
নিউজ ডেস্ক : বাড়িঘর, জমি-জায়গার পর এ বার গঙ্গার ভয়াবহ ভাঙনের মুখে একটি আস্ত স্কুলভবন। শনিবার গভীর রাতে হুড়মুড়িয়ে নদীগর্ভে তলিয়ে গেল পশ্চিম রতনপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দোতলা ভবনের একাংশ। কয়েক দিনের টানা ভাঙনে নদী ক্রমশ স্কুলের কাছে এগিয়ে এসেছিল। শেষ পর্যন্ত রাতের অন্ধকারে স্কুল ভবনের প্রায় অর্ধেক অংশ গঙ্গার জলে চলে যায়। এখনও ভবনের যে অংশটুকু দাঁড়িয়ে রয়েছে, সেটিও যে কোনও মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।
ঘটনার পর থেকেই রতুয়া-১ ব্লকের মহানন্দটোলা গ্রাম পঞ্চায়েতের পশ্চিম রতনপুর এলাকায় আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। প্রায় ৩২০ জন পড়ুয়া এই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করত। স্কুলটির উপর নির্ভরশীল ছিলেন আশপাশের একাধিক গ্রামের ছাত্রছাত্রীরা। কিন্তু আচমকা স্কুলভবনের বড় অংশ নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় আপাতত সেখানে পঠন-পাঠন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পড়ুয়াদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে বিকল্প স্কুলে ক্লাসের ব্যবস্থা করেছে প্রশাসন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ভূতনী এবং রতুয়া সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকায় গত কয়েক দিন ধরে গঙ্গার ভাঙন ভয়াবহ আকার নিয়েছে। নদীর পাড় ক্রমশ ভেঙে যাওয়ায় একের পর এক বাড়ি, জমি এবং অন্যান্য পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু পরিবার ইতিমধ্যেই নিজেদের ঘরবাড়ি ও জমি-ভিটে ছেড়ে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। সেই ভাঙনের ধারাবাহিকতায় এ বার নদীর মুখে পড়ল পশ্চিম রতনপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়।
শনিবার গভীর রাতে আচমকা স্কুল ভবনের একটি বড় অংশ নদীর দিকে ধসে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে দোতলা ভবনের প্রায় অর্ধেক অংশ গঙ্গার জলে তলিয়ে যায়। ঘটনার সময় স্কুলে কোনও পড়ুয়া বা শিক্ষক না থাকায় বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো গিয়েছে। কিন্তু দিনের আলো ফুটতেই স্থানীয় বাসিন্দারা স্কুলের পরিস্থিতি দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। দাঁড়িয়ে থাকা ভবনের অংশের নিচের মাটি কতটা নিরাপদ, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে প্রশ্ন।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক বাপি সরকার জানিয়েছেন, বিপদের আশঙ্কা নতুন নয়। তাঁর দাবি, গত বছর থেকেই গঙ্গা স্কুলের কাছাকাছি চলে এসেছিল। সেই সময় বিষয়টি প্রশাসন এবং সেচ দফতরের নজরে আনা হয়েছিল। ভাঙনের আশঙ্কার কথা জানানো হলেও সময়মতো কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তাঁর। প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য, দ্রুত ভাঙন রোধের কাজ শুরু হলে হয়তো পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ জায়গায় পৌঁছত না।
এখন স্কুল ভবনের বাকি অংশ নিয়েও দুশ্চিন্তা বাড়ছে। কারণ নদী যদি একই ভাবে পাড় ভাঙতে থাকে, তা হলে দাঁড়িয়ে থাকা অংশটুকুও গঙ্গার জলে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শুধু স্কুল ভবন নয়, আশপাশের রাস্তা এবং অন্যান্য পরিকাঠামোও ঝুঁকির মুখে বলে দাবি স্থানীয়দের।
পড়ুয়াদের যাতে পড়াশোনা বন্ধ না হয়ে যায়, সেই কারণে আপাতত বিকল্প ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্কুলের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কিছুটা দূরে অবস্থিত খাস মহল জুনিয়র উচ্চ বিদ্যালয়ে পশ্চিম রতনপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে বিপজ্জনক স্কুলভবনে গিয়ে পড়াশোনা করার ঝুঁকি আপাতত নিতে হচ্ছে না ছাত্রছাত্রীদের।
তবে অস্থায়ী ব্যবস্থা কত দিন চলবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, পশ্চিম রতনপুরের এই প্রাথমিক বিদ্যালয়টি শুধু একটি ভবন নয়, বহু গ্রামের শিশুর শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। স্কুলটি নদীগর্ভে চলে গেলে নতুন ভবন তৈরি এবং পরিকাঠামো গড়ে তোলার কাজও সহজ হবে না। তার আগে গঙ্গার ভাঙন আটকানোই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন তাঁরা।
ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মানিকচকের বিধায়ক গৌড়চন্দ্র মণ্ডল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গত বছর থেকেই স্কুলটি ভাঙনের আশঙ্কার মধ্যে ছিল। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে দ্রুত কাজ করা সম্ভব হয়নি বলে তিনি জানিয়েছেন। বর্তমানে নতুন করে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে বলেও দাবি তাঁর। পাশাপাশি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পরিস্থিতির উপর নজর রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিধায়কের তরফে অস্থায়ী ভাবে অন্যত্র পঠন-পাঠনের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু স্থানীয়দের মূল দাবি, শুধু পরিদর্শন বা পরিকল্পনা নয়, দ্রুত বাস্তব কাজ শুরু করতে হবে। কারণ নদীভাঙনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি প্রতিদিন বদলে যেতে পারে। আজ যে জায়গায় নদীর পাড় রয়েছে, কাল সেটিও গঙ্গার জলে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
পশ্চিম রতনপুরের বাসিন্দাদের আশঙ্কা, ভাঙন অব্যাহত থাকলে আগামী দিনে আরও বহু বাড়ি, রাস্তা এবং সরকারি-বেসরকারি পরিকাঠামো ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে স্কুলের অবশিষ্ট অংশ এখন কার্যত বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। সেটি ভেঙে পড়লে নতুন করে দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। তাই দ্রুত এলাকাটি নিরাপদ করার পাশাপাশি অবশিষ্ট স্কুল ভবনের অংশটিও ঘিরে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
গঙ্গার ভাঙন মালদহের এই অংশে নতুন কোনও সমস্যা নয়। বছরের পর বছর ধরে বর্ষা এলেই নদীর পাড়ের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ে। অনেকের কাছে নদীভাঙন মানে এক রাতের মধ্যে বসতভিটে হারিয়ে ফেলা। এ বার সেই একই আশঙ্কার ছবি দেখা গেল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও। যে স্কুলে কয়েকশো শিশু প্রতিদিন পড়তে আসত, সেই ভবনের বড় অংশ এখন গঙ্গার তলায়।
সবচেয়ে বড় স্বস্তির বিষয়, রাতের ঘটনায় কোনও পড়ুয়ার প্রাণহানি হয়নি। কিন্তু এই ঘটনা ফের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, নদীভাঙন শুধু বসতবাড়ি নয়, শিক্ষা ও জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোকেও কতটা বিপন্ন করে তুলতে পারে। এখন নজর থাকবে প্রশাসন ও সেচ দফতর কত দ্রুত ভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয় এবং পশ্চিম রতনপুরের অবশিষ্ট স্কুলভবন ও আশপাশের বসতি কতটা নিরাপদ রাখা সম্ভব হয়।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
contact@ngtvnews.com
+৯১ ৮৪২০৬৫৮৯৯৯
আর্চ স্কোয়ার X2 বিল্ডিং
কলেজ মোড়, সেক্টর ৫
কলকাতা - ৭০০০৯১
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments