Homeদেশ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পরও থামেনি বিয়ের স্বপ্ন, ভিসার জট কাটিয়ে ভারতে এলেন ১৫০ পাক তরুণী

‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পরও থামেনি বিয়ের স্বপ্ন, ভিসার জট কাটিয়ে ভারতে এলেন ১৫০ পাক তরুণী

নিউজ ডেস্ক: পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলার পর ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের যে তীব্র অবনতি হয়েছিল, তার প্রভাব পড়েছিল দুই দেশের সাধারণ মানুষের জীবনেও।
resizeplus_ChatGPT Image Aug 25, 2026, 12_21_54 AM

নিউজ ডেস্ক: পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলার পর ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের যে তীব্র অবনতি হয়েছিল, তার প্রভাব পড়েছিল দুই দেশের সাধারণ মানুষের জীবনেও। সীমান্ত বন্ধ, ভিসা পরিষেবায় কড়াকড়ি এবং পরবর্তী সামরিক উত্তেজনার কারণে একাধিক পরিবারকে থমকে যেতে হয়েছিল মাঝপথে। বিশেষ করে পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের বেশ কিছু হিন্দু পরিবারের কাছে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। ভারতে পাকা হয়ে যাওয়া বিয়ে, দুই পরিবারের দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি—সব কিছুই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়।

তবে সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেই শেষ পর্যন্ত কিছুটা স্বস্তির খবর সামনে এসেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে পাকিস্তানের প্রায় ১৫০ জন সিন্ধি তরুণী তাঁদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিভিন্ন দেশের ট্রানজ়িট রুট ব্যবহার করে ভারতে পৌঁছতে পেরেছেন। এঁদের অনেকেরই ভারতে বিয়ে ঠিক হয়েছিল। সীমান্তপথে প্রবেশের সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যাঁদের বিয়ে কার্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল, তাঁরাই এবার নতুন করে ভারতে এসে নিজেদের নতুন জীবনের পথে পা রাখছেন।

ঘটনার সূত্রপাত ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল। জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে পর্যটকদের উপর ভয়াবহ জঙ্গি হামলায় ২৬ জনের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনার পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একাধিক কড়া পদক্ষেপ করে ভারত। দুই দেশের মধ্যে আগে থেকেই থাকা টানাপড়েন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। সীমান্ত যোগাযোগ এবং ভিসা ব্যবস্থাতেও তার প্রভাব পড়ে।

এর পর ৭ মে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী ‘অপারেশন সিঁদুর’ চালায়। পাকিস্তান এবং পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে জঙ্গি পরিকাঠামোর বিরুদ্ধে এই অভিযানকে ঘিরে দুই দেশের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা চরমে ওঠে। পাল্টা হামলার চেষ্টাও করে পাকিস্তান। তবে ভারতীয় সেনা, নৌসেনা এবং বায়ুসেনার সমন্বিত প্রতিরোধে সেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। এই সংঘাতের অভিঘাত আন্তর্জাতিক স্তরেও আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।

এই পরিস্থিতির মধ্যে অটারী-ওয়াঘা সীমান্ত দিয়েও যাতায়াত কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। যে পথ দিয়ে বহু বছর ধরে ভারত ও পাকিস্তানের সিন্ধি হিন্দু পরিবারগুলি বিভিন্ন সামাজিক ও পারিবারিক প্রয়োজনে যাতায়াত করতেন, সেই পথও আর আগের মতো খোলা থাকেনি। ফলে ভারতে বিয়ে ঠিক হওয়া বহু পাকিস্তানি তরুণীর পরিবার চরম সমস্যায় পড়ে।

পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের বহু হিন্দু পরিবার দীর্ঘদিন ধরে ভারতে আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। বিশেষ করে বিয়ের ক্ষেত্রে দুই দেশের পরিবারের মধ্যে যোগাযোগ নতুন ঘটনা নয়। আগে অটারী-ওয়াঘা সীমান্ত ব্যবহার করে সহজেই ভারতে আসার ব্যবস্থা করা যেত। কিন্তু সীমান্ত পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিয়ের আয়োজনও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

এই পরিস্থিতিতে বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগী হন পাকিস্তান থেকে ভারতে আসা সিন্ধি অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা নাগপুরের রাজেশ ঝাম্বিয়া। সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি জানিয়েছেন, শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের সহায়তায় ওই তরুণীদের ভারতে আসার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়েছে।

রাজেশের বক্তব্য অনুযায়ী, অপারেশন সিঁদুরের পর অটারী সীমান্ত দিয়ে ভারতে আসার পরিকল্পনা করা বহু পাকিস্তানি পরিবারের ভিসা আবেদন অনুমোদন পায়নি। ফলে যাঁদের বিয়ে আগে থেকেই ঠিক হয়ে ছিল, তাঁদের অনেকের ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হয়ে ওঠে। এক দিকে দুই পরিবারের মধ্যে বিয়ের প্রস্তুতি, অন্য দিকে সীমান্ত ও ভিসা সংক্রান্ত বিধিনিষেধ—দুইয়ের মধ্যে আটকে পড়ে বহু পরিবার।

পরিস্থিতির সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় রায়পুরের একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের ঘোটকি এলাকায় অবস্থিত ‘শাদানি দরবার’-এর আধ্যাত্মিক প্রধান সন্ত যুধিষ্ঠিরলাল শাদানি বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগ নেন। তিনি ভারতে বিয়ে ঠিক হওয়া পাকিস্তানি তরুণীদের একটি তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেন।

তালিকা তৈরির পর বিষয়টি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হয়। সংশ্লিষ্ট মন্দির কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সঙ্গে যোগাযোগ করে ওই তরুণী এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের ভারতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার আবেদন জানায়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর তাঁদের জন্য একটি বিকল্প পথ খোলা হয়।

সরাসরি স্থলসীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশের বদলে ওই পরিবারগুলিকে আকাশপথে এবং তৃতীয় কোনও দেশের ট্রানজ়িট রুট ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া হয়। ফলে পাকিস্তান থেকে সরাসরি ভারতে আসা সম্ভব না হলেও দুবাই, ওমান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ-সহ বিভিন্ন দেশের মাধ্যমে ঘুরে ভারতে পৌঁছতে শুরু করেন ওই তরুণীরা।

রাজেশ জানিয়েছেন, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে এখনও পর্যন্ত প্রায় ১৫০ জন পাকিস্তানি কনে তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এই বিকল্প পথ ব্যবহার করে ভারতে এসেছেন। তাঁদের গন্তব্য ছিল নাগপুর, রায়পুর, জোধপুর, পুণে-সহ দেশের বিভিন্ন শহর। এই তালিকায় থাকা অনেক তরুণীর বিয়েও ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। নাগপুরেই অন্তত ১৫টি এমন বিয়ে হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

এই ঘটনা শুধু কয়েকটি বিয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দুই দেশের সীমান্তের দুই প্রান্তে থাকা একাধিক পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষা এবং সামাজিক সম্পর্ক। রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার কারণে যেখানে সাধারণ মানুষের যাতায়াত কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, সেখানে বিশেষ অনুমতির মাধ্যমে বিকল্প আন্তর্জাতিক যাত্রাপথ তৈরি করে এই পরিবারগুলির জন্য বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তবে অপেক্ষার তালিকা এখানেই শেষ নয়। রাজেশের দাবি, পাকিস্তানে এখনও প্রায় ৩০০ জন তরুণী রয়েছেন, যাঁদের ভারতে বিয়ে ঠিক হয়ে রয়েছে। তাঁরাও ভারতে এসে নতুন সংসার শুরু করার অপেক্ষায় রয়েছেন। তাঁদের জন্যও ভিসা দেওয়ার আবেদন কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জানানো হয়েছে।

এই পরিবারগুলির কাছে তাই বিষয়টি শুধুই ভিসা পাওয়ার প্রশ্ন নয়। সীমান্তের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে গেলেও বহু বছরের পারিবারিক সম্পর্ক এবং বিয়ের মতো সামাজিক অনুষ্ঠান থেমে যায় না। সেই বাস্তবতাকেই সামনে রেখে বিকল্প পথে কিছু পরিবার ভারতে আসার সুযোগ পেয়েছে। ফলে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর অন্তত ১৫০টি পরিবারের ঘরে ফিরেছে স্বস্তি।

এক দিকে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের টানাপড়েন, অন্য দিকে ব্যক্তিগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত—এই দুইয়ের সংঘাতেই আটকে পড়েছিল ওই তরুণীদের ভবিষ্যৎ। কেন্দ্রীয় অনুমোদনে বিকল্প রুট খুলে যাওয়ায় আপাতত সেই জটের কিছুটা সমাধান হয়েছে। এখন নজর রয়েছে অপেক্ষমাণ আরও প্রায় ৩০০ জন তরুণীর দিকে। তাঁদের ক্ষেত্রেও একই ভাবে ভারতে আসার সুযোগ তৈরি হয় কি না, সেটাই দেখার।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved