Homeকলকাতাওয়ার্ড বদল নিয়ে আপত্তি, ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়

ওয়ার্ড বদল নিয়ে আপত্তি, ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়

নিউজ ডেস্ক; কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের খসড়া প্রস্তাব ঘিরে শুরু থেকেই রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রস্তাবিত সীমানা, পুনর্বিন্যাসের পদ্ধতি এবং
Screenshot 2026-08-26 120738

নিউজ ডেস্ক; কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের খসড়া প্রস্তাব ঘিরে শুরু থেকেই রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রস্তাবিত সীমানা, পুনর্বিন্যাসের পদ্ধতি এবং পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। সেই আপত্তি ও পরামর্শ সরাসরি জানতে মঙ্গলবার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন কলকাতা পুরসভার পুর কমিশনার স্মিতা পান্ডে। বৈঠকে ওয়ার্ডের সীমানা নির্ধারণ থেকে শুরু করে জনশুনানি—একাধিক বিষয় নিয়ে সরব হন উপস্থিত প্রতিনিধিরা।

পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রস্তাবিত ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের খসড়া নিয়ে বিরোধীদের প্রধান অভিযোগ, পুরো বিষয়টি এখনও যথেষ্ট স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে নতুন ওয়ার্ডগুলির সীমানা কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, কোন এলাকার সঙ্গে কোন এলাকা যুক্ত করা হয়েছে এবং কোথায় নতুন সীমানা টানা হয়েছে—এই সংক্রান্ত মানচিত্র ও তথ্য আরও পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করার দাবি উঠেছে।

বৈঠকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির প্রতিনিধিরা অভিযোগ করেন, পুনর্বিন্যাসের কাজ অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাঁদের বক্তব্য, এত বড় প্রশাসনিক পরিবর্তনের আগে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ মানুষের মতামত নেওয়া প্রয়োজন। ওয়ার্ডের সীমানা বদল সরাসরি স্থানীয় প্রশাসন ও নাগরিক পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া উচিত বলেও দাবি করেন তাঁরা।

এ দিনের বৈঠকে মূলত তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রথমত, প্রতিটি নতুন ওয়ার্ডের সীমানা স্পষ্ট করতে হবে। দ্বিতীয়ত, খসড়া প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষের মতামত জানানোর জন্য পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। তৃতীয়ত, লিখিত মতামত গ্রহণের পাশাপাশি অবশ্যই জনশুনানির আয়োজন করতে হবে। এই তিন দাবিকেই বৈঠকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা গুরুত্ব দিয়েছেন বলে পুরসভা সূত্রে খবর।

বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ড সংখ্যা ১৪৪ থেকে বাড়িয়ে ২০৯টি করার প্রস্তাব রয়েছে। অর্থাৎ শহরের প্রশাসনিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু প্রস্তাবিত নতুন ওয়ার্ডগুলির সীমানা নিয়ে ইতিমধ্যেই একাধিক জায়গায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিরোধীদের দাবি, মানচিত্র ও সীমানার তথ্য যথেষ্ট স্পষ্ট না হওয়ায় সাধারণ নাগরিকদের পক্ষেও বোঝা কঠিন হয়ে পড়ছে কোন এলাকা কোন ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত হবে।

বৈঠকে তৃণমূলের কালীঘাট শিবিরের তরফে উপস্থিত ছিলেন বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়। পুরসভা সূত্রে খবর, তিনি ওয়ার্ডের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পরিকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, ১৪৪টি ওয়ার্ড থেকে সংখ্যা বাড়িয়ে ২০৯টি করার পরিকল্পনা থাকলেও প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো এবং ওয়ার্ড অফিসের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা এখনও সর্বত্র সম্পূর্ণ তৈরি হয়নি। ফলে নতুন ওয়ার্ড তৈরি হলে নাগরিক পরিষেবা কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

অন্য দিকে, তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবিরের প্রতিনিধিরা আরও কিছু বিষয় নিয়ে আপত্তি জানান। জাভেদ খান এবং সন্দীপন সাহা অভিযোগ করেন, জনগণনা এবং এসআইআর প্রক্রিয়া চলাকালীন এই ধরনের ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়া যথেষ্ট ধোঁয়াশাপূর্ণ। তাঁদের বক্তব্য, কোন তথ্যের ভিত্তিতে নতুন সীমানা তৈরি করা হচ্ছে, তা আরও পরিষ্কারভাবে জানানো প্রয়োজন।

কংগ্রেসের প্রতিনিধি আশুতোষ চট্টোপাধ্যায়ও সীমানা নির্ধারণ নিয়ে আপত্তি জানান। তাঁর অভিযোগ, প্রস্তাবিত নতুন ওয়ার্ডগুলির সীমানায় একাধিক জায়গায় ‘ওভারল্যাপিং’ দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ একটি ওয়ার্ডের নির্ধারিত সীমানা অন্য একটি ওয়ার্ডের এলাকার সঙ্গে এমনভাবে মিশে যাচ্ছে, যার ফলে স্থানীয় স্তরে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। এই সমস্যা দূর করতে সীমানা পুনরায় খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে।

বামেদের তরফেও বৈঠকে একাধিক আপত্তি ও পরামর্শ তুলে ধরা হয়। উপস্থিত ছিলেন মধুছন্দা দেব, কৌস্তুভ চট্টোপাধ্যায় এবং সুব্রত দত্ত। তাঁরাও ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের পদ্ধতি, সীমানা নির্ধারণ এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁদের বক্তব্যেও প্রক্রিয়াটি আরও স্বচ্ছ করার দাবি উঠে এসেছে বলে পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে।

বৈঠকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—ঠিক কোন ভিত্তিতে ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে? জনসংখ্যার হিসাব, নাকি ভোটার সংখ্যার ভিত্তিতে নতুন ওয়ার্ডের সীমানা নির্ধারণ করা হচ্ছে, তা এখনও স্পষ্ট নয় বলে অভিযোগ করেন বৈঠকে উপস্থিত প্রতিনিধিদের একাংশ। তাঁদের দাবি, পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে কোন তথ্য ও মানদণ্ড ব্যবহার করা হয়েছে, তা প্রকাশ্যে জানানো দরকার। তা না হলে খসড়া প্রস্তাব নিয়ে আরও বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

বিরোধীদের একাংশের মতে, শুধু রাজনৈতিক দলের মতামত নিলেই হবে না, স্থানীয় বাসিন্দাদেরও তাঁদের বক্তব্য জানানোর সুযোগ দিতে হবে। কারণ ওয়ার্ডের সীমানা পরিবর্তন হলে কোনও এলাকার নাগরিকদের পুর পরিষেবা, প্রশাসনিক যোগাযোগ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের মতামত জানা জরুরি বলে দাবি করা হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে অবিলম্বে সর্বদলীয় এবং সাধারণ নাগরিকদের অংশগ্রহণে জনশুনানির আয়োজন করার দাবি উঠেছে। খসড়া প্রস্তাবের কোথায় সমস্যা রয়েছে, কোথায় সীমানা পরিবর্তনের প্রয়োজন এবং কোন এলাকার বাসিন্দাদের কী আপত্তি—সরাসরি শুনে তারপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে সওয়াল করেছেন বিরোধী প্রতিনিধিরা।

তবে পুরসভার পক্ষ থেকে আপাতত লিখিত মতামত জানানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে। পুর কমিশনার স্মিতা পান্ডে জানিয়েছেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অভিযোগ ও পরামর্শ লিখিতভাবে জমা দেওয়ার জন্য ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পাওয়া সমস্ত মতামত খতিয়ে দেখার পর পরবর্তী পদক্ষেপ করা হবে বলে পুরসভার তরফে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

পুরসভা সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, লিখিত মতামত পাওয়ার পর প্রতিটি অভিযোগ ও পরামর্শ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা হবে। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী শুনানি প্রক্রিয়া শুরু করা হতে পারে। অর্থাৎ বিরোধীদের দীর্ঘদিনের জনশুনানির দাবিকে পুরোপুরি খারিজ না করে, লিখিত মতামত সংগ্রহের পর পরবর্তী পর্যায়ে শুনানির পথ খোলা রাখছে কলকাতা পুরসভা।

কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ড সংখ্যা ১৪৪ থেকে বাড়িয়ে ২০৯ করার প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে শহরের পুর প্রশাসনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। তাই নতুন ওয়ার্ডগুলির সীমানা কীভাবে নির্ধারিত হচ্ছে এবং কোন এলাকার সঙ্গে কোন এলাকা যুক্ত হচ্ছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলির পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও আগ্রহ রয়েছে। এখন ৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে জমা পড়া মতামতের ভিত্তিতে পুরসভা কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটাই দেখার।

খসড়া প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলির আপত্তি, সীমানা নিয়ে বিভ্রান্তি এবং জনশুনানির দাবি—সব মিলিয়ে কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস এখন যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। চূড়ান্ত প্রস্তাব তৈরির আগে পুরসভা কতটা সংশোধন করে এবং নাগরিকদের মতামত কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তার উপরই পরবর্তী পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved