল হওয়া প্রেসক্রিপশনটি আদৌ হাসপাতালের কোনও চিকিৎসক লিখেছেন কি না, নাকি কোনও আসল প্রেসক্রিপশনের ছবি বিকৃত করে সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, সেটিই এখন তদন্তের মূল বিষয়।
সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই প্রেসক্রিপশনে রোগীর সমস্যার বিবরণ দিতে গিয়ে ইংরেজিতে ‘Wife Bite’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয়েছে বলে দাবি। বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় ‘স্ত্রীর কামড়’। তার পরেই চিকিৎসকের পরামর্শের জায়গায় নাকি লেখা রয়েছে, স্ত্রীর কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার কথা। স্বাভাবিক ভাবেই এমন অদ্ভুত চিকিৎসা-পরামর্শের ছবি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে নেটমাধ্যমে।
প্রেসক্রিপশনে ১৪ অগস্টের তারিখ রয়েছে বলেও জানা গিয়েছে। ক্লিনিক্যাল নোটের অংশে ক্ষতস্থান লাল হয়ে যাওয়া এবং ফুলে থাকার মতো উপসর্গের উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসার পরামর্শের অংশে গ্যাস ও অম্বলের জন্য ওষুধ, ব্যথা কমানোর ওষুধ এবং ত্বকের সংক্রমণের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত একটি মলমের উল্লেখ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এই জায়গাতেই চিকিৎসকদের একাংশের মধ্যে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে। কারণ, কোনও ব্যক্তি কামড়ের জখম নিয়ে হাসপাতালে এলে তিনি তাঁর স্ত্রী, স্বামী কিংবা অন্য কোনও পরিচিতের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন কি না, তা চিকিৎসার ক্ষেত্রে মূল বিষয় হওয়ার কথা নয়। চিকিৎসকদের মতে, রোগীর ক্ষত এবং তার চিকিৎসাই সেখানে প্রধান। ফলে ‘Wife Bite’-এর মতো নির্দিষ্ট কোনও সম্পর্কের উল্লেখ করা চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্বাভাবিক পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
চিকিৎসকদের একাংশের বক্তব্য, কামড়ের ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তি রোগীর স্ত্রী হোন বা স্বামী কিংবা অন্য কেউ—চিকিৎসার নথিতে সম্পর্কের উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। এ ধরনের ক্ষেত্রে সাধারণত ‘Human Bite’ শব্দ ব্যবহার করাই যুক্তিসঙ্গত। অর্থাৎ, মানুষের কামড়ের কারণে হওয়া ক্ষত বোঝাতে নিরপেক্ষ চিকিৎসা-পরিভাষা ব্যবহার করার কথা।
এমন পরিস্থিতিতে ভাইরাল হওয়া প্রেসক্রিপশনে ‘Wife Bite’ লেখা থাকার বিষয়টি চিকিৎসকদের কাছে যথেষ্ট অস্বাভাবিক বলেই মনে হয়েছে। শুধু শব্দচয়ন নয়, পরামর্শ হিসেবে ‘স্ত্রীর থেকে দূরত্ব বজায় রাখা’র মতো বক্তব্যও সন্দেহ বাড়িয়েছে। চিকিৎসার নথিতে এমন ব্যক্তিগত বা সম্পর্কভিত্তিক পরামর্শ সাধারণত থাকার কথা নয়।
ভাইরাল হওয়া প্রেসক্রিপশন নিয়ে সন্দেহের আরও একটি কারণ রয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে। কামড়ের ক্ষত নিয়ে চিকিৎসা করানোর ক্ষেত্রে সাধারণত জেনারেল সার্জারি বিভাগের ভূমিকা থাকে। অথচ ভাইরাল নথিতে এসএসকেএমের ফিজ়িক্যাল মেডিসিন বিভাগের নাম দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এই বিষয়টিও হাসপাতালের চিকিৎসকদের একাংশকে ভাবিয়ে তুলেছে। প্রেসক্রিপশনের ভাষা, চিকিৎসার পরামর্শ এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের উল্লেখ—সব মিলিয়ে নথিটি আদৌ আসল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে হাসপাতালের অভ্যন্তরেও শুরু হয়েছে খোঁজখবর।
প্রাথমিক ভাবে চিকিৎসকদের একাংশের অনুমান, কোনও আসল প্রেসক্রিপশনের ছবি নিয়ে তাতে ইচ্ছাকৃত ভাবে কিছু তথ্য যোগ বা পরিবর্তন করে সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। এমন হলে উদ্দেশ্য কী ছিল, তা নিয়েও নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
কেউ নিছক মজার ছলে এমন কাণ্ড ঘটিয়েছেন, নাকি এর পিছনে হাসপাতাল বা কোনও নির্দিষ্ট চিকিৎসককে হেয় করার উদ্দেশ্য রয়েছে—তা এখনও স্পষ্ট নয়। ভাইরাল হওয়া ছবিটির উৎস কোথায়, প্রথম কে সেটি সমাজমাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন এবং পরবর্তীতে কী ভাবে সেটি ছড়িয়ে পড়ল, সেই বিষয়গুলিও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
ভাইরাল ছবিকে ঘিরে সোমবার সকাল থেকেই সামাজিক মাধ্যমে নানা মন্তব্য ও আলোচনা শুরু হয়। বিষয়টি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় বিব্রত হয়ে পড়েন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের চিকিৎসকেরা। শেষ পর্যন্ত মঙ্গলবার ভবানীপুর থানায় গিয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখার আবেদন জানানো হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে এখন মূল প্রশ্ন—ভাইরাল হওয়া প্রেসক্রিপশনটি সত্যিই এসএসকেএমের কোনও চিকিৎসকের লেখা কি না। যদি তা না হয়, তা হলে কারা নথিটি তৈরি বা বিকৃত করেছেন এবং কী উদ্দেশ্যে তা সমাজমাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে, সেই রহস্যও সামনে আসবে তদন্তের পর।
অন্যদিকে, প্রেসক্রিপশনটি সত্যি কি না নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে নারাজ চিকিৎসকদের একাংশ। তাঁদের মতে, একটি ভাইরাল ছবি দেখেই সেটিকে সরকারি হাসপাতালের আসল নথি হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কারণ, চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি জাল বা বিকৃত করে ছড়িয়ে দিলে শুধু সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক বা হাসপাতালের ভাবমূর্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
এখন তাই নজর তদন্তের দিকে। ‘Wife Bite’ লেখা সেই অদ্ভুত প্রেসক্রিপশন সত্যিই কোনও চিকিৎসকের হাতে লেখা, নাকি আসল নথির উপর কারসাজি করে তৈরি করা হয়েছে—তার উত্তর মিললেই পুরো ঘটনার আসল ছবি স্পষ্ট হবে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments