Homeমালদাশ্রাবণী মেলায় জোয়ার! ১৭.৩৫ লক্ষ পুণ্যার্থী সামলে নজির মালদহ ডিভিশনের, রেকর্ড ৯৫০ জোড়া স্পেশ্যাল ট্রেন

শ্রাবণী মেলায় জোয়ার! ১৭.৩৫ লক্ষ পুণ্যার্থী সামলে নজির মালদহ ডিভিশনের, রেকর্ড ৯৫০ জোড়া স্পেশ্যাল ট্রেন

নিউজ ডেস্ক : শ্রাবণ মাস মানেই শিবভক্তদের ঢল। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার কানওয়াড়িয়া পুণ্যস্নান এবং জলাভিষেকের উদ্দেশ্যে ছুটে
resizeplus_3

নিউজ ডেস্ক : শ্রাবণ মাস মানেই শিবভক্তদের ঢল। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার কানওয়াড়িয়া পুণ্যস্নান এবং জলাভিষেকের উদ্দেশ্যে ছুটে আসেন বিহারের সুলতানগঞ্জ-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থানে। সেই বিপুল জনসমাগম সামলানো রেলের কাছে প্রতি বছরই বড় চ্যালেঞ্জ। তবে এ বার সেই চ্যালেঞ্জ বেশ দক্ষতার সঙ্গেই সামলাল পূর্ব রেলের মালদহ ডিভিশন। শ্রাবণী মেলা ২০২৬-কে কেন্দ্র করে প্রায় ১৭ লক্ষ ৩৫ হাজারেরও বেশি পুণ্যার্থী সুলতানগঞ্জ স্টেশন দিয়ে যাতায়াত করেছেন। তাঁদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যাত্রা নিশ্চিত করতে ৯৫০ জোড়া ট্রেন পরিষেবা থেকে শুরু করে চিকিৎসা, টিকিটিং, ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান—একাধিক ক্ষেত্রে বাড়তি ব্যবস্থা নিয়েছিল রেল।

রেল সূত্রে খবর, ৩০ জুলাই থেকে ২৮ অগস্ট পর্যন্ত শ্রাবণী মেলাকে কেন্দ্র করে মালদহ ডিভিশনে বিশেষ প্রস্তুতি চালানো হয়। বিহার, ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ, অসম-সহ দেশের নানা প্রান্ত থেকে কানওয়াড়িয়া এবং অন্যান্য পুণ্যার্থীরা এই সময়ে সুলতানগঞ্জ ও সংলগ্ন রেলপথ ব্যবহার করেন। ফলে সাধারণ দিনের তুলনায় যাত্রীসংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সেই চাপ সামলাতেই আগে থেকেই বিশেষ পরিকল্পনা তৈরি করেছিল ডিভিশন।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিসংখ্যান সামনে এসেছে সুলতানগঞ্জ রেল স্টেশনকে ঘিরে। এ বার মেলার সময়ে এই স্টেশন দিয়ে প্রায় ১৭.৩৫ লক্ষ পুণ্যার্থী যাতায়াত করেছেন। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় সংখ্যাটি প্রায় ২.৫ লক্ষ বেশি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পুণ্যার্থীর চাপ উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। এত বিপুল সংখ্যক মানুষের যাতায়াতের মধ্যেও ট্রেন পরিষেবা সচল রাখা এবং স্টেশন এলাকায় শৃঙ্খলা বজায় রাখাই ছিল রেল প্রশাসনের অন্যতম বড় লক্ষ্য।

মালদহ ডিভিশনের ডিভিশনাল রেলওয়ে ম্যানেজার মনিশ কুমার গুপ্তার বক্তব্য অনুযায়ী, মেলার পুরো সময় জুড়েই ট্রেন চলাচল, যাত্রী নিরাপত্তা, চিকিৎসা পরিষেবা, টিকিটিং এবং পরিচ্ছন্নতার বিষয়গুলিতে বিশেষ নজর রাখা হয়েছিল। ভিড়ের পরিস্থিতি বুঝে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন স্টেশনে অতিরিক্ত কর্মী এবং পরিষেবার ব্যবস্থা করা হয়।

পুণ্যার্থীদের অতিরিক্ত চাপ সামলাতে মোট ৯৫০ জোড়া ট্রেন পরিচালনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ছিল ৫৪৯টি মেল ও এক্সপ্রেস স্পেশ্যাল, ২২৫টি TOD স্পেশ্যাল এবং ১৭৬টি প্যাসেঞ্জার স্পেশ্যাল। অর্থাৎ শুধুমাত্র নিয়মিত ট্রেনের উপর নির্ভর না করে অতিরিক্ত পরিষেবা চালু করেই যাত্রী পরিবহণের চাপ সামলানোর চেষ্টা করেছে মালদহ ডিভিশন।

সুলতানগঞ্জ স্টেশনেও বেশ কিছু বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। নির্দিষ্ট কয়েকটি ট্রেনকে অতিরিক্ত পাঁচ মিনিট করে স্টপেজ দেওয়া হয়। এর ফলে বিপুল সংখ্যক যাত্রীকে ওঠানামার জন্য বাড়তি সময় দেওয়া সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচিত কিছু নিয়মিত ট্রেনে অতিরিক্ত জেনারেল সেকেন্ড ক্লাস কোচ সংযোজন করা হয়েছিল। সাধারণত কানওয়াড়িয়া ও পুণ্যার্থীদের বড় অংশই অসংরক্ষিত কামরায় যাতায়াত করেন। ফলে এই অতিরিক্ত কোচ যাত্রীচাপ সামলানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে বলে রেল কর্তৃপক্ষের দাবি।

শুধু সুলতানগঞ্জ নয়, মেলার সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য স্টেশনগুলিতেও ছিল বাড়তি নজরদারি। রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, হাঁসডিহা স্টেশন দিয়ে ৭৫ হাজারেরও বেশি কানওয়াড়িয়া যাতায়াত করেছেন। ননিহাট ভাটুরিয়া স্টেশনেও পুণ্যার্থীর সংখ্যা ৬০ হাজার ছাড়িয়েছে। ফলে এই স্টেশনগুলিতেও যাত্রীদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

বিপুল ভিড়ের মধ্যে অনেক সময় বয়স্ক মানুষ, মহিলা এবং প্রথমবার আসা পুণ্যার্থীদের স্টেশন সম্পর্কে তথ্য পেতে সমস্যা হয়। সেই পরিস্থিতি সামলাতে এগিয়ে আসে মালদহ ডিভিশনের স্কাউটস অ্যান্ড গাইডস দল। তাঁরা যাত্রীদের পথনির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি পানীয় জল সরবরাহ, প্রবীণ ও মহিলা যাত্রীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং রেল নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করার কাজ করেন।

এই কাজে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলিও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। সুলতানগঞ্জের মারওয়ারি যুব মঞ্চের স্বেচ্ছাসেবকেরাও পুণ্যার্থীদের সহায়তায় অংশ নেন। রেলকর্মী, নিরাপত্তারক্ষী, চিকিৎসাকর্মী, স্কাউটস অ্যান্ড গাইডস এবং স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বিত কাজেই স্টেশনগুলিতে বাড়তি যাত্রীচাপ সামলানো সম্ভব হয়েছে বলে রেল কর্তৃপক্ষের দাবি।

শ্রাবণী মেলার মতো বড় ধর্মীয় সমাবেশে শুধু যাত্রী পরিবহণই নয়, পরিচ্ছন্নতাও বড় বিষয়। কয়েক লক্ষ মানুষের যাতায়াতের ফলে স্টেশন ও আশপাশের এলাকায় বিপুল পরিমাণ বর্জ্য জমার আশঙ্কা থাকে। এই বিষয়টি মাথায় রেখে সুলতানগঞ্জ স্টেশনে ১৩৩টি টুইন-বিন ডাস্টবিন বসানো হয়েছিল। মেলা চলাকালীন প্রায় ৬.১ টন বর্জ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা করা হয়েছে বলে মালদহ ডিভিশন সূত্রে জানা গিয়েছে।

পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি পুণ্যার্থীদের স্বাস্থ্য নিয়েও বিশেষ নজর রাখা হয়েছিল। রেল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মেলার সময়ে প্রায় ২০ হাজার কানওয়াড়িয়াকে চিকিৎসা পরিষেবা বা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-সহায়তা দেওয়া হয়েছে। বিপুল ভিড়ের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়া, ক্লান্তি, শারীরিক সমস্যা কিংবা অন্য কোনও জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার জন্য চিকিৎসা দল প্রস্তুত রাখা হয়েছিল।

টিকিট কাউন্টারেও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। বিশেষ করে অসংরক্ষিত টিকিটের জন্য দীর্ঘ লাইন এড়াতে অতিরিক্ত M-UTS পরিষেবা চালু করা হয়। এর ফলে মোবাইলের মাধ্যমে দ্রুত টিকিট কাটার সুযোগ আরও বেশি যাত্রীর কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। ডিজিটাল টিকিটিং ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে স্টেশনের কাউন্টারে ভিড় কমানোরও চেষ্টা করা হয়।

রেলের কাছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল নিরাপত্তা। বিপুল মানুষের ভিড়ে যাতে কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে জন্য বিভিন্ন স্টেশন ও গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর জোর দেওয়া হয়। যাত্রীদের চলাচলের পথ, ওঠানামার জায়গা এবং অপেক্ষারত এলাকাগুলিতে নজরদারি চালানো হয়।

ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে কয়েক লক্ষ মানুষের একসঙ্গে রেলপথে যাতায়াতের ক্ষেত্রে সামান্য অব্যবস্থাপনাও বড় সমস্যার কারণ হয়ে উঠতে পারে। সেই কারণেই এ বার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে একাধিক দফতরের মধ্যে সমন্বয়ের উপর জোর দেওয়া হয়েছিল। ট্রেন পরিচালনা থেকে শুরু করে যাত্রী সহায়তা, চিকিৎসা, পরিচ্ছন্নতা এবং নিরাপত্তা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই আলাদা আলাদা দল কাজ করেছে।

রেল কর্তৃপক্ষের মতে, শ্রাবণী মেলা ২০২৬-এর সময়ে বিপুল সংখ্যক পুণ্যার্থীর চাপ থাকলেও পরিষেবা সচল রাখার ক্ষেত্রে সমন্বিত পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। বিশেষ ট্রেন চালানো এবং নির্দিষ্ট ট্রেনে অতিরিক্ত কোচ যুক্ত করার পাশাপাশি যাত্রীদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন পরিষেবা বাড়ানো হয়েছিল।

সব মিলিয়ে এ বারের শ্রাবণী মেলা মালদহ ডিভিশনের কাছে ছিল বড় পরীক্ষা। গত বছরের তুলনায় সুলতানগঞ্জে প্রায় আড়াই লক্ষ বেশি পুণ্যার্থীর যাতায়াত সেই চাপের মাত্রা স্পষ্ট করে দিয়েছে। তার উপর হাঁসডিহা এবং ননিহাট ভাটুরিয়ার মতো স্টেশনেও হাজার হাজার কানওয়াড়িয়ার যাতায়াত হয়েছে।

তবু ট্রেন পরিষেবা, নিরাপত্তা, চিকিৎসা, পরিচ্ছন্নতা এবং যাত্রী সহায়তা—সব দিক একসঙ্গে সামলানোর চেষ্টা করেছে পূর্ব রেলের মালদহ ডিভিশন। ৯৫০ জোড়া ট্রেন পরিষেবা, ২০ হাজারেরও বেশি চিকিৎসা-সহায়তা, কয়েক টন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্বেচ্ছাসেবকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ—এই পরিসংখ্যানই দেখাচ্ছে, বিপুল ভিড়ের এই ধর্মীয় উৎসবকে ঘিরে কতটা বড় মাপের প্রস্তুতি নিতে হয়েছিল রেলকে। লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থীর নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করার সেই প্রয়াসই এ বার মালদহ ডিভিশনের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে সামনে এসেছে।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved